ইতালি নয় চিরঘুমের দেশে

আর কয়েক দিন পরেই দেশ ছেড়ে সপরিবারে ইতালি চলে যাওয়ার কথা ছিল প্রবাসী সৈয়দ মোবারকের। তাই পরিবার নিয়ে একসঙ্গে খেতে গিয়েছিলেন রাজধানীর বেইলি রোডের গ্রিন কোজি কটেজ ভবনে। এই খেতে যাওয়াই যে পুরো পরিবারের জন্য কাল হবে তা কে জানত। শেষ পর্যন্ত পোড়া লাশ হয়ে ফিরতে হলো সবাইকে।

জানা গেছে, সৈয়দ মোবারক ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার বাসিন্দা। তিনি দীর্ঘদিন ধরে ইতালিতে থাকতেন। এক মাস আগে দেশে এসেছিলেন পরিবারকে নিয়ে যাওয়ার জন্য। সপ্তাহখানেক পরেই ইতালি চলে যাওয়ার কথা ছিল তাদের সবার। তিন দিন আগে তারা প্রত্যেকে ভিসাও পেয়েছিলেন। সেই আনন্দে পরিবারের সবাই মিলে গিয়েছিলেন রেস্টুরেন্টে খাওয়া-দাওয়া করতে।

নিহতদের স্বজন মোস্তাফিজুর রহমান শাহীন গণমাধ্যমকে বলেন, প্রবাসী মোবারকের গ্রামের বাড়ি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুরে। তিনি ঢাকার মগবাজার এলাকায় থাকতেন। রাত ৮টার দিকে সৈয়দ মোবারক তার স্ত্রী স্বপ্না (৩৮), মেয়ে সৈয়দা তাশফিয়া (১৭), সৈয়দা নূর (১৫) ও ছেলে সৈয়দ আব্দুল্লাহকে নিয়ে বাসা থেকে বের হন কাচ্চি ভাই রেস্টুরেন্টে খাওয়ার জন্য। তারা সেখানে পৌঁছানোর পর সেখানে আগুন লাগে। এতে তারা সবাই মারা যান।

নিহত কাউসারের খালাতো ভাই আলমগীর হোসেন জানান, কাউসার প্রথমে সিঙ্গাপুরপ্রবাসী ছিলেন। প্রায় ২০ বছর আগে তিনি ইতালি পাড়ি দেন। এর মাঝে তার দেশে আসা-যাওয়া ছিল। দেড় মাস আগে প্রায় দুই বছর পর ইতালি থেকে দেশে ফেরেন কাউসার। স্ত্রী-সন্তানদের ইতালি নিয়ে যাওয়ার জন্য ভিসা ও টিকিটও সংগ্রহ করেছিলেন। ২০ মার্চ তাদের ইতালি যাওয়ার কথা ছিল। বৃহস্পতিবার রাতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে রেস্টুরেন্টে খেতে যান কাউসার।

একসঙ্গে পাঁচজনের কবর, শোকে স্তব্ধ শাহবাজপুর খন্দকার বাড়ি : একই পরিবারের পাঁচজনের মৃত্যুতে শোকে স্তব্ধ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার শাহবাজপুর খন্দকারবাড়ি। গতকাল শুক্রবার সকাল থেকে শত শত মানুষ ভিড় করে সেখানে। পুরো গ্রাম শোকে স্তব্ধ। গত বৃহস্পতিবার রাত থেকেই খন্দকারবাড়িতে থেমে থেমে চলছিল বিলাপ।

গতকাল দেখা যায়, নিহত কাউসারের বাড়িতে সকাল সকাল বিভিন্ন মসজিদ থেকে আনা হয়েছে পাঁচটি খাটিয়া। এলাকায় মাইকে মাইকে জানিয়ে দেওয়া হচ্ছে মৃত্যুর খবর ও জানাজার সময়। পারিবারিক কবরস্থানে সারিবদ্ধভাবে খোঁড়া হয়েছে পাঁচটি কবর। খন্দকারবাড়িতে চলছে শোকের মাতম। স্বামী আবুল কাসেমের মৃত্যুর পর থেকে কয়েক বছর ধরে অপর ছেলের সঙ্গে বাড়িতেই থাকতেন কাউসারের মা হেলেনা বেগম (৭০)। ছেলে, পুত্রবধূ ও নাতি-নাতনিদের হারিয়ে রাত থেকেই বিলাপ করছিলেন হেলেনা বেগম। তার কান্না দেখে অনেককেই কাঁদতে দেখা গেছে। তাকে সান্ত¡না দেওয়ার সাহস যেন নেই কারও। আহাজারি করতে করতে হেলেনা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে বিদায় নিতে আওয়ার (আসার) কতা ছিল। অহন শেষ বিদায় নিতে আইব। আমার ছেলেরে কেউ আইন্না দেও। কেউ আমার ছেলেরে আইন্না দিতারবা (দিতে পারবা)? আমার তো সব শেষ। ছেলে, বউ, নাতি-নাতিন কেউ নাই। আমি অহন কেমনে বাঁচুম? তোমরা কেউ হেরারে (তাদের) আইন্না দেও। বারবার ফোন করে ছেলেকে দেশে আনছিলাম। এখন আমি এতিম হয়ে গেছি।’

কাউসারের চাচাতো ভাই সৈয়দ আবুল ফারাহ তুহিন বলেন, ‘কাউসার ভাই ও তার পরিবারের সদস্যদের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পর থেকে খন্দকারবাড়ির কারও নাওয়া-খাওয়া নেই। রাত থেকেই গ্রামবাসীসহ আত্মীয়-স্বজন বাড়িতে উপস্থিত হয়েছেন। আমরা কোনো দিন এমন দুঃসংবাদের মুখোমুখি হইনি। তাদের মরদেহ নিয়ে দুপুরে রওনা হয়ে ঢাকার স্বজনরা বিকেল সাড়ে ৩টায় বাড়ি পৌঁছেছে।’

কাউসারের স্ত্রী স্বপ্নার বড় বোন পলি আক্তার কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘ওদের খাওয়ার সময় রেস্টুরেন্টে আগুন যখন ভয়াবহ আকার ধারণ করে, তখন ওরা ফোন করে বাঁচার আকুতি জানায়। কিন্তু আমরা কিছুই করতে পারলাম না। সারা জীবন এই দুঃখ নিয়েই বাঁচতে হবে।’