লড়ে পেলাম মায়ের ভাষা

ভাষা প্রাচীনকাল থেকে সভ্যতার বিকাশ ও মানুষের জয়যাত্রাকে এগিয়ে নিয়ে এসেছে আজ অবধি। ভাষা মানুষের মনের ভাব ও মাধুর্য প্রকাশের একমাত্র বাহন। ভাষাকে তাই সর্বদা আধিপত্যবাদী গোষ্ঠী-রাষ্ট্র সবসময় দাবিয়ে রাখতে চেষ্টা করেছে। ভাষার মধ্য দিয়ে প্রতিটি মানুষ তার নিজের কৃষ্টিকে আঁকড়ে ধরে, নিজস্ব ভাষার মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা সব ভাষার মানুষের প্রধান অধিকার। নিজের ভাষা অন্য ভাষার রোষানলে পড়লে যেমন ভাষা হারিয়ে যায়, ঠিক তেমনি করে হারিয়ে যায় ভাষার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষ-মানুষের সংস্কৃতি। যে ভাষার ওপর অন্য ভাষা চেপে বসে সে ভাষার মানুষেরা আর মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। নিজ মাতৃভূমে নিজের ভাষার বদল ঘটলে মনের ব্যথা প্রকাশের আর মাধ্যম কই? তারা কোণঠাসা হয়ে পড়ে, বুকের ভেতর চাপা কষ্ট নিয়ে সে কারণে এমন ভাষার ওপর যখন আঘাত এসেছে দেশে দেশে, তখন ভাষাপ্রিয় মাতৃ-সন্তানরা আন্দোলনে ফেটে পড়েছে, জীবন দিয়েছে লড়াই করতে করতে। ভাষা নিয়ে লড়াইয়ের নজির বিভিন্ন দেশের ইতিহাস সাক্ষ্য দিচ্ছে যুগ যুগ ধরে। মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষার লড়াইয়ে দেখা যায় একেবারে কম দেশের মানুষ আজ অব্দি যুক্ত হয়নি। ইতিহাস বলছে, ভাষার লড়াইয়ে শামিল হয়েছে ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, লাটভিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকাসহ পৃথিবীর বহু প্রান্তের নিপীড়িত মানুষের দল।    

২.

বিশ্ব ভাষাবৈচিত্র্যে অনন্য এক ভাষাভূমি বাংলাদেশ। বাংলাদেশ নামের আমাদের এই ভূখন্ডেও ঘটেছিল ভাষার লড়াই। দেশভাগের পর পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর কালো ছায়া এসে পড়ে আমাদের প্রিয় মাতৃভাষা বাংলার ওপর। যে ভাষার মধ্য দিয়ে বাঙালি জাতি তার আত্ম-উন্মোচনের স্বপ্ন দেখেছিল, তা শুরুতেই বাধাগ্রস্ত হয়। এর বিরুদ্ধে ৪৭ সালের নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে বিক্ষোভ হয় ঢাকার রাজপথে। এরপর ৪৮ সালের মার্চ মাসে ঢাকায় শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করে। এ আন্দোলন চূড়ান্ত রূপ পায় ’৫২ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে। এ মাসের ২১ তারিখ বুকের তাজা রক্তে লেখা হয় বাঙালির ভাষার ইতিহাসের ঐতিহাসিক গল্প। সেদিন সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা পাকিস্তানি সরকারের স্বৈরাচারী মনোভাবকে গুঁড়িয়ে দিতে ১৪৪ ধারা অমান্য করে রাজপথে নামে। ছোট ছোট দলে বিভক্ত হয়ে সেদিন ছাত্ররা আমতলায় জমায়েত হতে থাকে। এ সময় পুলিশ তাদের ওপর বিনা উস্কানিতে গুলি চালায়। এতে আবুল বরকত, আবদুল জব্বার, আবদুস সালামসহ কয়েকজন ছাত্র শহীদ হন। এ ঘটনার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ হন ঢাকাবাসী। পুলিশি হয়রানি আর নির্যাতনের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ায় শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষ। পরদিন ২২ ফেব্রুয়ারি প্রতিবাদ আর প্রতিবাদ, মিছিলের ঢল নামে, ঢাকার রাজপথ কেঁপে ওঠে স্লোগানে। আমার ভাইয়ের রক্ত দিয়ে সেদিন লেখা হয় ভাষার নতুন শোকপত্র, সে এক অমর শোকগ্রস্ত কবিতা। আর তারপর ভাষাশহীদদের স্মৃতিকে অমর করে রাখার জন্য এক রাতের সিদ্ধান্তে মেডিকেল কলেজ হোস্টেল প্রাঙ্গণে গড়ে ওঠে একটি স্মৃতিস্তম্ভ, যা তখনকার কুচক্রী পাকিস্তানি সরকার ২৬ ফেব্রুয়ারি গুঁড়িয়ে দিয়ে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব বজায় রাখতে সচেষ্ট হয়েছিল। ঘটনার পর ঘটনা ঘটে চলেছে, অবিরাম শোক হয়ে ওঠে অগ্নিগর্ভ। এ সময় দেশ জুড়ে বাতাসের বেগে আন্দোলন ছড়িয়ে পড়ে, দিকে দিকে তখন পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী আর নুরুল আমিন সরকারের নিন্দা বাড়তে থাকে। পূর্ব বাংলার মানুষের আন্দোলন আরও বেগবান হতে থাকে। ফেব্রুয়ারির একুশ তারিখের ছাত্র হত্যার মধ্য দিয়ে ভাষা আন্দোলন জোর পায়। মানুষ বুঝতে পারে যে, আশা-আকাক্সক্ষার জন্য পাকিস্তান সৃষ্টি হয়েছে তা বাংলা বা বাঙালির নয়, এ যেন রাষ্ট্র নামক ভ্রম কেবল। তারপর ১৯৫৪ সালে প্রাদেশিক পরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট জয়লাভ করে। এ সময় গণপরিষদের অধিবেশনে বাংলাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। আর বাংলাকে পাকিস্তানের দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সংবিধানে পরিবর্তন আনা হয় ১৯৫৬ সালে। সেদিনের সেই আত্ম-বলিদানের মধ্য দিয়ে একুশে ফেব্রুয়ারিকে পেয়েছি আমরা।

