পারফরমার সাকিব আর অধিনায়ক সাকিব এক নন

সাকিব আল হাসান ২২ বছর বয়সে টেস্ট ক্রিকেটে অধিনায়কত্ব করেছেন। শচীন টেন্ডুলকার ২৩ বছর বয়সে অধিনায়ক হয়েছিলেন। সাকিব আল হাসান বাংলাদেশের সর্বকালের সেরা ক্রিকেটার। তিন ফরম্যাটেই র‍্যাংকিং বিচারে অলরাউন্ডার ছিলেন বহু সপ্তাহ। শচীন টেন্ডুলকারকে ভারতের কেবল সর্বকালের সেরা নয়, রীতিমতো ক্রিকেট ঈশ্বর বিবেচনা করেন অনেকে। আর পরিসংখ্যান বিচার করলে, শচীনই ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ব্যাটার। 

দুই প্রজন্মের, দুই দেশের ক্রিকেটারদের তুলনা আসছে কেন? কারণ সম্প্রতি তিন ফরম্যাটের ক্রিকেটেই বাংলাদেশ দলের অধিনায়কের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে নাজমুল হোসেন শান্তকে। নতুন নির্বাচক কমিটি ঘোষণা এবং এই সিদ্ধান্ত ইঙ্গিত দেয় বাংলাদেশ ভবিষ্যতের দিকে হাটছে। সাকিব আল হাসানের বয়স প্রায় ৩৭, উনি এখন সংসদ সদস্যও। ফলে সব মিলিয়ে, সাকিবকে সামনে বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক হিসেবে দেখার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে। 
কেমন ছিলেন অধিনায়ক সাকিব? এখানেই টেন্ডুলকারের সঙ্গে তুলনাটা টানা। ক্যারিয়ারের তুলনায় সাকিবের অধিনায়কত্বের রেকর্ড বেশ সাদামাটাই বলতে হয়, শচীনের ক্ষেত্রে তা আরো অনেক বেশি আর যদি বিগত বিশ্বকাপটা ধরি সাকিবের অধিনায়কত্বের শেষ অধ্যায়, তবে বলতেই হয়, শেষটা বড্ড বাজে হলো।

দল হিসেবে বাংলাদেশের পারফরম্যান্স ছিলো বিগত বিশ্বকাপে জঘন্য। আগের বিশ্বকাপে, ২০১৯ সালে, দল হিসেবে বাংলাদেশ খুব ভালো না করলেও সাকিব ছিলেন টুর্নামেন্টের অন্যতম সেরা। ব্যাটিং আর বোলিং দুইটিতেই। অথচ ২০২৩ বিশ্বকাপে সাকিব নিজেও ছিলেন ভয়াবহ ব্যর্থ। খেলা দেখে মনে হচ্ছিলো, সাকিব নামের চমকেও তরুণরা যথেষ্ঠ উজ্জীবিত হতে পারেন নাই।

এর সঙ্গে যদি যুক্ত হয় মাঠের বাইরের বিতর্ক, তবে সম্ভবত এই টুর্নামেন্টটাকে ধরতে হবে সাকিবের দীর্ঘ ক্যারিয়ারের সবচেয়ে অনুজ্জ্বল সময়। সাকিব এর আগেও একবার বিশ্বকাপে অধিনায়ক ছিলেন। সেই ২০১১ সালে। দেশের মাটিতে সেই বিশ্বকাপ নিয়ে অনেক আশা ভরসা থাকলেও ৫৮ আর ৭৮ রানের গ্লানিই দগদগে স্মৃতি হয়ে আছে। এমনকি ইংল্যান্ডের বিপক্ষে জয়ও তাতে তেমন একটা উপশম দেয়নি।

আবার এই ইংল্যান্ডের বিপক্ষেই পরের বিশ্বকাপে বাংলাদেশে পায় সবচেয়ে স্মরণীয় জয়, যা তাঁদেরকে পৌছে দেয় কোয়ার্টার ফাইনালে। সেইখানে হারলেও মাশরাফি মর্তুজার নেতৃত্বে বাংলাদেশ ওয়ানডে দলের ইতিহাসটাই পালটে যেতে থাকে। ঘরের মাঠে প্রায় অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠা দলটা বিদেশেও টুকটাক সাফল্য পায়। 

