সংসদের বিরোধী দল জাতীয় পার্টির সাম্প্রতিক ভাঙনে সরকারের হাত থাকার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের। অভিযোগটি কিন্তু জাপা করেনি। অভিযোগের তীর ছোড়া হয়েছিল বিএনপির দিক থেকে। ওবায়দুল কাদের সেই অভিযোগেরই জবাব দিয়েছেন। নির্বাচনের আগে, নির্বাচনে আসা না আসার গুঞ্জনের মধ্যে জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের অভিযোগ ছিল বিএনপি জাপার তত ক্ষতি করেনি, যত করেছে আওয়ামী লীগ। তখন জিএম কাদের একটু একটু সরকারবিরোধী ভাবভঙ্গি নিয়েছিলেন। পরে আবার চিত্র বদলে গেছে। দেবর-ভাবির সংঘাতে সত্যি সত্যিই আরেক দফায় ভেঙে গেল জাতীয় পার্টি। এ নিয়ে ছোট-বড় মিলিয়ে সাত-আট দফায় ভাঙল দলটি।
জাতীয় পার্টির এবারের ভাঙনেও ঘটনার ঘনঘটা। কথার তেজ মারাত্মক। এক এক জনের যুক্তি বড় কড়া। সবমিলিয়ে একটা আনলিমিটেড বিনোদন। মেগা সার্কাস। দেবরপন্থি নেতাদের কেউ বলছেন, রওশন এরশাদ ভারসাম্যহীন। পাগলে কি না বলে। তিনি জাতীয় পার্টির কেউ না। তার ডাকা কাউন্সিলে কিছু যায় আসে না। এ ধরনের কথা বলা নেতাদের কয়েকজন কিছুদিন আগেও ছিলেন রওশনপন্থি। তাদের কেউ কেউ বেগম রওশন এরশাদকে মা সম্বোধন করতেন। বিনিময়ে পদ-পদবিসহ নানান সুবিধা বাগিয়েছেন।
আবার এখন তার পক্ষে আসা নেতাদের কয়েকজন এক সময় ছিলেন যারপরনাই জিএম কাদেরপন্থি। প্রশংসা করতে করতে তারা জিএম কাদেরকে বাংলাদেশের রাজনীতির ম্যাজিশিয়ান পর্যন্ত বলেছেন। এর মধ্যে ভাবিপন্থিদের কথাও কম বাঁকা নয়। তাদের কেউ বলছেন, জাতীয় পার্টিতে এখন দলের চেয়ে বউ বড়। এ ধরনের কথামালার মধ্য দিয়ে এরইমধ্যে দলটিতে দেবরের বলয়ে পড়ে গেছে ভাবির ছোবল। নিজে চরম বার্ধক্যে এসেও দলে যৌবন ফেরাতে চান রওশন এরশাদ। সেই লক্ষ্যে দলের বিপর্যয় কাটাতে ৯ মার্চ জাতীয় পার্টির কাউন্সিল ডেকেছেন তিনি। এ সম্মেলন বাস্তবায়নের মূল দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে কাজী ফিরোজ রশীদকে। রবিবার সংবাদ সম্মেলন করে রওশন এরশাদের কাউন্সিল ঘোষণার পর পরই তাকে দলের বাইরের লোক মন্তব্য করে জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেছেন, এতে কিছু যায় আসে না।
এমন আজব এবং আচানক কাণ্ডকীর্তি জাতীয় পার্টিতে নতুন নয়। এবার জাতীয় নির্বাচনে যাওয়া-না যাওয়াকে ঘিরে নানা নাটকীয়তা ও নির্বাচনের পর আবারও ভাঙনে পড়ল জাতীয় পার্টি। সংবাদ সম্মেলনে কাজী ফিরোজ ও বাবলাকে দেখিয়ে রওশন এরশাদ বলেছেন, আমার দু’পাশে যারা রয়েছেন তারা জাতীয় পার্টি ও বাংলাদেশের রাজনীতির দুই দিকপাল। তারা জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে অনন্য ভূমিকা পালন করে আসছেন। পার্টির জন্য তারা জেল-জুলুম, অত্যাচার-নির্যাতন সহ্য করেছেন। জাতীয় পার্টির প্রতিষ্ঠাতা পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ এবং আমার পাশে তারা সব সময়ই ছিলেন এবং এখনো আছেন। এ সময় জাপা চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদকে আহ্বায়ক, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলাকে কো-আহ্বায়ক, গোলাম সরোয়ার মিলনকে যুগ্ম আহ্বায়ক, সফিকুল ইসলাম সেন্টুকে সদস্য সচিব এবং অ্যাডভোকেট জিয়াউল হক মৃধাকে কোষাধ্যক্ষ করে দশম জাতীয় সম্মেলন বাস্তবায়ন কমিটি ঘোষণা করেন তিনি।
