তামিমের ব্যাটে প্লে-অফে বরিশাল

কঠিন হলেও শেষ দল হিসেবে প্লে-অফে জায়গা করে নেওয়ার গাণিতিক একটা সম্ভাবনা ছিল খুলনা টাইগার্সের সামনে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের কাছে যদি ফরচুন বরিশাল হেরে যায়, তাহলে সিলেট স্ট্রাইকার্সের বিপক্ষে বিশাল ব্যবধানে জিতে শেষ চারে আসতে পারত খুলনার বাঘেরা। কিন্তু সেই সুযোগ এনামুল হক বিজয়ের দলকে দেননি তামিম ইকবাল। তার হাফসেঞ্চুরিতেই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসকে ৬ উইকেটে হারিয়ে বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগের দশম আসরের প্লে-অফে পৌঁছে গেছে ফরচুন বরিশাল। তাতে মিরপুরে গতকাল সিলেট-খুলনা ম্যাচটা রূপ নেয় নিছক আনুষ্ঠানিকতায়। যেটা সিলেট স্টাইকার্স জিতেছে ৬ উইকেটে।

টস জিতে তামিম নিয়েছিলেন বোলিং। চট্টগ্রামের ব্যাটিং স্বর্গ থেকে মিরপুরের রহস্যপুরীতে ফিরেছে ক্রিকেট, ব্যাটসম্যানদের যে তাই মানিয়ে নিতে একটু সমস্যা হবে সেটা আন্দাজ করেই বোধ হয় তামিমের এ সিদ্ধান্ত। সুনীল নারিন আর লিটন দাসকে উদ্বোধনে পাঠিয়ে দ্রুত রান তোলার পরিকল্পনা ছিল কুমিল্লার, তাতে জল ঢেলেছেন আরেক ক্যারিবিয়ান ওবেদ ম্যাকয়। ১৬ রানে আউট নারিন, ১২ রানে লিটন। চলেনি তাওহিদ হৃদয়ের জাদুছড়ি, ২৬ বলে ২৫ রানেই তার ইতি। আন্দ্র্রে রাসেলের ঝড় উঠতে দেননি তাইজুল ইসলাম, আন্দ্রে রাসেলকে ১ ছয় আর ১ চারে ১৪ রানেই আউট করেছেন এই বাঁহাতি স্পিনার। গুরুত্বপূর্ণ সময়ে জ্বলে ওঠা মইন আলিকে ২৩ রানেই আটকে দিয়েছেন আকিফ জাভেদ। ১৬ ওভার শেষে ৯৬ রানে ৬ উইকেট হারানো কুমিল্লার রানটা শেষ পর্যন্ত যে ৮ উইকেটে ১৪০ রানে পৌঁছাল, সেটা জাকির আলি অনিকের কল্যাণে। কুমিল্লা ভিক্টোরিয়ানসের কোচ মোহাম্মদ সালাউদ্দিন কিছুদিন আগেই উষ্মা প্রকাশ করেছেন জাকিরকে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সিরিজে টি-টোয়েন্টি দলে না দেখায়। কুমিল্লার ইনিংসের শেষ দিকে নিয়মিতই পরিস্থিতির দাবি মেটানো ব্যাটিং করছেন জাকির, ৪ ছক্কা আর ২ চারে মাত্র ১৬ বলে ৩৮ রানের ইনিংস খেলে কুমিল্লার সংগ্রহটাকে ১৪০ রানে পৌঁছে দিয়েছেন। বরিশালের সেরা বোলার ৩ উইকেট নেওয়া তাইজুল ইসলাম, জোড়া শিকার সাইফউদ্দিন এবং ওবেদ ম্যাকের।

১৪১ রান তাড়ায় আহমেদ শেহজাদ মাত্র ১ রান করে ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারে বিদায় নিলেও অন্যপ্রান্তে তামিম ছিলেন অবিচল। এসপার-ওসপারের ম্যাচে তামিম নেতৃত্ব দিয়েছেন সামনে থেকে। জানতেন, ১২০ বলে ১৪১ রানের জন্য পাগলে ব্যাটিংয়ের প্রয়োজন নেই। নিজের শক্তির জায়গা, অর্থাৎ ১২০-১২৫ স্ট্রাইক-রেটে ব্যাটিং করলেই ম্যাচটা সহজেই জেতা সম্ভব। সেটাই করেছেন তামিম, ৪৮ বলে ৬৬ রানের ইনিংস খেলে যখন আউট হয়েছেন, তখন বরিশালের জয় অনেকটাই নিশ্চিত। তামিম হাফসেঞ্চুরি করেছেন ৪০ বলে, ৫ বাউন্ডারি আর ২ ছক্কায়। এরপর একটা করে চার আর ছয়ের মার মেরেছেন আউট হওয়ার আগে। তামিমের ইনিংসের সঙ্গে কাইল মায়ার্সের ২৫, মুশফিকুর রহিমের ১৭, মাহমুদউল্লাহর ১২* আর সৌম্য সরকারের ৬* রানের ইনিংসে ২ বল হাতে রেখে জয়ের লক্ষ্যে পৌঁছে যায় ফরচুন বরিশাল। এর মাধ্যমে শেষ দল হিসেবে প্লে-অফের শেষ চারে জায়গা নিশ্চিত করল তামিম ইকবালের দল। সোমবার এলিমিনেটরে তাদের প্রতিপক্ষ চট্টগ্রাম চ্যালেঞ্জার্স।