সারা পৃথিবীর মানুষের কাছে অমর একুশে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে পরিণত হয়েছে। জাতিসংঘ ফেব্রুয়ারির এ মহান দিনটিকে স্বীকৃতি দিয়েছে ১৯৯৯ সালে ‘আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস’ হিসেবে। এরপর থেকে পৃথিবী জুড়ে দিবসটি উদযাপন করা হয়। এ দিনটি যেমন মর্যাদার মধ্য দিয়ে আমরা পালন করি, ঠিক তেমনি করে পালন করে পৃথিবীর ১৮৮টি দেশের মানুষ।

৩.

ভাষার জন্য লড়াই-সংগ্রাম করে আমরা যেমন জানিয়ে দিয়েছি আমাদের ভাষার অধিকারের কথা, ঠিক এমন অনেক ভাষাগোষ্ঠী আমাদের এই ভূখন্ডে রয়েছে, যাদের ভাষার অধিকার কমছে। যাদের রাষ্ট্রীয়ভাবে সংজ্ঞায়ন করা হয়েছে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী হিসেবে। এ রকম ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা এ দেশে কম নয়, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১১ সালের তথ্যানুসারে এর সংখ্যা ২৭টি। এই ২৭টি জনগোষ্ঠীর প্রায় ১৭,৮৪,০০০ জন মানুষ বাস করে এ দেশে। তবে বাংলাদেশের নৃতত্ত্ববিজ্ঞানী ও আদিবাসী নেতাদের দেওয়া তথ্যমতে, বাংলাদেশে মোট ৪৮টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রায় ৫ মিলিয়ন মানুষ রয়েছে। তাদের মধ্যে ৪টি ভাষাগোষ্ঠীর প্রায় ৩০টি ভাষা প্রচলিত। এর মধ্যে ১২-১৮টি ভাষা বিভিন্ন মাত্রায় বিপন্ন, যা হারিয়ে যেতে পারে চিরতরে মানুষের পৃথিবী থেকে।

বাস্তবতা বলছে, এখন তা আরও কমতে শুরু করেছে। বিপন্ন ভাষার কথা বলছি, আর তথ্যমতে বাংলাদেশেও বিপন্ন ভাষার সংখ্যা জেনেছি। যেসব ভাষা ব্যবহার করা মানুষের সংখ্যা খুবই কম। এই কম সংখ্যক মানুষ পৃথিবী থেকে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার মধ্য দিয়ে ভাষা বিলুপ্ত হয়ে যায়। ইউনেস্কো ‘নিরাপদ’ ও ‘বিলুপ্ত’ ভাষার মধ্যে চারটি পর্যায় তৈরি করেছে। সুরক্ষিত নয়, স্পষ্টত বিপন্ন, গুরুতরভাবে বিপন্ন এবং সংকটাপন্ন এই হলো চারটি পর্যায়। আমাদের আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা ইনস্টিটিউট (আইএমএলআই) বাংলাসহ ৩৭টি ভাষা সংরক্ষণ ও সুসংবদ্ধ করার প্রকল্প পরিচালনা করছে। বাংলা ভাষার মানুষেরা অন্য ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর ভাষার ওপর কী চেপে বসছে তবে, নাকি রাষ্ট্র সে অধিকার থেকে বঞ্চিত করে ওই জাতি-গোষ্ঠীর ভাষা নিশ্চিহ্ন করার সুনিপুণ কারিগরের কাজ করছে? বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর মানুষেরা তাদের মাতৃভাষার চর্চা থেকে বঞ্চিত, শিশুরা বঞ্চিত ভাষা শিক্ষা থেকে, স্বাধীন বাংলার জনপদে অন্য ভাষার মানুষ নিজের মাতৃভাষার চর্চা করতে পারছে না, এ ব্যর্থতার দায় কার? এই ধুকপুক করে নিজের বুকের মাঝে বেঁচে থাকা যে ভাষাটুকু রয়েছে, ভাষাপ্রেম রয়েছে তা কী ভাষার লড়াই নয়? দূর দেশের ইতিহাস আমরা বলতে পারব, নিজের ভাষার গর্বের ইতিহাসও জানাতে পারব, এর সঙ্গে বাঁচিয়ে রাখতে হবে, তবে নিজ দেশের এই ক্ষুদ্র জাতির মানুষের ভাষাগুলোকে, কেননা, আমরা লড়াই করে জয় করেছি বাংলা ভাষার অধিকার, আর এ জন্য বাঁচিয়ে রাখতে হবে ভাষার লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাস। পৃথিবীতে ভাষার লড়াই অনন্য। যুগে যুগে এই ধারা প্রবহমান। তবুও মানুষ লড়াই করবে, ইতিহাস গড়বে আর প্রতিনিয়ত মানবসভ্যতার ইতিহাসকে এগিয়ে নিয়ে যাবে উন্নত সময় এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। ভাষার লড়াই হোক সব ভাষার কল্যাণের জন্য এই হোক ভাষা দিবসের অঙ্গীকার।

লেখক: কবি, ছড়াকার, প্রাবন্ধিক ও গবেষক