শিক্ষকদের বলা হয় মানুষ গড়ার কারিগর। অর্থসম্পদে পিছিয়ে থাকলেও একসময় সামাজিক মর্যাদায় তারা ছিলেন সবার ওপরে। বাবা-মায়ের পর শিক্ষকের অবস্থানএমন ধারণাই ছিল সমাজে। আর্থিকভাবে গ্রামের সবচেয়ে অসচ্ছল মানুষটিও শিক্ষক পরিচয়ে পেতেন আলাদা সম্মান। শিক্ষকের সামনে শিক্ষার্থী তো বটেই, অভিভাবকরা এবং সমাজের অন্য মানুষরাও মাথানত করতেন। এখন বদলে গেছে সে চিত্র। শিক্ষকতার সঙ্গে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা যেমন রয়ে গেছে, তেমনি শিক্ষকদের একটি অংশ জড়িয়ে পড়েছেন কোচিংয়ে, দলীয় রাজনীতিতে, নিয়োগ-বাণিজ্যে ও নানা অনিয়মে। শিক্ষকতার পেশাগত মর্যাদা ও সামাজিক অবস্থান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
আজ ৫ অক্টোবর বিশ্ব শিক্ষক দিবস। বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশেও যথাযোগ্য মর্যাদায় দিবসটি পালিত হচ্ছে। এ বছরে শিক্ষক দিবসের প্রতিপাদ্য ‘স্ট্যান্ডিং উইথ টিচার্স : সিক্সটি ইয়ার্স অব প্রোটেকটিং দ্য প্রফেশন, অ্যাডভান্সিং ইটস স্ট্যাটাস, শেপিং আওয়ার ফিউচার্স’। দিবসটি উপলক্ষে আজ দুপুরে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ দেওয়া হবে। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে সম্মাননা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে শিক্ষকদের হাতে নগদ ২ লাখ টাকা, ক্রেস্ট ও সম্মাননা সনদ তুলে দেবেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
শিক্ষাবিদদের অভিমত, শিক্ষকতার মর্যাদা কমার দায় কেবল রাষ্ট্রের বা সমাজের নয়; শিক্ষকদের একাংশের কর্মকা-ও এর জন্য দায়ী। রাজনৈতিক পরিচয়কে পেশাগত জীবনে ব্যবহার, দলীয় বলয়ের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং শিক্ষাকে বাণিজ্যিক কর্মকান্ডে পরিণত করার প্রবণতা শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্কের ঐতিহ্যগত জায়গাটিকে দুর্বল করেছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতনের পর এ পরিস্থিতি প্রকটতর হয়ে ওঠে। বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ, মাধ্যমিক ও প্রাথমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের পদত্যাগের দাবিতে আন্দোলন, অপমান-হেনস্তা এবং জোর করে পদত্যাগ করানোর ঘটনা ঘটে। ৫ আগস্টের পর ৩১ আগস্ট পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে অন্তত ১৫০ জন শিক্ষককে জোর করে পদত্যাগ করানো হয়। কোথাও শিক্ষকদের ঘেরাও করে পদত্যাগপত্রে সই করানো হয়েছে, কোথাও তাদের প্রতিষ্ঠানে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীদের চাপের মুখে শিক্ষকদের বাড়িতেও পদত্যাগের দাবি নিয়ে যাওয়া হয়েছে এমন ঘটনাও আছে।
সরকার পতনের পর দেশের প্রায় সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য পদত্যাগ করেন বা চাপের মুখে সরে যেতে বাধ্য হন। এরপর শিক্ষক ও প্রশাসকদের নিয়ে নানা অভিযোগ ওঠে, পদত্যাগের দাবি ওঠে ও তাদের রাজনৈতিক পরিচয়কে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হয়। এ কারণে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকরা তদন্ত, অব্যাহতি বা সাময়িক বরখাস্তের মুখে পড়েন।