কভিড মহামারীর সময় বিদেশি ক্রিকেটারদের ছাড়াই বঙ্গবন্ধু টি-টোয়েন্টি কাপ প্রতিযোগিতা দিয়ে ক্রিকেটের সঙ্গে যাত্রা শুরু ফরচুন বরিশালের। এরপর তারা ফ্র্যাঞ্চাইজি নেয় বিপিএলেও। ২০২২ সালের ফাইনালে ১ রানে হার, ২০২৩ সালেও এলিমিনেটর থেকে বিদায়ের পর ফরচুন বরিশাল এবারও খেলছে এলিমিনেটরে। অবশেষে ফরচুন কি ধরা দেবে বরিশালকে? অন্যদিকে আগেই প্লে-অফ নিশ্চিত করা কুমিল্লা সবশেষ ৩ ম্যাচের ২টায় হারল। এর আগে কুমিল্লা জিতেছিল টানা ৫ ম্যাচ। প্রথম কোয়ালিফায়ারে রংপুর রাইডার্সের মুখোমুখি হওয়ার আগে নিশ্চয়ই ভুলগুলো শুধরে নিতে চাইবেন।

জয়ের মাধ্যমে প্লে-অফ নিশ্চিতের দিনে ম্যাচসেরারও পুরস্কার পাওয়া তামিম বললেন, ‘আমাদের দলটা খুব ভালো। আমাদের প্লে-অফে জায়গা পাওয়ার জন্য শেষ ম্যাচটা পর্যন্ত লড়ে যেতে হয়েছে। আজকের (শুক্রবার) ম্যাচটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল, সবাই যেভাবে খেলেছে, আমি সত্যিই খুব গর্বিত। বোলাররা খুব ভালো বল করেছে। এই উইকেটে ব্যাটিং করা সহজ ছিল না, সব মিলিয়ে আমাদের ভালো দিন গেছে।’ ৮৬ রানে কুমিল্লার ৫ উইকেট তুলে নেওয়ার পরও রানটা ১৪০ হয়েছে কীভাবে এ প্রসঙ্গে তামিম বলেছেন, ‘আমি জানতাম কেউ না কেউ এসে মারমুখী ব্যাটিং করবে, আমরা প্রস্তুত ছিলাম। জাকির খুব ভালো ব্যাটিং করেছে; তবে আমি মনে করি আমাদের বোলাররা ওকে আরেকটু ভালো বোলিং করতে পারত। আমাদের বোলাররা ওকে ছোট জায়গাগুলো দিয়ে ছয় মারতে সুযোগ দিয়েছে। অন্যদিকটা অনেক বড় ছিল। এর মানে হচ্ছে আমাদের পরিকল্পনা মাঠে কাজে লাগানো যায়নি। তবে আমি বোলারদের ওপর খুব একটা অসন্তুষ্ট হতে চাই না। সব মিলিয়ে তারা ভালো বোলিং করেছে। ১৪০ রান তাড়া করতে পারাই উচিত আমাদের।’ ২ বল বাকি রেখে জিতলেও কখনোই বরিশালকে চাপের মুখে ফেলতে পারেনি কুমিল্লা, রানরেটও ছিল তাদের আয়ত্তের ভেতরেই।

একই ম্যাচে তামিম দলকে জেতালেন, হাফসেঞ্চুরি করলেন, প্লে-অফে তুললেন এবং আসরের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহকও বনে গেলেন। ১২ ইনিংসে তামিমের রান ৩৯১। দুটো হাফসেঞ্চুরি, ৪ মেরেছেন ৪০টি আর ১৫টা ছক্কা। এমন দিনে ম্যাচসেরা হওয়া তো তাকেই মানায়!