সাগরিকাদের হাতে সাফ উনিশের শিরোপা

সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ ওমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপের বিতর্কিত ফাইনাল শেষে যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন ঘোষণা করা হয়েছিল স্বাগতিক বাংলাদেশ ও ভারতকে। সাফের এই সিদ্ধান্ত কারোই মনপুত হয়নি। তারপরও সাফের স্বার্থেই মানতে হয়েছে। কমলাপুরে সে রাতে শিরোপাটা ভারতকে দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। সাফের সদর দফতর ঢাকায় তাই বাংলাদেশের শিরোপাটা পরে দেওয়া হবে জানানো হয়েছিল। রবিবার বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের আঙিনায় সেই আনুষ্ঠানিকতা সেড়েছে সাফ।

যুগ্ম চ্যাম্পিয়ন শিরোপা বাংলাদেশের খেলোয়াড়দের হাতে তুলে দিয়েছেন সাফ সাধারণ সম্পাদক আনোয়ারুল হক হেলাল। শ্রীলঙ্কার ম্যাচ কমিশনারের ভুলে গোলমাল পাকিয়ে যায় ফাইনালের শেষটা। বাইলজ পাশ কাটিয়ে দুই কূল রক্ষা করতে যুগ্ম চ্যাম্পিয়নের সিদ্ধান্ত নিতে সাফের কর্তারা কাটিয়ে দেয় প্রায় আড়াই ঘন্টা। এরপর ঘোষণা অনুযায়ী দু'দলের অধিনায়ক ও সহ-অধিনায়কের হাতে শিরোপা তুলে দেওয়ার মধ্য দিয়েই শেষ হয় পুরস্কার বিতরণী আনুষ্ঠানিকতা। সে রাতে ব্যক্তিগত স্বীকৃতিগুলো আর দেওয়া হয়নি। তবে রবিবার ঠিকই সেটা দিয়েছে সাফ। বাংলাদেশকে শিরোপা জেতাতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখা স্ট্রাইকার সাগরিকার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে টুর্নামেন্ট সেরার পুরস্কার। এছাড়া চার গোল করায় ভারতের সিবানী দেবী ও পূজার মতো সেরা গোলদাতার খেতাব পেয়েছেন সাগরিকাও। টুর্নামেন্টের সেরা গোলকিপার হয়েছেন ভারতের আনিকা দেবী।

৮ ফেব্রুয়ারি কমলাপুরের বীরশ্রেষ্ঠ শহীদ সিপাহী মোস্তফা কামাল স্টেডিয়ামে হয়েছিল ফাইনাল। আট মিনিটে সিবানী দেবীর গোলে লিড নিয়েছিল ভারত। এরপর জোড় চেষ্টা চালিয়েও সেই গোল শোধ দেওয়া যাচ্ছিলো না। ম্যাচের শেষ বাঁশি বাজার আগ মুহূর্তে বাংলাদেশের শিবিরে আনন্দের বন্যা বইয়ে দেন সাগরিকা। যোগ করা সময়ে তার অসাধারণ গোলে ম্যাচের ভাগ্য গড়ায় টাইব্রেকারে। পাঁচ শটের টাইব্রেকার থাকে ৫-৫ অমিমাংসীত। অবিশ্বাস্যভাবে সাডেন ডেথের পরের ছয় শটেও হয়নি শিরোপার মীমাংসা। ১১জনের চক্রপূরণের পর নিয় অনুযায়ী মীমাংসা না হওয়া পর্যন্ত চলার কথা ছিল পেনাল্টি শ্যুটআউট। তবে সেটা করতে দেননি দায়িত্বে থাকা লঙ্কান ম্যাচ রেফারী ডিলান ডি সিলভা জয়াসুরিয়া। মাঠে ঢুকে রেফারিকে ডেকে কয়েন টসে শিরোপার নিস্পত্তির নির্দেশ দেন। সেটা মেনে রেফারি টস করেন। তাতে জয়ী হয়ে শিরোপা উদযাপনে মেতে ওঠে ভারতের মেয়েরা। নিয়মের বাইরে গিয়ে ম্যাচ কমিশনারের টসের সিদ্ধান্তের তীব্র প্রতিবাদ জানায় বাংলাদেশ। নিয়ম বই ঘেটে ম্যাচ কমিশনার বুঝতে পারেন বড় ভুল হয়ে গেছে। সেটা সুধরাতে মাঠে গিয়ে দু'দলকে পেনাল্টি শ্যুটআউট চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। সেটা তখন ভারত মেনে নেয়নি। তারা এর প্রতিবাদ করে এক পর্যায়ে মাঠ ছেড়ে যায়। এর আড়াই ঘন্টা পর আসে শিরোপা ভাগাভাগির সিদ্ধান্ত। যদিও বাইলজ অনুযায়ী বেঁধে দেওয়া সময়ের মধ্যে কোন দল মাঠে খেলতে না আসলে প্রতিপক্ষকে বিজয়ী ঘোষণার বিধান ছিল। সেটা অবশ্য সাফ মানেনি। দক্ষিণ এশিয়ার ফুটবলের মোড়ল বলেই ভারতকে ক্ষেপাতে চায়নি সাফ। তাই আড়াই ঘন্টা পর তারা নেয় যুগ্ম চ্যাম্পিয়নের সিদ্ধান্ত।

