ডাইনিংয়ে গরুর মাংস রান্না করার কোনো বিধি-নিষেধ নেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারপরও বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোর ডাইনিংয়ে দীর্ঘদিন থেকে বন্ধ আছে গরুর মাংস রান্না। সম্প্রতি বিশ্ববিদ্যালয়ের সৈয়দ আমীর আলী হলের মুসলিম শিক্ষার্থীরা হল প্রশাসনের কাছে দাবি জানায়, তারা রমজান মাসে গরুর মাংস খেতে চায়। প্রশাসন তাদের অনুমতি দিলেও সনাতন শিক্ষার্থীরা এতে বিরোধিতা করে। পরে উভয় ধর্মের শিক্ষার্থীদের নিয়ে মিটিংয়ে বসে হল প্রশাসন। সেখানে ‘যৌক্তিকতা’ ও উভয় ধর্মের শিক্ষার্থীদের মত নিয়ে গরুর মাংস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে সেটা লিখিত না, সবার মতামতের ভিত্তিতে। কিন্তু এই সিদ্ধান্তের কথা ‘ভিন্নভাবে’ ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে। পরে ওই হলের দুই শতাধিক শিক্ষার্থীদের নিয়ে আলোচনা করে রমজান মাসে গরুর মাংস চালানোর সিদ্ধান্ত নেয় হল প্রশাসন।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, যেদিন গরুর মাংস রান্না হবে সেইদিন হাড়ি-পাতিলসহ রান্না ও খাবরের সকল তৈজসপত্র ভাড়া করে আনা হবে। এর যার খরচ বহন করবে হল প্রশাসন।
শুক্রবার (৯ মার্চ) রাত ১০টায় সনাতন ও মুসলিম শিক্ষার্থীসহ প্রায় দুই শতাধিক শিক্ষার্থীর উপস্থিততে এমন সিদ্ধান্ত নেয় হল প্রশাসন।
জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের আমীর আলী হলে একটি মাত্র ডাইনিং। কোনো ক্যান্টিন নাই। এই ডাইনিংটি এখন হলের শিক্ষার্থীরা নিয়ন্ত্রণ করে। নাম দেওয়া হয়েছে ‘ইসাবেল ক্যাটারিং’। এটা শিক্ষার্থীরা নিজেরাই নিয়ন্ত্রণ করে। কিছুটা ছাত্রাবাসের মতো। যেখানে শিক্ষার্থীরা নিজেরা মিটিং করে, কি খাওয়া হবে, কারা বাজার করবে। নিজেদের মধ্যে থেকে ম্যানেজার নির্ধারণ করে শিক্ষার্থীরা এটা পরিচালনা করে। তবে এটি তদারকি করে হল প্রশাসন।
সামনে রমজান মাস আসায় গরুর মাংস চলবে কি চলবে না তার জন্য মুসলিম ও সনাতন ধর্মের প্রতিনিধিদের নিয়ে সভা করে হল প্রশাসন। সেখানে শিক্ষার্থীদের সম্মতি নিয়ে রমজান মাসে গরুর মাংস না চলানো পক্ষে থাকে সবাই। কারণ, এর আগে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ হবিবুর রহমান হলে রমজান মাসে সনাতন শিক্ষার্থীদের দুপুরের খাবারে মুরগির মাংসের সাথে গরুর মাংসের মিশ্রণ পায়। এ নিয়ে তখন আন্দোলনও করে শিক্ষার্থীরা। পরে নিরাপদ খাবারের নিশ্চয়তা নিয়ে মানববন্ধনও করেছিল সনাতন শিক্ষার্থীরা। এরপর গত বছরেই এস এম হলের ক্যান্টিনে সনাতন ধর্মের এক শিক্ষার্থীকে খাসির মাংস বলে গরুর মাংস দিয়ে খাওয়ানো হয়। পরে এ নিয়েও শুরু হয় বিভিন্ন বিতর্ক। এই সকল বিতর্ক ও দুর্ঘটনা এড়াতে হল প্রশাসন গরুর মাংস বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেয়। তবে এটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি করে। তারই প্রেক্ষিতে গতকাল নতুন করে মিটিং ডেকে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করা হয়।