সাকিব আর মাশরাফি প্রায় সমসাময়িক যুগের খেলোয়াড় হলেও দুজনের অবদানে ছিল বিপুল ফারাক। অনেক প্রত্যাশা নিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করলেও মাশরাফি ইঞ্জুরির কারণে টেস্ট বেশিদিন খেলতে পারেননি। অধিনায়ক ছিলেন মাত্র এক ম্যাচে। সিরিজের মাঝখানে ইঞ্জুরিতে ছিটকে যাওয়ায় পরের ম্যাচটাতেই অধিনায়কত্বের অভিষেক হয় সাকিবের। এবং ম্যাচে ৮ উইকেট নিয়ে ও রান তাড়ায় ৯৬ রানে অপরাজিত থেকে ম্যাচ ও সিরিজ জেতানো সাকিবের অধিনায়ক হিসেবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের সেই ভাঙাচোরা দলের বিপক্ষে পারফরম্যান্সটাই সম্ভবত সেরা।

ফারাকের কথা যেটা বলছিলাম। মাশরাফি ২০১৫ এর পরে পরিণত হন ক্যারিশমাটিক অধিনায়কে। অন্যদিকে সাকিব ছিলেন মূলত পারফর্মার। দুইজন দুই ধারার। মাশরাফি একটা সময় দলকে একতাবদ্ধ করে, উজ্জীবিত করে অনেক জয় ছিনিয়ে এনেছেন প্রতিকূল অবস্থা থেকে। পরিসংখ্যানে এ যাবত সবচেয়ে সফল অধিনায়ক কেবল অধিনায়কত্বের কারণেই পরিণত হন তর্কসাপেক্ষে দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ক্রিকেটার হিসেবে। তর্কসাপেক্ষ, কারন, তখন দুর্দান্ত পারফরম্যান্স করে যাওয়া সাকিব ছিলেন ওই ব্যাপারে অধিনায়কের প্রতিদ্বন্দ্বী। কারিশমা বনাম পারফরম্যান্সের চিরন্তন লড়াই। 

কিন্তু, একটা জায়গায় দুইজনেরই মিল। দুইজনের শেষ বিশ্বকাপটাই হয় বাজেভাবে। সাকিবের দারুণ পারফরম্যান্সেও মাশরাফির ঘাটতি পোষানো যায়নি। ক্যারিশমা হারানো, অনেকটাই জোর করে খেলা যাওয়া মাশরাফিকে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে মনে হচ্ছিলো ক্লান্ত, উদ্যামহীন। ততোদিনে রাজনীতিতে প্রবেশ, সংসদ সদস্য হওয়ায় মাশরাফির জনপ্রিয়তাতেও কিছুটা ভাটা পড়ে। তিনি আর সর্বশ্রেণীর, সর্বমতের মানুষের ‘ক্যাপ্টেন’ থাকেন না। 

ওদিকে পারফরমার সাকিবও অধিনায়কত্ব থেকে দুরেই থাকছিলেন, অন্তত বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গা একদিনের ক্রিকেটে। কিন্তু, বিশ্বকাপের কিছুদিন আগে নাটকীয়ভাবে তিনি আবার সেই পদে ফিরে আসেন। বাংলাদেশ ক্রিকেটের আরেক নক্ষত্র, অধিনায়ক মাশরাফির দলের আরেক সেরা পারফর্মার, একসময়ের সেরা বন্ধু তামিম ইকবালের সঙ্গে সাকিবের চলতে থাকা বিবাদ একেবারে স্পষ্ট হয়ে উঠে।

খেলোয়াড় সাকিব কোনওকালেই বিনয়ের চর্চা করেননি । কোনও কোনও সময় অপ্রীতিকরও হয়ে উঠেন। কিন্তু, পারফর্মার সাকিব প্রতিবার এতে যেন আরো তেতে উঠেন। সাকিবের এই আচরণের সঙ্গে মিল পাওয়া যায় কিংবদন্তি শেন ওয়ার্নের। দুজনেই যতো উদ্ধত ততোই যেন আরো শাণিত। এই উদ্ধতপনাই যেন তাঁদের বড় চ্যালেঞ্জ। অস্ট্রেলিয়দের ক্রিকেট সংস্কৃতি বহু পুরনো, ইংল্যান্ডের মতো না হলে, তাঁতেও রক্ষণশীলতা আছে। সেই জেরে নানা বিতর্কের সঙ্গী ওয়ার্ন কখনো অধিনায়ক হতে পারেননি। অথচ বুড়ো বয়সে বাজির দরে সবচেয়ে পিছিয়ে থাকা দল রাজস্থান রয়েলসকে তিনি আইপিএলের প্রথম আসরে চ্যাম্পিয়ন করে দেখান যে অধিনায়ক হিসেবেও তাঁর বিপুল ক্যারিশমা ছিল। বাংলাদেশের ব্যাপারটা ভিন্ন, এখানে সাকিবকে অধিনায়ক হিসেবে উপেক্ষা করা কঠিন। তিনি আবার রাজমুকুট নিলেন গুরুত্বপূর্ন সময়ে।

