মনের অসুখ সারিয়ে মনের জোরেই সফল জাকের

জাকের আলি অনিক যে জায়গাটায় ব্যাটিং করে সাফল্য পাচ্ছেন, সেই লোয়ার মিডল অর্ডারে দক্ষতার সঙ্গে মনের জোরটাও জরুরি। কারণ টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে সবচেয়ে চাপের মুহূর্তটাতেই বেশিরভাগ সময় ব্যাট করতে নামতে হয় জাকেরকে, থাকে কম বলে বেশি রান করার তাড়া। জাকেরের শৈশব ও কৈশোরের কোচদের কাছেও তার মূল শক্তির জায়গাটা হচ্ছে মনের জোর। অথচ এই জাকেরকেই মনের অসুখে ভুগতে হয়েছে লম্বা সময়, ডাক্তার দেখাতে যেতে হয়েছিল ভারতেও।

হবিগঞ্জ জেলা দলের কোচ মঈন উদ্দিন তালুকদার সাচ্চু। শুধু জাকেরই নয়, তার বোন শাকিলা ববি আর ভাই শাকের আলি অপুরও কোচ ‘সাচ্চু ভাই’। দেশ রূপান্তরকে জানিয়েছেন জাকেরকে প্রথম দেখার স্মৃতি, ‘তার ভাই ও বোনের সঙ্গেই ছোটবেলা থেকে মাঠে আসত অনুশীলন দেখতে। একটা সময় তার বোন হবিগঞ্জ মহিলা দলে ছিল, আমি ঐ দলটাকে অনুশীলন করাতাম। মেয়েদের তো হাতে ধরে অনেক কিছু দেখিয়ে দেওয়া যায় না, তখন জাকেরকে দিয়ে দেখিয়ে দিতাম। সে তখন ছোট মানুষ, হাসিটা মায়াকাড়া, তার বোনও খেলে অন্য মেয়েদের সঙ্গে। তাই কেউ কিছু মনে করত না।’ মূলত বোনের ইচ্ছাতেই বিকেএসপিতে যাওয়া জাকেরের, সেই গল্পটাও বললেন সাচ্চু, ‘শাকিলা আমাকে বলেছিল বিকেএসপির ট্রায়ালের ব্যাপারে খোঁজখবর করতে। আমি খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারি পরদিনই সিলেটে ট্রায়াল। তখন রাতেই শাকিলা জাকির আর হবিগঞ্জের আরও কয়েকজন ভর্তি প্রত্যাশী ক্রিকেটারকে নিয়ে গাড়ি ভাড়া করে সিলেটে চলে আসে।’

সাচ্চুর কাছেই জানা যায় অনিকের জীবনের করুণ এক অধ্যায়ের কথা, ‘ও তখন বিকেএসপির শেষ দিকে বা মাত্র বের হয়েছে এরকম সময়ে হবে। খুব সম্ভবত ২০১৬ সালের দিকে সে খুবই মানসিক অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়েছিল, ক্রিকেট খেলাও ছেড়ে দিতে চেয়েছিল। আমি, ওর বোন শাকিলাসহ সবাই মিলে ওকে অনেক বোঝাই। একটা সময় সে ভারতে চিকিৎসা করাতেও গিয়েছিল। আসার পর জাতীয় চ্যাম্পিয়নশিপের ম্যাচ খেলতে রাজশাহী গিয়েছি আমরা, দ্বিতীয় ম্যাচের আগে সে হঠাৎ করে অসুস্থ্ হয়ে পড়ল। সে খেলবে না, তার ভালো লাগছে না সে মানসিকভাবে খুব ভেঙে পড়েছিল। কিছুক্ষণ পর আবার সে সেরে উঠল এবং ব্যাটিংয়ে নামল, ভালো করল। এরপর থেকেই তাকে আর কখনো মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে দেখিনি। তার বাবা সেনাবাহিনীতে ছিলেন, মা রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। পুরো পরিবারটাই খুব ক্রীড়ামনস্ক ও সংস্কৃতিমনা। জাকেরের মানসিক দৃঢ়তা অনেক, এখন সে মানসিকভাবে অনেক শক্ত।’