শিরোপা নিয়ে বিতর্কে অবশ্য গুরুত্ব কমেনি সাগরিকা পারফরম্যান্সের। এই টুর্নামেন্ট আসলে জীবনটাই বদলে দিয়েছে ঠাকুরগাঁওয়ের অনগ্রসর জনপদ রাণীশংকৈলের অঁজ পাড়া গাঁ রাঙাটুঙ্গি থেকে উঠে আসা মেয়েটির। নেপালের বিপক্ষে জোড়া গোলে শুরু। এরপর বাংলাদেশ লিগপর্বে সেরা হয় মূলত ভারতের বিপক্ষে তার জয়সূচক গোলে। আর ফাইনালের শেষ মুহূর্তে তার সমতাসূচক গোল বাঁচিয়ে রাখে বাংলাদেশের শিরোপা স্বপ্ন। তাই মিলেছে আসর সেরার স্বীকৃতি। সেই সঙ্গে সেরা গোলদাতার পুরস্কার। এত প্রাপ্তির প্রতিক্রিয়ায় সাগরিকা এখন স্বপ্ন দেখেন সিনিয়র জাতীয় দলের জার্সিতে আলোকিত হওয়ার, ' অনূর্ধ্ব–১৭, অনূর্ধ্ব–১৯ পেরিয়ে আমার লক্ষ্য বাংলাদেশ জাতীয় দল। জানি সুযোগ পাওয়া অনেক কঠিন। আমার পজিশনে সাবিনা আপু, শামসুন্নাহার আপুরা আছেন। দলে আছেন সানজিদা আপু। আমাদের জাতীয় দল খুবই ভালো। সেখানে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ছাড়া জায়গা পাওয়া খুব কঠিন। আমাকে এখন প্রচণ্ড পরিশ্রম করতে হবে।’টুর্নামেন্ট সেরা হওয়ার খবরটা রবিবার সকালেই জানতে পারেন সাগরিকা। তাই খুশিটা তার বাঁধ ভাঙা।

অধিনায়ক আফিদা খন্দকার এখন নিয়মিতই খেলছেন সিনিয়র জাতীয় দলে। তবে এই বয়সভিত্তিক শিরোপাকে এগিয়ে রাখছেন তিনি, 'আমি সিনিয়র জাতীয় দলে খেলি। তবে আমার নেতৃত্বে অনূর্ধ্ব-১৯ শিরোপা জিতেছে বাংলাদেশ। তাই এটার গুরুত্ব অনেক বেশি আমার কাছে। তবে এখানেই শেষ নয়। এই শিরোপা আমাদের আগামীতে অনুপ্রাণিত করবে।'