রওশন এরশাদের কাউন্সিল ঘোষণার পর নড়াচড়া দুদিকেই। একটু একটু করে তার পাল্লা ভারী হচ্ছে। নেতাকর্মীতে খরার টান পড়ে যায় জাপা চেয়ারম্যান জিএম কাদেরের বনানী কার্যালয়ে। তা কাকরাইল অফিসেও। সেইসঙ্গে দলের বিদ্রোহীদের সঙ্গেও আপসহীন সিদ্ধান্তে অনড় জিএম কাদের। দলীয় শৃঙ্খলাভঙ্গের অভিযোগে একের পর এক দল থেকে বহিষ্কার ও অব্যাহতি দিচ্ছেন শীর্ষ নেতাকর্মীদের। রওশন এরশাদের সঙ্গে হাত মেলার অভিযোগে তাৎক্ষণিকভাবে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে সৈয়দ আবু হোসেন বাবলাকে। এ নিয়ে চলছে চরম বিশৃঙ্খলা।
এর আগে, গত ২৮ জানুয়ারি গুলশানের নিজ বাসভবনে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনে মনোনয়ন ও আর্থিক সুবিধাবঞ্চিত, পার্টির বহিষ্কৃত ও অব্যাহতিপ্রাপ্ত, স্বেচ্ছায় পদত্যাগকারী নেতাকর্মীদের নিয়ে এক মতবিনিয় সভার আয়োজন করেন জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। সেই মতবিনিময় সভা থেকে দলের বর্তমান চেয়ারম্যান জিএম কাদের ও মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নুকে অব্যাহতি দিয়ে নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা করেন রওশন এরশাদ। ২৯ জানুয়ারি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হিসেবে রওশন এরশাদের দায়িত্ব গ্রহণ এবং কমিটির বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেন এ অংশের মহাসচিব কাজী মামুনুর রশীদ।
১৯৮৫ সালের প্রথম দিকে এরশাদ দুটি প্রধান বিরোধী জোটে ভাঙন সৃষ্টিতে সক্ষম হন। আওয়ামী লীগের সিনিয়র নেতা কোরবান আলী ও বিএনপির সিনিয়র নেতা আবদুল হালিম চৌধুরীকে মন্ত্রিত্ব দেন এরশাদ। ১৫ দলীয় জোটের শরিক দল মিজানুর রহমান চৌধুরীর নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের খণ্ডাংশ, ৫ জোটের শরিক ইউপিপির কাজী জাফর আহমেদ এবং সিরাজুল হোসেন খানের গণতন্ত্রী দল জোট ছেড়ে এরশাদের সঙ্গে যোগ দেয়। এরই মধ্যে বিএনপির একটি অংশের নেতা শামসুল হুদা চৌধুরী ও ড. এম এ মতিন এবং আওয়ামী লীগের সাবেক চিফ হুইপ শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন এরশাদের সঙ্গে হাত মেলান। তার বাইরে জিয়াউদ্দিন আহমেদ, আনিসুল ইসলাম মাহমুদের মতো বিএনপির কিছু নেতা, মুসলিম লীগের একাংশের নেতা সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী, দলবিহীন বিশেষ ব্যক্তিত্ব আনোয়ার হোসেন মঞ্জুও এরশাদের হাতকে শক্তিশালী করতে এগিয়ে আসেন। ফলে, জনগণের মধ্যে এরশাদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ে। ১৯৮৫ সালের ১৬ আগস্ট এরশাদ তার জনদল, বিএনপির একাংশ, ইউপিপি, গণতান্ত্রিক পার্টি ও মুসলিম লীগের সমন্বয়ে গঠন করেন জাতীয় ফ্রন্ট। একপর্যায়ে কাজী জাফর স্বেচ্ছায় ইউপিপি ভেঙে দিয়ে এরশাদের দলে যোগ দেন। ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি ‘সরকারি’ রাজনৈতিক দল জাতীয় পার্টির আত্মপ্রকাশ।