প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে সিলেট বিভাগীয় দলের হয়ে খেলেন জাকের। সেই দলে কোচের দায়িত্ব পালন করা মাহমুদ ইমন দেশ রূপান্তরকে জানালেন তার অভিজ্ঞতার কথা, ‘আমি অনেক ছোট থেকেই জাকেরকে দেখে আসছি। সে এবং জাকের আলি, এই দুজনকে আমার কাছে মনে হয়েছে সিলেট থেকে জাতীয় পর্যায়ে দুজন ভালো ব্যাটসম্যান হতে পারে। জাকের টেকনিক্যালি যে খুব সাউন্ড ব্যাটসম্যান এমনটা নয়, তবে তার মনের জোর অনেক বেশি। অনেক পরিশ্রম করতে পারে। হাল ছাড়ে না। অনেক কষ্ট সহ্য করতে পারে। চট্টগ্রামে বাংলাদেশ টাইগার্স-এর ক্যাম্পে তার পিঠে হট ওয়াটার ব্যাগ লিক হয়ে গরম পানি পড়ে পুড়ে গিয়েছিল। তবু সে ক্যাম্প থেকে চলে আসেনি।’

ইমন আরও বললেন নিজের খেলা নিয়ে খুবই স্বচ্ছ ধারণা রাখেন জাকের, ‘সে তার সামর্থ্য আর কাজটা সম্পর্কে খুব স্বচ্ছ ধারণা রাখে। অনেক কোচই তার খেলার ধরন বদলাতে চেয়েছে, বিশেষ করে প্রথম শ্রেণির ক্রিকেটে অনেকে তাকে বলেছে আরেকটু ধরে খেলতে। সে বদলে যায়নি। কেউ আছে রান-এ-বল খেলে, কেউ আরেকটু কম, যে যেভাবে অভ্যস্ত। তার ব্যাটিং স্টাইলটা ন্যাচারালি যেমন সেটা পরিবর্তন করা যায় নি।’

তবে টি-টোয়েন্টির জন্য নিজের ব্যাটিংয়ের ধরন বা দাঁড়ানোর ধরনে একটা পরিবর্তন এনেছেন জাকের। ইমন জানালেন গত মৌসুমের বিপিএল থেকেই এটা চেষ্টা করছিলেন জাকের, সফল হলেন এবারে এসে, ‘আগে উইকেটে শাফল করত খুব বেশি, স্টাম্পের বলগুলো ক্রস ব্যাটে। এখন তার বেইস স্টান্সটা পরিবর্তন করেছে। বল জোরে মারার সময় শরীরের ওজনের ভারসাম্য পেছনের পায়ে নিয়ে যাচ্ছে। সে সালাউদ্দিন ভাইয়ের সঙ্গেই এসব নিয়ে কাজ করছে জানতাম। আমরা (সিলেট স্ট্রাইকার্স) তাকে দলে চেয়েছিলাম, কিন্তু নানান কম্বিনেশনের কারণে নিতে পারিনি।’

বিপিএলের পারফরম্যান্সে দেরিতে হলেও জাতীয় দলে ডাক পাওয়ার পর শ্রীলঙ্কা সিরিজের প্রথম টি-টোয়েন্টিতে হাফসেঞ্চুরি জাকেরকে নিয়ে এসেছে পাদপ্রদীপের আলোয়। যে আলোয় মাথা ঘুরে যায় অনেকেরই। আশপাশে তাকালেই এমন অনেক উদাহরণই দেখতে পাবেন জাকের। তাই তার প্রতি ইমনের সাবধানবাণী, ‘এখন অনেক কিছুই আসবে তাকে ক্রিকেট থেকে মনোযোগ সরাতে। নতুন বন্ধু আসবে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে জনপ্রিয়তা বাড়বে। অনেকে ক্রিকেট নিয়েও অনেক পরামর্শ দেবে। তার মনের জোর ভালো, আমি আশা করব এসবের প্রলোভনে সে পা দেবে না। নিজের খেলাটা ধরে রাখতে পারলেই সে ভালো করবে।’

২০১৬’র অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপ দলের অংশ ছিলেন জাকের। যে দলটার সহ-অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত এখন জাতীয় দলেরই অধিনায়ক, আরেক সতীর্থ মেহেদী হাসান মিরাজ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে কাটিয়ে দিয়েছেন ছয়-সাত বছর। ব্যাটিং অর্ডারে নিচের দিকে থাকা জাকের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে সুযোগও পেলেন দেরিতে। ম্যাচে পরের দিকে নামলে বলের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে রান করতে হয়, জীবনের ব্যাটিং অর্ডারের ঘাটতিটা পুষিয়ে নিতে জাকেরকে রান করতে হবে নিয়মিত যেন দলে জায়গাটা হয় পোক্ত। না হলে কী হতে পারে, সেই উদাহরণ খুঁজতে খুব বেশি দূরে যেতে হবে না তাকে।