এলো পরিচয় হলো ভূখন্ড

এক সময় মানুষ নিশ্চয়ই শুধু তার মাতৃভাষায় কথা বলত। নিজস্ব গন্ডির মধ্যে নিজস্ব ভাবনা-দর্শন-সৃজনের প্রকাশ ঘটাত এবং অবশ্যই তা মাতৃভাষাতেই সম্পন্ন করত। অপর ভাষা তারা জানত না। জানার প্রয়োজন বোধ করত না। কারণটা খুব সোজা। তখনো বাজার সম্প্রসারিত হয়নি। বাজার দখলের প্রতিযোগিতার সঙ্গে রাষ্ট্রের যোগ ঘটেনি। তথাকথিত ‘বিশ্বগ্রাম’ও তৈরি হয়নি। এক জনগোষ্ঠীর এলাকার মধ্যে ঢুকে আরেক জাতির স্থায়ী মাতবরি-সর্দারি তখনো শুরু হয়নি। নিরন্তর কাঠামোগত ডাকাতি করার সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিকভাবে নিজেকে বড় আর অন্যকে ছোট করে দাবায়ে রাখারও প্রয়োজন হয়নি।

একসময় পশ্চিমে ‘শিল্প-বিপ্লব’ হলো। পৃথিবীর সব দিকের নাম মুছে গিয়ে সব দিকের নাম পশ্চিম দিক হয়ে উঠতে লাগল। মানুষ ক্রমাগত ডাকু হতে থাকল। পৃথিবী ঢুকে পড়ল উপনিবেশের বিচিত্র উদরে, গর্তে, খানাখন্দে। ব্যবসার নামে, সভ্যতার ফেরি করার নামে একই সঙ্গে চলতে থাকল শাসন ও শোষণ। এক-দুই-তিনটি ভাষা চড়ে বসতে শুরু করল অনেক ভাষার ওপর। এক সংস্কৃতি খাওয়া শুরু করল অনেক সংস্কৃতিকে। কিছু কিছু জাতি নিজেদের শ্রেষ্ঠ প্রতিপন্ন করতে থাকল; গায়ের রঙ, সভ্যতা, সংস্কৃতি, সাহিত্য, টাকা-পয়সায়; অতএব ভাষায়ও নিজেদের শ্রেষ্ঠ ঘোষণা করল। কিছু মাতৃভাষা আর মাতৃভাষা রইল না। হয়ে উঠল রাষ্ট্রভাষা। বড়লোকের মাতৃভাষা, শাসকের মাতৃভাষা ছোটলোকের ও শাসিতের রাষ্ট্রভাষায় পরিণত হয়ে গেল। বাংলার ইতিহাসে ইংরেজ আমল বলি আর পাকিস্তান আমল বলি এই তো রাষ্ট্রভাষার ইতিহাস। একই ইতিহাসের অনুবর্তন মাত্র।

কিন্তু ওপরে শাসন-শোষণ-আধিপত্য ও কিছু ভাষার মাতৃভাষা থেকে রাষ্ট্রভাষা হয়ে ওঠার যে ইশারা দিলাম তা পৃথিবীর কোথাও প্রতিক্রিয়াহীভাবে চলেনি। এর বিপরীত প্রতিক্রিয়া প্রাকৃতিক নিয়মেই অনিবার্য হয়ে ওঠে। শুরু হয় দেশে দেশে প্রতিরোধ-লড়াই-সংগ্রাম। শুরু হয় ‘বড়লোকের’ ভাষার সঙ্গে ‘ছোটলোকের’ ভাষার লড়াই, সংস্কৃতির লড়াই, অর্থনীতির লড়াই। অবশেষে স্বাধীনতার লড়াই।

অনেক ক্ষেত্রে এই স্বাধীনতার দিকে অভিযাত্রার শুরুটা হয় ভাষার লড়াই দিয়ে। সারা পৃথিবীর জাতীয়তাবাদী লড়াই-সংগ্রামেই মাতৃভাষার প্রতি দরদ একটা বড় উপাদান হিসেবে কাজ করেছে। ফলে ভাষা কেবল শিল্প-সাহিত্য ও ভাব প্রকাশের ব্যাপার না। আসলে তা জ¦লজ্যান্ত একটা রাজনৈতিক প্রপঞ্চ; রাষ্ট্রনৈতিক ব্যাপার।

