বিদেশি পর্যটকের জন্য আক্ষেপ

ঢাকার সঙ্গে রেল যোগাযোগ স্থাপনের পর পর্যটন শহর কক্সবাজার আরও জৌলুশময় হবে এমনটাই আশা করেন সেখানকার মানুষ। সরকারও তাই চায়। সে কারণে নতুন করে ঢেলে সাজানো হচ্ছে বিমানবন্দর। প্রত্যাশা অনুযায়ী সরকারি-বেসরকারি কর্মকান্ড এগিয়ে নিতে পারলে কক্সবাজার অদূর ভবিষ্যতে বিদেশি পর্যটকদের কাছেও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।

স্থানীয় ব্যবসায়ী ও বাসিন্দারা চান, কক্সবাজারকে পরিপূর্ণভাবে পর্যটন শহরে রূপান্তরের পথে যেসব বাধা আছে, সেগুলো দূর হোক। তারা মনে করেন, এখানে প্রশাসনের কাজের সমন্বয় নেই। পর্যাপ্ত নিরাপত্তাব্যবস্থা নেই। তবে নিরাপত্তার নামে রয়েছে বাড়াবাড়ি। স্থানীয়দের অংশগ্রহণ নেই। স্ট্রিট ফুডের ব্যবস্থা নেই। থিয়েটার হল নেই। নাইট বাজার নেই। নাইট লাইফের ব্যবস্থা নেই। রাতের সমুদ্র সৈকতে পর্যাপ্ত আলো নেই। প্রশিক্ষিত ডুবুরি দল নেই। প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার নেই।

কক্সবাজার প্রেস ক্লাব সভাপতি ও ভিস্তা বে রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী এবং বিচ ম্যানেজমেন্টের সদস্য আবু তাহের বলেন, ‘সমুদ্র শহর কক্সবাজারে পর্যটকের বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে অনুমতির নামে রয়েছে হয়রানির ফাঁদ। কোনো সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করতে চাইলে প্রশাসনের দ্বারে দ্বারে দৌড়াতে হয়।’

জেলা প্রশাসন পর্যটন করপোরেশন ও সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যমতে, কক্সবাজার জেলায় পাহাড়, সমুদ্র, নদী, ঝরনা, পাথুরে সৈকত, পাথুরে পাহাড়, আদিনাথ মন্দির, সোনাদিয়া দ্বীপ, রামুর বৌদ্ধবিহার, রাবার বাগান, চা বাগান, গর্জন বিহার, টেকনাফের মাথিনের কূপ ও সেন্টমার্টিন, কুতুবদিয়ার বাতিঘর ছাড়াও অসংখ্য দর্শনীয় স্থান রয়েছে। এসব দেখতে প্রতিবছর লাখ লাখ দেশীয় দর্শনার্থী কক্সবাজার এলেও বিদেশ পর্যটকের আনাগোনা প্রায় শূন্যের কোঠায়। পর্যাপ্ত বিনোদনব্যবস্থা না থাকায় বিদেশি পর্যটকরা দিন দিন কক্সবাজারবিমুখ হচ্ছেন। সরকারি-বেসরকারি কোনো উদ্যোগ না থাকা, পর্যটন করপোরেশনের কর্তৃত্ব না থাকা ও অন্যান্য সংস্থার ভেতরকার দ্বন্দ্বের কারণেই পর্যটন উন্নয়নের কোনো অগ্রগতি নেই। এখানে এক সংস্থার নেওয়া উদ্যোগ অন্য সংস্থা বন্ধ করে দেয়।

এ বিষয়ে ট্যুর অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজারের সহসভাপতি মিজানুর রহমান মিল্কী বলেন, ‘আমাদের এখানে স্ট্রিট ফুডকে উৎসাহিত না করে অস্বাস্থ্যকর খাবার বিক্রির দায়ে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বন্ধ করে দেওয়া হয় অথচ স্ট্রিট ফুড ছাড়া পর্যটন চলে না। তাই স্ট্রিট ফুড বিক্রেতাদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে মানসম্মত খাবার পরিবেশনে দক্ষ করা দরকার। এ ছাড়া পর্যটনে স্থানীয়দের অংশগ্রহণ নেই বললেই চলে। এজন্য কাজের অভাবে অনেকে পর্যটন জোনে ছিনতাইসহ নানা অপরাধমূলক কাজ করছে। কিন্তু করপোরেশনের দায়িত্ব হচ্ছে স্থানীয় যুবকদের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ করে পর্যটনে কাজে লাগানো।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির এক নেতা বলেন, ‘সন্ধ্যা হলে ঘুমিয়ে পড়ে পর্যটন রাজধানীখ্যাত কক্সবাজার। এ কারণে পর্যটনশিল্পে জিপিডির মাত্র ৪ শতাংশ আসছে। এ থেকে উত্তরণ কিংবা পর্যটনশিল্পকে সামনে এগিয়ে নেওয়ার জন্য নানা সময় নানা উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। এ ছাড়া প্রশাসনের বিভিন্ন সেক্টরের মধ্যে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। যেমন : সমুদ্র সৈকতে ট্যুরিস্ট পুলিশ একটি ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার করেছিল, যা অন্য আরেকটি সরকারি সংস্থা বন্ধ করে দিয়েছে।’

