কয়েক মাস আগে হঠাৎ করে গরু মাংসের দাম কমে যায়। কেজি নেমে আসে ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকায়। তখন ব্যবসায়ীদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের নির্দেশে খামারি ও ব্যবসায়ীরা বৈঠক করে ডিসেম্বরের শুরুর দিকে প্রতি কেজি মাংসের দর ৬৫০ টাকা নির্ধারণ করেন। জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত বিক্রি হয় এ দরেই। তবে নির্বাচনের দুই দিন পরই কেজিতে ৫০ টাকা বেড়ে দর ওঠে ৭০০ টাকায়।
গত বৃহস্পতিবার বেশির ভাগ বাজারে ৭০০ টাকা দরে গরুর মাংস বিক্রি হয়েছে। হঠাৎ করে গত শুক্রবার তেজকুনিপাড়া, মালিবাগ, মোহাম্মদপুর, মিরপুরসহ কয়েকটি বাজার ও মহল্লায় দেখা গেছে, বেশির ভাগ মাংস দোকান থেকে ৭০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ব্যবসায়ীরা বিক্রি করছেন ৭৫০ টাকা দরে। তবে গতকাল শনিবার (২৪ ফেব্রুয়ারি) এসব বাজারে কেজিতে আরও ৩০ থেকে ৫০ টাকা বেড়ে কোথাও ৭৮০ আবার কোথাও ৮০০ টাকা দরে বিক্রি হয়।
মিরপুর-১১ নম্বর বাজার গতকাল শনিবার থেকে ৭৮০ টাকা দরে মাংস কিনেছেন মো. সোহেল নামের এক ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী। তিনি বলেন, কয়েক মাস আগে ৬৫০ টাকা দিয়ে গরুর মাংস কিনলাম। তারপর হঠাৎ গত মাসে বেড়ে গেল ৫০ টাকা। আর এখন কিনলাম ৭৫০ টাকায়। সবাই নিজের ইচ্ছা মতো দাম নিচ্ছে। কেউ দেখান নেই।
মোহাম্মদপুর টাউন হল বাজার গরুর মাংস কিনছিলেন আরিফ হোসেন। তিনি বেসরকারি চাকরিজীবী। তিনি ৭৬০ টাকা কেজি দরে মাংস কিনেছেন। জানতে চাইলে তিনি বলেন, ভাই যখন ইচ্ছা তারা বাড়ায়। আবার কমায়। গত সপ্তাহে কিনলাম ৭০০ টাকা কেজি। এখন কেজি প্রতি ৬০ টাকা বেশি। এক সপ্তাহের ব্যবধানে কিভাবে এতো দাম বাড়ল। এটা দেখার কেউ আছে?
হঠাৎ করে দামের এমন ঊর্ধ্বগতিতে ক্ষুব্ধ ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, সারা বছর না কিনলেও শবেবরাতে অনেকেই মাংস কেনেন। আর বরাবরের মতোই যেকোনো উৎসবকে ঘিরে সুযোগটি নিচ্ছে মুনাফালোভী ব্যবসায়ী চক্র।
তবে ব্যবসায়ীরা বলছেন, খামারিরা কোরবানির জন্য আগাম গরু সংগ্রহ করছেন। তাতে গরুর চাহিদা বেড়েছে। সেজন্য ব্যাপারীরা গরুর দাম বাড়িয়েছেন। ফলে গত দুই সপ্তাহে মাঝারি আকারের প্রতিটি গরুর দর ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বেড়েছে। ৮০০ টাকার কমে বিক্রি করলে তাদের লোকসান গুনতে হবে।
গত এক সপ্তাহে প্রতিটি গরুর দাম অন্তত ১৫ হাজার টাকা বেড়েছে বলে জানান বাংলাদেশ মাংস ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি গোলাম মোর্তুজা মন্টু। তিনি বলেন, ‘গরুর দাম বাড়ার কারণে কেউ কেউ কেজি ৮০০ টাকায়ও বিক্রি করছে। তবে আমি গতকাল দুটি গরু জবাই করে কেজি ৭৫০ টাকায় বিক্রি করে ৭ হাজার টাকা লোকসান দিয়েছি।’
গোলাম মোর্তুজা বলেন, মাংস ব্যবসায়ী সমিতি কাউকে নির্ধারিত দরে বিক্রি করতে বাধ্য করতে পারে না। কারণ কেউ লোকসান দিয়ে বিক্রি করবে না। রোজায় মাংস ব্যবসায়ী সমিতি চেষ্টা করবে ৭৫০ টাকার মধ্যে দর রাখতে।
খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ ডেইরি ফার্মার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মোহাম্মদ ইমরান হোসেন বলেন, ‘মূলত উৎসবকে ঘিরে দাম বাড়ানোর কৌশল হিসেবে এসব অভিযোগ তুলছেন মাংস ব্যবসায়ীরা।’
ইমরান হোসেন বলেন, ‘মোহাম্মদপুর, মিরপুর, নিউমার্কেট, কারওয়ান বাজারসহ বেশ কয়েক জায়গা থেকে ৮০০ টাকা দরে বিক্রির খবর পেয়েছি। মাংসের বাজারে বেশ কয়েক মাস ধরে বিশৃঙ্খলা রয়েছে। একটা যৌক্তিক দর নির্ধারণে সরকারের হস্তক্ষেপ খুব জরুরি। গরুর দাম বাড়লে তো প্রান্তিক খামারি বা কৃষকদের বেশি দাম পাওয়ার কথা। কিন্তু আদতে তারা তো বেশি দর পাচ্ছে না।’
জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক এ এইচ এম সফিকুজ্জামান গণমাধ্যমকে বলেন, চার-পাঁচ মাস আগে মাংসের দর নিয়ে বেশ আলোচনা হয়েছে। নানা জায়গায় ভোক্তা অধিদপ্তর অভিযান ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে মতবিনিময় করা হয়। দাম সহনীয় রাখার যথেষ্ট উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।