এক পায়ে ৬ সদস্যের পরিবারের ভার

শারীরিক অসুস্থতায় কিছুটা কাহিল তিনি। তবে পেটের আহার যোগাতে শরীরের এই ঘাটতি পঞ্চাশোর্ধ্ব আবুল কালামের কাছে তুচ্ছ। এক পায়েই সোনাগাজীতে চালাচ্ছেন অটোরিকশা। এতে তার জীবিকার চাকা কিছুটা সচল হলেও অভাব-অনটন নিত্যসঙ্গী।

সোনাগাজী উপজেলার চরছান্দিয়া ও চরদরবেশ ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় রিকশা চালান তিনি। এক পায়ে ছয় সদস্যের পরিবারের ভার। তাই শারীরিক সমস্যা হলেও প্রতিদিন তাকে রিকশা চালাতে হয়।

স্থানীয় ও এলাকাবাসী জানায়, আবুল কালামের পৈতৃক বাড়ি নোয়াখালীর চরজব্বর উপজেলার চর আলাউদ্দিন গ্রামে। নদী ভাঙনের কবলে পড়ে ২০০১ সালে সোনাগাজী উপজেলার চরদরবেশ ইউনিয়নে ঠাঁই হয় তার। জীবিকার তাগিদে ছোট ফেনী নদীতে ছোট নৌকায় মাছ শিকার করে পেটের আহার যোগাড় করতেন তিনি। ওই এলাকার আব্দুল খালেকের মেয়েকে বিয়ে করে সংসার জীবন শুরু করেন। তবে কিছুদিন যেতে জলদস্যুরা তার মাছ শিকারে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। নিষেধ অমান্য করে মাছ ধরায় জলদস্যুরা একাধিকবার তাকে মারধর করে। প্রতিবাদ কাল হয় আবুল কালামের জীবনে।

স্থানীয় মোরশেদ বলেন, ২০০১ সালের পরবর্তী সময়ে ছোট ফেনী নদীর উপকূলীয় এলাকা ছিল কয়েকটি জলদস্যু বাহিনীর অভয়ারণ্য। জলদস্যুরা এই এলাকা থেকে ট্রলারে সন্দ্বীপ উড়িরচর আদর্শগ্রামসহ বিভিন্ন এলাকায় গিয়ে ডাকাতি ও গরু-ছাগল-মহিষ লুট করে নিয়ে আসত। র‌্যাব ও পুলিশ একাধিকবার অভিযান চালিয়ে চোরাই গরু-মহিষসহ জলদস্যুদের গ্রেপ্তার করে এবং একাধিক জলদস্যু বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়। তারপর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তথ্য সরবরাহ করার সন্দেহে জলদস্যুরা আবুল কালামকে খুঁজতে থাকে। ২০০৭ সালে দিনদুপুরে জলদস্যুরা তার শ্বশুরবাড়িতে হানা দিয়ে তাকে ধরে নিয়ে একটি পা কেটে ইটালি মার্কেট এলাকায় ফেলে যায়।

আবুল কালাম বলেন, জলদস্যুরা পা কেটে ফেলার পর আট মাস পঙ্গু হাসপাতাল ও ঢাকার বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলাম। চিকিৎসা চালাতে সঞ্চয় করা টাকা খরচ হওয়ার পর বাড়িঘর বিক্রি করতে হয়েছে। এলাকায় ফিরে জলদস্যুদের হুমকিতে আইনের আশ্রয় নিতে পারিনি। পঙ্গু জীবনের শুরুতে চায়ের দোকান দিয়ে পরিবার নিয়ে কোনোরকম জীবন চালানো শুরু করি। ছয়-সাতবার চুরি সংঘটিত হলে চায়ের দোকান চালু রাখা সম্ভব হয়নি। স্ত্রী ও চার ছেলে মেয়ের ভরনপোষণের জন্য উপায়হীন হয়ে অটোরিকশা চালানো শুরু করি। ভিক্ষা করার চেয়ে রিকশা চালানো অনেক ভালো, বাম পা নেই তাতে কী হইছে, এক পা ও দুই হাত তো আছে। আল্লাহতো অন্তত জীবন বাঁচিয়ে রেখেছে। তাই রিকশা চালাইতাছি।

তিনি আরও বলেন, প্রথম দিকে ভারসাম্য রাখতে অসুবিধা হতো। এক পা না থাকায় মালামাল ধরে রিকশায় ওঠাতে পারি না বলে যাত্রীরা দুর্ঘটনার ভয়ে রিকশায় উঠতে চাইত না। এখন কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে গেছে। জমা দিয়ে পুরোটা দিন রিকশা চালান তিনি। প্রতিদিন ৩০০-৪০০ টাকা আয় হয়। এ টাকা দিয়ে সন্তানদের লেখা-পড়া থেকে শুরু করে অতিকষ্টে জীবন চালাতে হচ্ছে। শুষ্ক মৌসমে রিকশা চালানো গেলেও বর্ষার সময়ে গ্রামের রাস্তাঘাটে দুর্ঘটনার ভয়ে রিকশা চালানো বন্ধ রাখতে হয়। আর এ সময়টা পরিবার নিয়ে চরম অভাব-অনটনে পার করতে হয়। সরকারি  প্রতিবন্ধী ভাতা মাসে সাতশ টাকা পাই কিন্তু সামান্য টাকা দিয়েতো ছয়জনের সংসার চলে না। আমার নিজের জায়গা জমি নেই তাই সরকারি খাস জমিতে ঘর তুলে বসবাস করছি।

তিনি মানবিক দিক বিবেচনা করে তার নামে সরকারি জমি বন্দোবস্ত ও নগদ সহায়তা প্রদানের জন্য প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিদের কাছে আকুল আবেদন জানান।

চরদরবেশ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নুরুল ইসলাম ভুট্টু বলেন, ঘটনাটি আমাকে কেউ অবহিত করেনি। খোঁজ নিয়ে যদি সত্যতা মিলে তবে অবশ্যই সরকারি সহায়তার ব্যবস্থা করা হবে। একই সাথে ব্যক্তিগত অবস্থান থেকে পরিবারটির পাশে থাকব।

সোনাগাজী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কামরুল হাসান বলেন, এসব ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতা করার মতো ফান্ড নেই। আমি ব্যক্তিগতভাবে তার পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করব।