শুধু তাই না, ২০২৩ বিশ্বকাপের আগে তামিমের সঙ্গে বিবাদটা প্রকাশ্যে করে, গণমাধ্যমে খোলাখুলি সাক্ষাৎকার দিয়ে চ্যালেঞ্জটা বাড়িয়ে নিলেন। সারাজীবন এই বাড়তি চ্যালেঞ্জটা তাঁকে তাতিয়েছে। হয়তো ভাবছিলেন, এবারও তা টনিকের কাজ করবে। 

কিন্তু, আমছালা দুইই গেল। ক্যারিশমাটিক অধিনায়ক তো হতে পারলেনই না, চাপে ভেংগে পড়লো পারফর্মার সাকিবও। এতো বছরের ক্যারিয়ারে এমনটা খুব কমই হয়েছে।

আবারও টেন্ডুলকার টেনে আনা যাক। কমেন্ট্রি বক্সে একবার সুনীল গাভাস্কার বলেছিলেন, শচীনের অধিনায়কত্বের সমস্যা হচ্ছে, তাঁর সঙ্গে অন্যদের দক্ষতার বিপুল তফাত। শচীন নিজে যেহেতু সেরা, তিনি আশা করেন বাকিরাও ওই লেভেলেই পারফর্ম করবে। কিন্তু, তিনি ভুলে যান যে বাকিদের সক্ষমতা তাঁর মতো নয়, তাঁরা সেভাবে পারবে না। আরেকটা বড় সমস্যা হলো, একটা দলে অধিনায়ক যখন বাকিদের চেয়ে এগিয়ে থাকেন তখন তিনি একাই দায়িত্বটা নিতে চান। বেশীরভাগ সময়েই এই বোঝাটা মাত্রারিক্ত হয়ে যায়। ফলাফল- ব্যর্থতা।

অধিনায়কত্ব নিয়ে সেরা বই দি আর্ট অফ ক্যাপ্টেনসিতে মাইক ব্রিয়ারলি বলেন, ‘কিছু কিছু সেরা খেলোয়াড় ভালো অধিনায়ক হন না, কারণ তাঁরা সাধারণ খেলোয়াড়দের সংগ্রাম টের পাননা। আপনাকে অন্য খেলোয়াড়দের প্রতি সহানূভুতিশীল হতে হবে।  আপনাকে কখনো কখনো পেছন থেকে ধাক্কা দিতে হবে।' 

প্রায় একই রকম কথা অস্ট্রেলিয়ার সর্বজয়ী অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ বলেন তাঁর আত্মজীবনী আউট অফ মাই কমফোর্ট জোনে।
সাকিবের পক্ষে এই কাজটাই করা দুরহ। তিনি হয়তো পারফরম্যান্স দিয়ে দলকে উদ্ধুধ করতে পারেন কিন্তু, অন্যদের পর্যায়ে নেমে এসে ভাবতে পারেন না। পেছন থেকে ধাক্কা দিতে পারেন না। আবার, হয়তো তরুণ খেলোয়াড়রা সাকিবের উপস্থিতিতেই একটা চাপে পড়ে যান।

আবার আসি শচীনের আলাপে। সিনিয়র আজহারউদ্দিনের অধিনায়কত্বে তিনি ছিলেন সেরা পারফর্মার। সমসাময়িক সৌরভ গাঙ্গুলী অধিনায়ক হিসেবে অনেক বেশী সফল। এমনকি বয়সে অনেক ছোট মহেন্দ্র সিং ধোনি আরো বেশি সফল হন বিশ্বকাপ জিতে। নিজে অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিলেও এই দুই অধিনায়কের সময়েই তিনি ছিলেন দলের প্রানভোমরা। তরুনদের ব্যাটনটা দিয়ে গেছেন আর নিজে পেয়েছেন বিপুল শ্রদ্ধা, মেন্টর হিসেবে। 
সাকিবের সম্ভবত সেই সৌভাগ্য হবে না। দেশের ইতিহাসে সেরা ক্রিকেটার হয়েও, অধিনায়ক হিসেবে ব্যর্থতার পাশাপাশি মেন্টরও সম্ভবত তিনি হতে পারবেন না। 

পারফর্মার সাকিব বাংলাদেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে উজ্জ্বল নক্ষত্র হলেও অধিনায়ক সাকিব অনেকটাই ম্রিয়মান প্রদীপ।