পাহাড়, নদী, সমুদ্র, দ্বীপ কী নেই বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে। প্রকৃতি যেন উদার হাতে সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে এ এলাকায়। দেশের একক বৃহত্তম বনাঞ্চল পার্বত্য চট্টগ্রাম কিংবা বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্র সৈকত কক্সবাজার, প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন, প্রকৃতির অপরূপ সৃষ্টি মহেশখালীর সোনাদিয়া ও হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপসহ অসংখ্য স্পট ছড়িয়ে রয়েছে এ এলাকায়। কিন্তু দেশি-বিদেশি পর্যটকদের আকর্ষণে এখনো পিছিয়ে আছে চট্টগ্রাম অঞ্চল।
এই পিছিয়ে থাকার কথা বলতে গিয়ে দেশের তরুণ প্রজন্মের প্রতিনিধি চিটাগাং চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক এবং বেসরকারি আবাসন কোম্পানি সিপিডিএলের প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী ইফতেখার হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘একসময় চট্টগ্রামের সৌন্দর্য দেখার জন্য দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ বেড়াতে আসত। এখান থেকেই রাঙ্গামাটি, বান্দরবান ও খাগড়াছড়িতে ঘুরতে যেত। কিন্তু এখন বদলে গেছে, চট্টগ্রাম দেখতে আসা লোকের সংখ্যা কমছে। অনেকে সরাসরি কক্সবাজার চলে যাচ্ছে। সব মিলিয়ে পিছিয়ে যাচ্ছে চট্টগ্রাম।’
তিনি আরও বলেন, ‘সিলেট এলাকায় যেমন কয়েক দিন থাকার মতো কিছু রিসোর্ট গড়ে উঠেছে, তেমনি চট্টগ্রাম অঞ্চলেও এমন রিসোর্ট গড়ে তোলার সম্ভাবনা রয়েছে। বিনিয়োগকারীদের এগিয়ে আসতে হবে এবং একই সঙ্গে বিনিয়োগকারীদের নিরাপত্তার বিষয়টিও নিশ্চিত করতে হবে। এর সঙ্গে যুক্ত হতে হবে উন্নত যাতায়াত ব্যবস্থা।’
তবে চট্টগ্রাম নয়, শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামকে (খাগড়াছড়ি, রাঙ্গামাটি ও বান্দরবান) পরিকল্পনায় নিয়ে দেশের পর্যটন খাতকে বিশ্বদরবারে তুলে ধরতে পারি বলে মন্তব্য করেন এ পর্যন্ত ৩৬টি দেশ ভ্রমণ করা চট্টগ্রামের সিনিয়র সাংবাদিক এজাজ মাহমুদ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শুধু পার্বত্য চট্টগ্রামে যদি পুলিশ, সেনাবাহিনী কিংবা জেলা প্রশাসনের সহায়তায় হোটেল-মোটেল নির্মাণ করে ইকো ট্যুরিজম গড়ে তোলা যায়, তাহলে এ এলাকা থেকেই অনেক বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেকে নিরাপত্তার কথা বলে। কিন্তু যদি প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যায়, তাহলে বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা সেখানে বিনিয়োগ করতে এগিয়ে আসবেন।’
