দেশে বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার পাশাপাশি যুগোপযোগী শিক্ষা হিসেবে কারিগরি শিক্ষা অন্যতম। প্রযুক্তির ছোঁয়ায় হাতে-কলমে বাস্তবধর্মী শিক্ষাই হলো কারিগরি শিক্ষা। অর্থাৎ যে শিক্ষা ধরাবাঁধা নিয়মের বাইরে গিয়ে কোনো একটি নির্দিষ্ট বিষয়ে শিক্ষার্থীকে দক্ষ এবং বাস্তবসম্মত জ্ঞানের অধিকারী হিসেবে করে গড়ে তোলে। কারিগরি শিক্ষার গুরুত্ব দেশে এতটাই বেশি, যা আমরা প্রাত্যহিক জীবনে অনুভব করছি। দৈনন্দিন জীবনে ছোটখাটো জিনিসপত্র থেকে শুরু করে বৃহৎ কোনো মেরামত কাজেও হাতের কাছে সময়মতো লোক পাওয়া যায়। তাই সাম্প্রতিক সময়ে প্রতিযোগিতার বাজারে কারিগরি শিক্ষা যোগ্য প্রতিযোগী তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
ওয়েল্ডিং ইঞ্জিনিয়ারিং
শিল্প কারখানায় উৎপাদন করতে হলে প্রয়োজন ধাতু বা লোহাকে জোড়া দেওয়া। বর্তমানে প্রায় সব ধাতু এমনকি প্লাস্টিক ও ওয়েল্ডিং করে জোড়া দেওয়া হচ্ছে। যে ওয়েল্ডিং করে তাকে বলা হয় ওয়েল্ডার। দেশ এবং বিদেশের সব শিল্প কারখানাতে ওয়েল্ডারের চাহিদা আছে। ওয়েল্ডিং ট্রেডের মূল উদ্দেশ্য হলো ওয়েন্ডার তৈরি করা। এই ট্রেডের কিছু সংখ্যক মেধাবী শিক্ষার্থী উচ্চতর শিক্ষা লাভ করে শিল্প কারখানায় দক্ষ কারিগর এমনকি প্রকৌশলী হিসেবে দেশের শিল্পায়নে ভূমিকা রাখে। বিভিন্ন কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ৩ ও ৬ মাস মেয়াদি কোর্সে ওয়েল্ডিং ইঞ্জিনিয়ারিং প্রশিক্ষণ দিয়ে থাকে।
রেফ্রিজারেশন অ্যান্ড এয়ারকন্ডিশন
টেকনিক্যাল কাজ হওয়ার কারণে এই সেক্টরে অভিজ্ঞদের প্রাধান্য সব থেকে বেশি দেওয়া হয়। বুদ্ধিমানের কাজ হবে প্রথমেই শিক্ষানবিশ হিসেবে কোনো প্রতিষ্ঠানে যোগ দেওয়া। তারপর যে কোনো একটি কনজিউমার সার্ভিস সেন্টারে সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে যোগ দিতে পারেন সহজে। আপনার কাজ হবে এয়ার কন্ডিশনার বা রেফ্রিজারেটর মেরামত করা, যা ওই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক তৈরি এবং বিক্রি হয়েছিল। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার পরে, আপনি মেনটেন্যান্স প্রকৌশলী হতে পারবেন। তখন আপনার কোম্পানির ক্লায়েন্টদের নিয়মিত সার্ভিসিং ছাড়াও প্রতিষ্ঠানে থাকা যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব থাকবে। কয়েক বছরের অভিজ্ঞতা হলে আপনি কয়েকজন সার্ভিস ইঞ্জিনিয়ারের দলনেতা হিসেবে সুপারভাইজার ইঞ্জিনিয়ার হতে পারেন। এভাবে অভিজ্ঞতা এবং দক্ষতা বলে একদিন সংস্থার প্রোডাকশন ম্যানেজার হতে পারবেন। বিদেশে এয়ারকন্ডিশনার বা অন্যান্য বৈদ্যুতিক সরঞ্জামগুলোর ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা বেশি।
মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
শিল্পোন্নত ও উন্নয়নশীল দেশগুলোয় মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের চাহিদা বাড়ছে। জাহাজ শিল্প ও মোটরযান শিল্পের বিকাশ এবং জ¦ালানি ও শক্তি সংকট উত্তরণে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে গুরুত্ব দেওয়ার ফলে এর চাহিদা বেড়েই চলছে। দেশের বাইরে বিভিন্ন অটোমোবাইল প্রতিষ্ঠানে, ইনটেল থেকে শুরু করে আরও অনেক বহুজাতিক, আন্তর্জাতিকমানের প্রতিষ্ঠানেও বাংলাদেশের অনেক যন্ত্রকৌশলী নিজের যোগ্যতায় গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ, বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন ও রেলওয়ে সেক্টরসহ সব যন্ত্রযাননির্ভর সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের চাকরির সুযোগ রয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন শিল্পকারখানায় যন্ত্র ও মেশিনারিজ শাখায় এবং বাংলাদেশ সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী, বিমানবাহিনীসহ সব সামরিক বাহিনীতে ট্যাংক, যুদ্ধজাহাজ, হেলিকপ্টার, নৌজাহাজ, অস্ত্র, গোলা-বারুদ ইত্যাদি তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে যন্ত্রপ্রকৌশলী হিসেবেও রয়েছে চাকরির সুযোগ।
অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং
বর্তমানে কর্মমুখী শিক্ষার মধ্যে অন্যতম হলো অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিং। সম্ভাবনাময় অটোমোবাইল শিল্পে কাজ করতে প্রয়োজন বেশ কিছু দক্ষ অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার। অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার গাড়ির ডিজাইন, যন্ত্রাংশ নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের কাজ করে থাকেন। দেশে এ খাতে কাজের সুযোগ দিন দিন বাড়ছে। অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারের ক্যারিয়ার অভিজ্ঞতা ও কাজ জানার ওপর নির্ভর করে। এন্ট্রি লেভেলে অ্যাসিস্ট্যান্ট ইঞ্জিনিয়ার হিসেবে কাজ শুরু করতে পারবেন। অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়াররা চাইলে নিজেরাই প্রতিষ্ঠা করতে পারেন কার সার্ভিস সেন্টার।
ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং
শিল্পায়ননির্ভর এ সময় যে কয়েকটি পেশাকে সবচেয়ে সম্ভাবনাময় ধরা হয়, ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং তাদের মধ্যে একটি। একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার বিভিন্ন শিল্পে ব্যবহৃত যন্ত্রের ডিজাইন, নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণের কাজ করে থাকেন। ইলেকট্রিক্যাল ও ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং এমন একটি বিষয়, যার চাহিদা কখনো কমবে না, দিন দিন বৃদ্ধি পাবে। অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের অর্থনীতি ক্ষেত্রেও এই সেক্টরের ব্যাপক অংশগ্রহণ রয়েছে। ফলে নতুন নতুন কর্মক্ষেত্র সৃষ্টি হচ্ছে। এর প্রাধান্য প্রথম সারিতে থাকায় মেধাবী শিক্ষার্থীরা ঝুঁকে পড়ছে এই বিষয়ে। যার ফলে বাংলাদেশ প্রযুক্তির সঙ্গে সঙ্গে উন্নয়নের পথে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারদের দেশের পাশাপাশি বিদেশেও ব্যাপক চাহিদা রয়েছে।