শুধু তাই নয়, অন্তর্র্বর্তীকালে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রায় সব উপাচার্যকে কারণ না দেখিয়েই পরিবর্তন করে বিএনপি সরকার। চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) উপাচার্য অধ্যাপক ড. শেখ শরীফুল আলম নিয়োগ পাওয়ার পর এগারো দিন ধরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউজে অবস্থান করছেন। ক্যাম্পাসে আন্দোলনের কারণে এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে উপাচার্যের চেয়ারে বসতে পারেননি তিনি। জানা গেছে, সার্কিট হাউজ থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করছেন নতুন উপাচার্য।
সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ড. আবু সাদাত মুহাম্মদ সায়েমকে পুনর্বহালের দাবিতে আন্দোলন করেছেন চুয়েট শিক্ষার্থীরা। শিক্ষক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীরাও সর্বাত্মক কর্মবিরতি পালন করছেন। কার্যত অচল চুয়েট।
গত ১৫ সেপ্টেম্বর গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (গোবিপ্রবি) স্থাপত্য বিভাগে শিক্ষক-সংকট নিরসন ও ১৬ জন শিক্ষক নিয়োগের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে প্রায় আট ঘণ্টা অবরুদ্ধ ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. সোহেল হাসান। পরে গোপালগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ডা. কে এম বাবরের হস্তক্ষেপ ও আশ্বাসের পর রাত ৯টার দিকে শিক্ষার্থীরা অবরোধ প্রত্যাহার করেন এবং পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়। আন্দোলন চলাকালে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরিয়াল বডির সদস্যদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি ও বাদানুবাদ হয় শিক্ষার্থীদের; এক নারী শিক্ষার্থী উপাচার্যের কোটের টাই ধরে টানও দিয়েছিলেন।
শিক্ষকতার মর্যাদাসংকটের পেছনের গল্প আরও পুরনো। শিক্ষকতার সঙ্গে কোচিং ও প্রাইভেট টিউশনের সম্পর্ক নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। ২০১২ সালে শিক্ষকদের কোচিংবাণিজ্য বন্ধে নীতিমালা করা হলেও এক যুগের বেশি সময় পরও তা বাস্তবায়িত হয়নি। ২০১৭ সালে দুর্নীতি দমন কমিশনের এক তদন্তেও কোচিংবাণিজ্যের বিষয়টি উঠে এসেছিল। ঢাকার ২৪টি সরকারি স্কুলের ৫২২ শিক্ষক দীর্ঘদিন ধরে টাকার বিনিময়ে বদলি এড়িয়ে যাচ্ছিলেন বলে অভিযোগ পেয়েছিল দুদক, তাতে কোচিং ব্যবসার কথাও ছিল।
শিক্ষাবিদ অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, ‘শিক্ষার অবমূল্যায়নের সঙ্গে শিক্ষকের সামাজিক মর্যাদাও কমেছে। অর্থনৈতিক নিরাপত্তার অভাবে অনেক শিক্ষক প্রাইভেট টিউশন ও কোচিংয়ের দিকে ঝুঁকছেন, যা শিক্ষকতার সামাজিক অবস্থানকে প্রভাবিত করছে।’ তিনি বলেন, ‘শিক্ষকদের রাজনৈতিক আনুগত্যকে নিয়োগ ও পেশাগত জীবনের সঙ্গে যুক্ত করার প্রবণতা শিক্ষকসমাজকে বিভক্ত করেছে।’
বাংলাদেশে শিক্ষকতার মর্যাদা নিয়ে গবেষণাতেও একই ধরনের সংকটের কথা বলা হয়েছে। ২০১৭ সালের একটি গবেষণায় বলা হয়, শিক্ষকরা তুলনামূলকভাবে কম সামাজিক মর্যাদা ও অর্থনৈতিক স্বীকৃতি পাচ্ছেন এবং শিক্ষকতার প্রেরণার জায়গাতেও পরিবর্তন এসেছে। এতে শিক্ষা খাতে রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্বল জবাবদিহির বিষয়টিও আলোচিত হয়েছে।
শিক্ষকই শিক্ষকের প্রতিপক্ষ?
শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শিক্ষকসমাজের ভেতরে বিভাজন বাড়ছে। বিশেষ করে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দলীয় রাজনীতি, শিক্ষক সংগঠন ও ব্যক্তিকেন্দ্রিক বলয়কে ঘিরে শিক্ষকদের মধ্যে বিভক্তি তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপরও পড়েছে।
কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ভাষ্য, এখন অনেক শিক্ষার্থী নিজের বিভাগের শিক্ষকদের প্রতি যে সম্মান দেখান, অন্য বিভাগের শিক্ষকদের প্রতি সবসময় তা দেখা যায় না। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ, দলীয় পরিচয় কিংবা শিক্ষক-অনুসারী বলয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।
শিক্ষাবিদরা বলেন, শিক্ষকের আচরণের প্রভাব শিক্ষার্থীদের ওপরও পড়ে। একজন শিক্ষকের অনুসারী শিক্ষার্থীরা অন্য শিক্ষককে প্রতিপক্ষ হিসেবে দেখতে শুরু করলে বিশ্ববিদ্যালয়ের অ্যাকাডেমিক পরিবেশে সহযোগিতার বদলে বিভাজন তৈরি হয়। এর প্রকাশ ঘটতে পারে শিক্ষককে অপমান, ঘেরাও কিংবা পদত্যাগে বাধ্য করানোর মতো ঘটনায়।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধ্যাপক ড. মো. সিরাজুল ইসলাম খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কে ফারাক এসেছে। শেখ হাসিনাবিরোধী আন্দোলনে শিক্ষার্থীরা যখন পুলিশের গুলিতে প্রাণ হারাচ্ছিলেন তখন উপাচার্য ও প্রশাসনিক দায়িত্বে থাকা শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের পাশে দাঁড়াননি। ফলে ক্ষমতার পরিবর্তনের পর সব পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে পদত্যাগ করতে হয়, যা পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।’
তিনি বলেন, ‘শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্কের জায়গা ঠিক করতে হবে, না হলে আগামী দিনে জাতিকে চরম মূল্য দিতে হতে পারে।’
যে শিক্ষক একসময় সবচেয়ে দরিদ্র মানুষ হয়েও শুধু শিক্ষক-পরিচয়ে সমাজে শ্রদ্ধার আসনে বসতেন, সেই শিক্ষকই আজ কখনো রাজনৈতিক পরিচয়, কখনো অর্থনৈতিক স্বার্থের কারণে শিক্ষার্থীদের মবের শিকার।
শিক্ষক দিবসে তাই প্রশ্ন উঠছেশিক্ষকের হারানো মর্যাদা কি শুধু সমাজকে ফিরিয়ে দিতে হবে, নাকি শিক্ষককেও নিজের পেশার মর্যাদা পুনরুদ্ধারের দায়িত্ব নিতে হবে? শিক্ষককে সম্মান করার সংস্কৃতি যেমন সমাজের দায়িত্ব, তেমনি সেই সম্মান রক্ষা করার দায় শিক্ষকেরও।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, শিক্ষাকে বলা হয় জাতীর মেরুদ-, অথচ সেই মেরুদ-কে যারা শক্ত করে গড়ে তুলেন সেই শিক্ষকদের আমরা অবহেলা করছি। শিক্ষকদের প্রয়োজনীয় বেতন ভাতা দেওয়া হচ্ছে না।
শিক্ষকতা শুধু একটি চাকরি নয়, এটি জ্ঞান, মূল্যবোধ ও প্রজন্ম গঠনের দায়িত্ব। কিন্তু শিক্ষক নিজেই যখন রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক স্বার্থ কিংবা ব্যক্তিগত বলয় তৈরিতে সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়েন, তখন শিক্ষার্থীর চোখে তার নিরপেক্ষতা ও মর্যাদা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। আবার শিক্ষার্থীদের হাতে শিক্ষককে অপমান বা জোর করে পদত্যাগ করানোর ঘটনা শিক্ষাব্যবস্থার জন্য ভয়াবহ বার্তা বহন করে।
১০০ জন পাচ্ছেন গুণী শিক্ষক সম্মাননা : শিক্ষা মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, প্রতি বছর ১২ জন করে শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হলেও এ বছর প্রথমবারের মতো প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চ শিক্ষা পর্যন্ত বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে মোট ১০০ জন নির্বাচিত শিক্ষককে জাতীয় পর্যায়ে ‘গুণী শিক্ষক সম্মাননা’ দেওয়া হবে।
শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এ বছরের বিশ্ব শিক্ষক দিবসের নীতিমালা অনুযায়ী, দেশের সব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ উপজেলা, জেলা ও জাতীয় পর্যায়ে ‘বিশ্ব শিক্ষক দিবস’ পালন করা হবে। এবার প্রাথমিক স্তরে ১০টি, মাধ্যমিক স্তরে ২০টি, কলেজে ২৫টি, সাধারণ বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০টি, মেডিকেল কলেজে ১০টি, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনটি, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনটি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিসহ অন্যান্য বিশেষায়িত বিশ্ববিদ্যালয়ে চারটি এবং প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ কোটায় পাঁচটিসহ সর্বমোট ১০০ গুণী শিক্ষককে সম্মাননা দেওয়া হচ্ছে।
প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, কারিগরি ও মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর এবং ইউজিসি গঠিত পৃথক সার্চ কমিটির প্রস্তুতিকৃত প্যানেল থেকে জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটি এই ১০০ জন শিক্ষককে চূড়ান্ত করেছে।