জাতীয়তাবাদী আন্দোলন-সংগ্রামের ভেতর দিয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছে, উপনিবেশের বাধন ছিঁড়ে বের হয়ে এসেছে, পৃথিবীর এমন সব দেশেই ভাষা একটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হিসেবে কাজ করেছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর ব্যত্যয় ঘটেনি। বাংলাদেশের ইতিহাসের মহাবয়ানে দেখা যায়, ভাষার অধিকারের লড়াই-ই বাংলাদেশ রাষ্ট্রের ভিত্তিভূমি তৈরি করেছে। ভাষা আন্দোলন তাই বাংলাদেশ জাতিরাষ্ট্রের ইতিহাসে এত গুরুত্বপূর্ণ বলে কীর্তিত হয়।

বাংলাদেশের ইতিহাসে ভাষা আন্দোলন আসলে কী! চট করে মনে হয়, ব্যাপারটা শুধু ভাষার। কিন্তু গভীরভাবে লক্ষ করলে দেখা যাবে ভাষা সেই আন্দোলনের নিমিত্তমাত্র। আসলে ভাষা আন্দোলন গরিবের মর্যাদা রক্ষার আন্দোলন। আত্মপরিচয় সমুন্নত রাখার সংগ্রাম। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের প্রতি অন্যকে আস্থাবান রাখার লড়াই।

পাকিস্তান রাষ্ট্রে পূর্ব বাংলা ছিল প্রধানত গরিব কৃষক-তাঁতি-কামার-কুমোর-জেলে জনগোষ্ঠীর আবাস। ধরে নেওয়া হতো ঐতিহাসিকভাবে বাংলার এই অংশটি নিম্নবর্গের হিন্দু বা অস্পৃশ্য জনগোষ্ঠী থেকে ধর্মান্তরিত মুসলমান অধ্যুষিত জনপদ। এরা খাঁটি মুসলমান তো নয়ই, খাঁটি বাঙালিও নয়। ফলে জাতিসত্তার মতোই এই অঞ্চলের মানুষের মুখের ভাষারও ‘দাম কম’। ‘ঊন জাতির’ মুখের ভাষা রাষ্ট্রভাষা হওয়ার অনুপযুক্ত বলেই মনে করা হতো পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর তরফ থেকে। পূর্ব বাংলার ‘অনার্য বাঙালি’ জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতিকেও মনে করা হতো অনভিজাত অপরিশুদ্ধ সংস্কৃতি। এই জাতিগত ঘৃণা আর অবমাননার বিরুদ্ধে, অভিজাত উর্দু আর তার ধারক ‘আর্যদের’ বিরুদ্ধে একত্র হতে হলো বাংলার মানুষকে। তাজা রক্তে রঞ্জিত করতে হলো রাজপথ।

এই প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে বলা হয় ভাষা আন্দোলন পূর্ব বাংলার বাঙালির প্রথম জাতীয়তাবাদী আন্দোলন। এই আন্দোলনের ভেতর দিয়ে বাঙালি প্রথম একই সঙ্গে স্বতন্ত্র ও একত্র হওয়ার সুযোগ তৈরি করে নিল। এরপর বাঙালি স্বাধিকারের জন্য, অর্থনৈতিক ন্যায্যতার জন্য, সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনের জন্য যত আন্দোলন-সংগ্রাম করেছে সব সময়ই তা করেছে ভাষা আন্দোলনের ওই স্মৃতিকে মাথায় রেখেই। ভাষা আন্দোলনের কসম কেটে করেছে।

এ কারণে আমরা দেখব, পূর্ব বাংলার বায়ান্নর পর থেকে পুরো ষাটের দশকের যাবতীয় আন্দোলন-সংগ্রামের সময় অসংখ্য কাব্য-কবিতা-সাহিত্য রচিত হয়েছে ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি নিয়ে। এসব কাব্য-কবিতা-সাহিত্য রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক স্বায়ত্তশাসনের আগুনে অভাবনীয় ঘি ঢেলেছে। কখনো কখনো একেকটি কবিতা একেকটি মিছিলের চেয়ে বেশি উত্তাপ ছড়িয়েছে। বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় এককভাবে যদি কোনো রাজনৈতিক ঘটনা সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখে থাকে তা হচ্ছে ভাষা আন্দোলন।

শুধু বাংলাদেশের স্বাধীনতায় ভাষা আন্দোলনের প্রভাব শেষ হয়ে যায়নি। স্বাধীনতা-উত্তরকালের রাজনৈতিক সংকটেও ভাষা আন্দোলনের স্মৃতি বড় ভূমিকা পালন করেছে। তাই স্বাধীনতা-উত্তরকালেও বাংলাদেশের কবি-সাহিত্যিকদের কলমে নানাভাবে ভাষা আন্দোলন বাক্সময় হয়ে উঠেছে এবং এমনকি এখনো হচ্ছে। এখনো দেশের অভ্যন্তরে ঘটে যাওয়া যে কোনো অন্যায্যতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে মানুষ জড় হয় ভাষা আন্দোলনের স্মৃতিবাহী শহীদ মিনারের সামনে।