একসময় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক জোন অথরিটির (বেজা) নির্বাহী চেয়ারম্যানের দায়িত্বে ছিলেন পবন চৌধুরী। তিনি বৃহত্তর চট্টগ্রামসহ সারা দেশের পর্যটনের বিকাশে অনেকগুলো প্রকল্প হাতে নিয়েছিলেন। তারই উদ্যোগে টেকনাফের সাবরাংয়ে একটি বিশাল ইকো ট্যুরিজম জোন প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, যা বাস্তবায়নের কাজ চলমান। এ ছাড়া টেকনাফে নাফ নদীর মাছে জাইল্ল্যার চর উন্নয়ন প্রকল্প এবং মহেশখালীর সোনাদিয়ায় ইকো ট্যুরিজমসহ নানা প্রকল্প ছিল বেজার আওতায়। কিন্তু তারপরও দেশের পর্যটনশিল্প এগিয়ে যেতে না পারার কারণ প্রসঙ্গে পবন চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমাদের পর্যাপ্ত সম্পদ রয়েছে কিন্তু এই প্রাকৃতিক সম্পদগুলোকে আমরা ব্যবহার করতে পারছি না। এজন্য আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোর দক্ষতা যেমন বাড়াতে হবে, তেমনি রাজনৈতিক দক্ষতাও বাড়াতে হবে। সবচেয়ে বড় বিষয়, আমাদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নে আরও দায়িত্বশীল হওয়া উচিত।’
দেশের চা বাগানগুলো একেকটি পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠতে পারে উল্লেখ করে পবন চৌধুরী বলেন, ‘সারা বিশ্বে টি ট্যুরিজম রয়েছে। কিন্তু আমাদের এখানে এই সুযোগ নেই। এজন্য সরকার ও টি বোর্ড মিলে যেখানে দেশের দুই লাখ একর চা বাগান রয়েছে, সেখানে টি ট্যুরিজমের বিকাশ হতে পারে। চা বাগানগুলোর অধিবাসীদের কৃষ্টি ও কালচার এবং বিভিন্ন প্ল্যান্টের প্রদর্শনী হওয়ার সুযোগ রয়েছে।’
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান ইতিমধ্যে চট্টগ্রাম মহানগরীর পর্যটন স্পটগুলোকে বিকাশের উদ্যোগ নিয়েছেন। একই সঙ্গে মাস্টারদা সূর্য সেনের বাড়ি দেখার জন্য ভারত থেকে প্রতিবছর অনেকে আসে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক আবুল বাসার মোহাম্মদ ফখরুজ্জামান বলেন, ‘মাস্টারদা সূর্যসেনের বাড়ি, ইউরোপিয়ান ক্লাবসহ ঐতিহাসিক স্থানগুলো পর্যটন স্পটের আওতায় নিয়ে আসা যায়। আর এগুলোসহ চট্টগ্রামের স্পটগুলোকে যাতে মানুষ ভ্রমণ করতে পারে সেজন্য সাপ্তাহিক বা মাসিক ভিত্তিতে কোনো ট্যুর ট্রিপের আয়োজন করা যেতে পারে।’
পর্যটনকে কেন্দ্র করে আমাদের ফুড ও রেস্তোরাঁ খাত বিকশিত হবে এবং পার্টটাইম গাইড হিসেবে চাকরির সুযোগ গড়ে উঠবে উল্লেখ করে জেলা প্রশাসক বলেন, ‘একটি খাত যখন প্রসার লাভ করে, তখন এর সঙ্গে অনেকগুলো উপ-খাত গড়ে ওঠে এটাকে সাপোর্ট করার জন্য। পর্যটনের সঙ্গে গাইড, রেস্তোরাঁ, আবাসন, পরিবহনসহ অনেক খাতের প্রসার ঘটবে।’
দেশে পর্যটন স্পট থাকলেও তা নিয়ে দেশের বাইরে তেমন প্রচার নেই উল্লেখ করে সিপিডিএলের প্রেসিডেন্ট প্রকৌশলী ইফতেখার হোসেন বলেন, ‘আমাদের একটি পর্যটন মন্ত্রণালয় রয়েছে। কিন্তু এর অধীনে দেশের পর্যটনগুলোতে বিদেশিদের কাছে বিভিন্ন ভিডিও কিংবা অন্য কোনো মাধ্যমে তা প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে আমরা যে নিরাপত্তায় এগিয়েছি, বিদেশিদের সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে।’
একই মন্তব্য করেন পেনিনসুলা চিটাগং-এর চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম-১ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুব-উর-রহমান। তিনি বলেন, দেশের পর্যটনের বিকাশে পর্যটন মন্ত্রণালয়কে আরও গতিশীল হতে হবে। দেশের এই খাতকে বিদেশিদের কাছে তুলে ধরতে হবে। তবেই এর প্রসার লাভ করবে।