ভিস্তা বে রিসোর্টের স্বত্বাধিকারী আবু তাহের বলেন, ‘বিদেশি পর্যটক টানতে অবশ্যই নাইট লাইফের ব্যবস্থা করতে হবে। অথচ বছরের পর বছর চলে গেলেও একটি নাইট বাজারই বসাতে পারেনি। পর্যটন করপোরেশন নিজের ব্যবসাতেই বছরের পর বছর লোকসান গুনছে। অথচ করপোরেশনের কাজ ব্যবসা করা নয়, বেসরকারি উদ্যোগকে সহযোগিতা করা।’

সমুদ্রের লাবণী পয়েন্ট থেকে কলাতলী পয়েন্ট পর্যন্ত তিন কিলোমিটার এলাকায় সবচেয়ে বেশি লোকসমাগম হয়। কিন্তু এলাকায় অসুস্থ পর্যটকদের প্রাথমিক চিকিৎসাব্যবস্থা নেই, মায়েদের জন্য নেই ব্রেস্ট ফিডিং সেন্টার। আধুনিক মানের শপিং মল নেই, থিয়েটার হল ও সিনেমা হল নেই। এ ছাড়া ডিসকো বার, ক্যাসিনো, দেশি-বিদেশি সার্কাস প্রদর্শনীর ব্যবস্থা নেই।

পর্যটন করপোরেশনের ম্যানেজার ও বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির সাধারণ সম্পাদক রায়হান উদ্দিন আহমেদ বলেন, শৈবালের লেক ও গলফ মাঠ কক্সবাজারের অন্যতম পর্যটনকেন্দ্র ছিল। কিন্তু এখন আর তা নেই। কক্সবাজারে করপোরেশনের ৪টি হোটেল ও ৫টি কটেজ রয়েছে। এর মধ্যে ৫টি কটেজ ও মোটেল প্রবাল বিদেশি এনজিওকে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া মোটেল লাবণী, হোটেল শৈবাল ও মোটেল উপলর প্রায় ৮০টির মতো কক্ষে আন্তর্জাতিক এনজিওর কাছে ভাড়া দেওয়া হয়েছে। বর্তমানে ৩টি হোটেল মিলে ১০০টির মতো কক্ষ পর্যটকের জন্য রয়েছে।

নিজেদের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করে পর্যটন করপোরেশন কক্সবাজারের ম্যানেজার রায়হান উদ্দিন আহমদ বলেন, বিদেশি পর্যটক টানতে বেসরকারি কোনো উদ্যোগ না থাকলেও সরকার নানা উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর নির্মাণ, রেললাইন সম্প্রাসরণ ও আইকনিক রেলস্টেশন নির্মাণসহ টেকনাফের সাবরাংয়ে গড়ে তোলা হচ্ছে এক্সক্লুসিভ পর্যটন জোন। বিদেশি পর্যটকদের টানতেই এই জোনে থাকবে ডিসকো বার, ক্যাসিনোসহ নাইট লাইফের সব ব্যবস্থা।

তিনি আরও বলেন, একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বছর দু-এক আগে মোটেল প্রবালে একটি সার্কাস দলকে আনা হলেও নানা সংস্থার বিরোধিতায় মাসখানেকের মধ্যে সার্কাস প্রদর্শনী বন্ধ করে দিতে হয়।

বিচ ম্যানেজমেন্ট কমিটির দায়িত্বপ্রাপ্ত কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এডিএম) মো. ইয়ামিন হোসেন বলেন, সুগন্ধা পয়েন্টে লেক করা হবে। লেকের পাশে মার্কেট তৈরি করা হবে। সেখানকার একটি অংশে নাইট বাজার করার পরিকল্পনা রয়েছে।