কিন্তু ভাষার নামে স্বাধীন হওয়া বাংলাদেশে বাংলা ভাষার কী অবস্থা! এই আলোচনা ছাড়া স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস সংক্রান্ত যে কোনো আলাপ অর্থহীন বলে মনে করি। ভাষা আন্দোলনের সময় বাঙালির দাবি ছিল বাংলাকে যেন পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা করা হয়। রাষ্ট্রভাষা করা মানে মুখে বাংলা ভাষা ব্যবহারের অধিকারের প্রতিষ্ঠা নয়। সেটা কোনো জরুরি বিষয়ও নয়। কারণ, কোটি কোটি মানুষের মুখের ভাষা কখনো কারও পক্ষে কেড়ে নেওয়া সম্ভব নয়। পূর্ব বাংলার বাঙালির দাবি ছিল বাংলাকে যেন রাষ্ট্রের বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা হয়। সেই দাবিটা অবশেষে পাকিস্তান সরকার মেনে নিয়েছিল। ১৯৫৬ সালের সংবিধানেও স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল। বাঙালির যত দফাভিত্তিক আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে সবখানেই বাংলা ভাষাকে কার্যকরভাবে প্রতিষ্ঠা করার অঙ্গীকার ছিল। তৎকালীন পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক সরকার কেন্দ্রীয় সরকারের চাপে ও নীতির কারণে সব জায়গায় যে বাংলাকে কার্যকরভাবে প্রচলন করতে পেরেছিল তা নয়। কিন্তু বাঙালির স্বপ্ন ছিল যে, দেশ স্বাধীন হলে বাংলা ভাষা রাষ্ট্রের সব কাজে ব্যবহৃত হবে। রাষ্ট্রের পূর্ণ পৃষ্ঠপোষকতায় অবহেলিত বাংলা মর্যাদাবান হয়ে উঠবে।

কিন্তু বাংলা ভাষা পাকিস্তান আমলে যে গরিবের ভাষা ছিল এখনো সেই গরিবের ভাষাই আছে। বাংলা ভাষার সঙ্গে এখন পর্যন্ত সামাজিক পরিসরে ও কর্মের পরিসরে মর্যাদার কোনো চিহ্ন যুক্ত হয়নি। রাষ্ট্রের সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহার করা হয় না। কাগজে কলমে থাকলেও বাংলা এখন বাংলাদেশের প্রায় দ্বিতীয় ভাষায় পরিণত হয়েছে। এখানে উচ্চশিক্ষায় ইংরেজি, ফলে সেখান থেকে পাস করা বিচারকের বিচার ও রায়ের ভাষা ইংরেজি। গবেষণার ভাষা ইংরেজি। কোথায় নেই ইংরেজি! রাষ্ট্রের চাকরি-বাকরিতেও ইংরেজির কদর। আর শিক্ষা! বাংলাদেশের মাদ্রাসা শিক্ষা থেকে শুরু করে বিভিন্ন পর্যায়ে কয়েক রকম ইংরেজি ভাষানির্ভর পড়াশোনার বন্দোবস্ত আছে। ইংরেজি ভাষানির্ভর এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সামাজিক মর্যাদার একটি বিষয় স্থায়ীভাবে যুক্ত হয়ে গিয়েছে। গরিব সাধারণ পরিবারের সন্তান ছাড়া এখন আর কেউ বাংলা মাধ্যমে পড়ে না। তবে কি আভিজাত্য ও মর্যাদার প্রশ্নে উর্দুর জায়গায় ইংরেজি প্রতিস্থাপিত হওয়ার মতো পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে! তাহলে সাধারণ মানুষের ‘আ-মরি! বাংলা ভাষা’র স্থান কোথায়?

এসব কথা বলার মানে এই না যে, বাংলা ভাষা রসাতলে চলে গেছে। বরং এসব কথা বলার উদ্দেশ্য এই যে, এই ভাষাটিকে বিচিত্র পরিসরে ব্যবহার করা থেকে বিরত থাকলে ভাষাটি এক সময় নির্জীব হয়ে যাবে। নানা বিষয় প্রকাশের ও ধারণের অনুপযোগী হয়ে পড়বে। শুধু সাহিত্য করে এই ভাষাকে শক্ত-সামর্থ্য ও সর্বত্রগামী করা যাবে বলে মনে হয় না।

লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক, উপপরিচালক, ডিসেমিনেশন অব নিউ কারিকুলাম স্কিম, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর, বাংলাদেশ, ঢাকা।