সেই জাপায় এখন কত যে ব্র্যাকেট। প্রায় ডজন। জাতীয় পার্টির ওয়েবসাইটের তথ্যানুযায়ী, ১৯৮৬ সালের ১ জানুয়ারি এক সংবাদ সম্মেলনে পাঁচটি রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে জাতীয় পার্টি গঠনের ঘোষণা দেন এরশাদ। ১৯৯৬ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সংখ্যাগরিষ্ঠ দল হিসেবে সরকার গঠনের সময় জাতীয় পার্টি প্রথমে তাদের সমর্থন দিলেও পরে ১৯৯৯ সালে চারদলীয় জোটে চলে যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ। তার এ সিদ্ধান্তের বিরোধিতা করেন তৎকালীন যোগাযোগমন্ত্রী ও জাতীয় পার্টির নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। তিনি আওয়ামী লীগের সঙ্গে থেকে যান এবং জাতীয় পার্টি নামে নতুন দল গঠন করেন। যেটি এখন জাতীয় পার্টি (জেপি) নামে পরিচিত। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে এরশাদ আবার বিএনপির নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট থেকে বেরিয়ে যান।
কিন্তু তার দলের নেতা ও সাবেক মন্ত্রী নাজিউর রহমান মঞ্জুর নেতৃত্বে একটি অংশ জোটে থেকে যায় এবং জাতীয় পার্টি নামে আরেকটি দল গঠিত হয়। পরবর্তী সময়ে এ অংশের নাম হয় বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি)। কিন্তু তাদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি হয়। এরপর বিজেপি ভেঙে সাবেক মন্ত্রী এম এ মতিন করেন বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (এম এ মতিন)। এরশাদের জীবদ্দশায় সর্বশেষ জাতীয় পার্টি ভেঙে বেরিয়ে যান তার পুরনো রাজনৈতিক সহকর্মী কাজী জাফর আহমেদ। ২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে এরশাদকে দল থেকে বহিষ্কার করেন কাজী জাফর। আলাদা জাতীয় পার্টি গঠন করে যোগ দেন বিএনপি-জামায়াত জোটে। এটি জাতীয় পার্টি-কাজী জাফর নামে পরিচিত। এরশাদের মৃত্যুর পর তার প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে সাবেক স্ত্রী বিদিশার ইচ্ছায় ‘জাতীয় পার্টি পুনর্গঠন প্রক্রিয়া’ নামের আরেকটি দল হয়। এটির বর্তমান চেয়ারম্যান বিদিশা। সর্বশেষ সম্প্রতি এরশাদের স্ত্রী রওশন এরশাদ দেবর জিএম কাদেরকে জাতীয় পার্টি থেকে অব্যাহতি দিয়ে আরেক দফায় দলে ভাঙন ধরান।
২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর জাপার বর্তমান কমিটির মেয়াদ ফুরিয়েছে। কবে সম্মেলন হবে এ প্রশ্ন করায় সাংবাদিকদের ওপর চটেছেন মহাসচিব চুন্নু। তার পাল্টা প্রশ্ন- সম্মেলন নিয়ে সাংবাদিকরা এত উতলা কেন? জাপার এ দশায় ভেতরে ভেতরে একটা ফুরফুরে বাতাস বইছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ এবং ক্ষমতাহীন বিএনপি দুদলেই। বড় ওই দুদলের মধ্যে এই দলটি একটা আপদের মতো। সব দিক থেকে মাজা ভাঙা জাপা এখন আরও দুর্বল হয়ে গেছে, ফোঁসফাঁসের শক্তি নেই। মাঝেমধ্যে ভাব নিয়ে ভ্যালু তৈরির সামর্থ্যও হারিয়ে গেছে। এমন হিসাব ক্ষমতাসীন মহলের জন্য ভালো খবর। বিএনপির কাছেও সুখবর। জাতীয়তাবাদী রাজনীতিতে ভাগ বসিয়ে কেওয়াজ তৈরির আপদের বিদায় হচ্ছে ভেবে তাৎক্ষণিক স্বস্তি বিএনপির জন্য।
লেখক: সাংবাদিক-কলামিস্ট
mostofa71@gmail.com