আজ ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস। একই দিনে বাংলাদেশে আরও ২টি গুরুত্বপূর্ণ দিবস- 'স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস' ও ‘সুন্দরবন দিবস’পালিত হচ্ছে। তবে ভালোবাসা দিবসের ভিড়ে যেন অন্য ২টি দিবস হারিয়ে গেছে। দেশের অনেক মানুষই জানেন না দিবস ২টি সম্পর্কে।
ভালোবাসা দিবস নিয়ে তরুণদের মাতামাতিতে গুরুত্ব হারিয়েছে 'স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস' ও ‘সুন্দরবন দিবস’। তরুণ সমাজের অনেকেই জানেন না বাকী ২টি দিবস সম্পর্কে। রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে ১৪ই ফেব্রুয়ারি দেশে কয়টি দিবস পালিত হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ভালোবাসা দিবস ও পহেলা ফাল্গুন যৌথভাবে পালন করা হচ্ছে। এর বাইরে তার আর কোনো দিবস সম্পর্কে জানা নেই।
একই প্রশ্ন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরেক শিক্ষার্থীকে করা হলে তিনি ভালোবাসা দিবসের পাশাপাশি সুন্দরবন দিবসের কথা জানলেও জানেন না স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের কথা। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের এই শিক্ষার্থীরা বাকি ২টা দিবসের কথা কিংবা এর গুরুত্ব সম্পর্কে জানতে না পারলেও প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও জানেন ১৪ই ফেব্রুয়ারি ভালোবাসা দিবস।
অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক কামাল উদ্দীন বলেন, আমাদের কাছে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবসের গুরুত্ব অনেক। এরশাদ সরকারের পতনের পর শুরুর দিকে খুব গুরুত্বের সঙ্গে স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস পালন করা হতো। তখনও আমাদের দেশে ভালোবাসা দিবসের প্রচলন শুরু হয়নি। আমাদের রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণেই স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস নিয়ে মানুষের আগ্রহ কমছে। যে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কিংবা বাম দলগুলো এরশাদ সরকারের পতন ঘটাতে আন্দোলন করেছে তারাই তো এখন এই দিবসের কথা ভুলে গেছে। তরুণ প্রজন্মকে দোষ দিয়ে লাভ কী।
তিনি বলেন, বিশ্বের তাপমাত্রা যেভাবে বাড়ছে তাতে করে সুন্দরবন আমাদের রক্ষাকবচ। অথচ এই দিবস নিয়ে কোনো মাতামাতি নেই। এটা হতাশাজনক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে ফেসবুকের জনপ্রিয়তা ও সম-সাময়িক বাস্তবতার কারণে তরুণদের মধ্যে ভালোবাসা দিবস নিয়ে আগ্রহ বেশি। তবে আলাদা আলাদাভাবে সমান গুরুত্ব দিয়ে যদি ৩টি দিবসই পালন করা হতো তাহলে খুব ভালো হতো।
২০০১ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের আয়োজনে প্রথম জাতীয় সুন্দরবন সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এই সম্মেলনে খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়, খুলনার স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন রূপান্তর ও পরশের উদ্যোগে এবং দেশের আরও ৭০টি পরিবেশবাদী সংগঠন অংশ নিয়েছিলো। সেই সম্মেলনে ১৪ ফেব্রুয়ারিকে ‘সুন্দরবন দিবস’ ঘোষণা করা হয়। এরপর থেকে বেসরকারি ভাবে এই দিনটিকে সুন্দরবন দিবস হিসেবে পরিবেশ বাদীরা পালন করে আসছেন। দীর্ঘদিন ধরে এই দিবসটিকে জাতীয় ভাবে স্বীকৃতি প্রদানের দাবি জানানো হলেও কার্যকর সাড়া মিলছে না। সুন্দরবনের জীববৈচিত্র রক্ষা ও মানুষের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টির লক্ষ্যে এই দিবসটি গুরুত্ব বহন করে।
অপরদিকে ১৯৮৩ সালের ১৪ই ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এরশাদ সরকারের বিতর্কিত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন, যা পরবর্তীতে গণআন্দোলনে রূপ নিয়েছিল। এরশাদ সরকারের শিক্ষামন্ত্রী ড. মজিদ খান ১৯৮২ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর একটি নতুন শিক্ষানীতির প্রস্তাব করেন। সেখানে প্রথম শ্রেণি থেকেই আরবি ও দ্বিতীয় শ্রেণি থেকে ইংরেজি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা হয়। উচ্চশিক্ষা অর্জনের জন্য মাপকাঠি করা হয় মেধা অথবা ৫০ শতাংশ ব্যয়ভার বহনের ক্ষমতা। ফলে সেই ধর্মভিত্তিক ও বাণিজ্যিকীকরণ শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ১৭ সেপ্টেম্বর আন্দোলনের বিষয়ে একমত হয় ছাত্র সংগঠনগুলো। তারপর শুরু হয় ছাত্র আন্দোলন, কালক্রমে যেটি গণ-আন্দোলনে রূপ নিয়েছিল।
১৪ই ফেব্রুয়ারিতে স্মারকলিপি দিতে শিক্ষার্থীরা মিছিল করে সচিবালয়ের দিকে রওনা হন। সেই মিছিলে গুলি চালায় পুলিশ। এতে জয়নাল মোজাম্মেল, আইয়ুব ও দীপালি সাহাসহ বেশ কয়েকজন নিহত হন। সেই কারণেই ১৪ ফেব্রুয়ারি স্বৈরাচার প্রতিরোধ দিবস হিসেবে পালন করা হয়।