প্রথমবার এই বিষয় নিয়ে যখন মিটিং হয় তখন উপস্থিত ছিলেন স্বপন হোসাইন ও পলাশ মণ্ডল। প্রথম মিটিংয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের ১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের স্বপন হোসাইন ও ডাইনিং কমিটির সদস্য বলেন, সারা বছর আমরা গরুর মাংস না খেলেও রমজান মাসে ৫/৭ দিনের জন্য সেহরিতে গরুর মাংস খাওয়ার জন্য প্রাধ্যক্ষ স্যারের কাছে আবেদন জানাই। আবেদনের প্রেক্ষিতে গত পরশুদিন রাতে প্রাধ্যক্ষ স্যারের কক্ষে আমরা এবং ১০-১৫ জন হিন্দু ভাইদের উপস্থিতিতে প্রাধ্যক্ষ স্যার মিটিং করেন। সেখানে আমরা গরুর মাংস খাওয়ার জন্য আবেদন জানালেও তারা গরুর মাংস খেতে নিষেধ করে। পরে প্রাধ্যক্ষ স্যার সিদ্ধান্ত নেন সেহরিতে গরুর মাংস চলবে না।
পরিসংখ্যান বিভাগের ১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের পলাশ মণ্ডল বলেন, সেহেরিতে গরু মাংস চলবে জানার পর প্রাধ্যক্ষ মহোদয়কে আমাদের আপত্তির কথা অবগত করি। কারণ এর আগে শাহ্ মখদুম হল ও শহিদ হবিবুর রহমান হলে দুটি অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে এই গরু মাংস খাওয়া নিয়ে। তখন প্রাধ্যক্ষ স্যার আমাদের ও কয়েকজন মুসলমান ভাইদের একসাথে নিয়ে মিটিং করেন। ওই মিটিংয়ে আমরা আবারও আপত্তি জানালে প্রাধ্যক্ষ স্যার গরু মাংস বন্ধ রাখতে সবাইকে অনুরোধ জানান।
গতকাল শুক্রবার মিটিংয়ে উপস্থিত সংস্কৃত বিভাগের ১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের দিলবর হোসেন ইমন বলেন, হলের কাটারিংয়ে রমজান মাসে সেহরিতে গরুর মাংস রান্নার ব্যাপারে গত ৭ তারিখে প্রভোস্ট স্যারের রুমে একটি মিটিং অনুষ্ঠিত হয়েছিল। মিটিংয়ে সনাতন ধর্মের শিক্ষার্থীরা গরুর মাংস রান্নার বিরোধিতা করে ও গরুর মাংস রান্না বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়। এতে মুসলিম শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি হয় ও প্রতিবাদ জানায়। পরে প্রভোস্ট স্যার পরের দিন আবার দুই ধর্মের ছেলেদের নিয়ে ডাইনিং রুমে একটা মিটিংয়ের আহ্বান করেন। মিটিংয়ে সকলের সঙ্গে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত হয়, যেদিন গরুর মাংস রান্না হবে সেদিন ডেকোরেশন থেকে প্লেট থেকে শুরু করে রান্নার সকল সরঞ্জাম নিয়ে আসা হবে। ডাইনিংয়ের কোনো জিনিস রান্নার কাজে ব্যবহার করবে না। উভয়পক্ষই এতে সন্তুষ্টি প্রকাশ করে।
ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২২-২৩ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী ও ডাইনিং কমিটির সদস্য সুরঞ্জন মজুমদার বলেন, কয়েকদিন ধরেই এটা বেশ আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এর আগেও দুইবার মিটিং হয়েছিল কিন্তু কিন্তু কোনো সুষ্ঠু সমাধান আসছিল না। তবে কালকের মিটিংয়ে এই সিদ্ধান্ত আমাদের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হয়েছে তাই আমরাও আপত্তি করিনি।
সার্বিক বিষয়ে সৈয়দ আমীর আলী হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম মাহমুদুল হক বলেন, সকল সমালচনা নিয়ে গতকাল আবার সবাইকে নিয়ে মিটিংয়ে বসি। যেহেতু এই হলে একটা মাত্র ডাইনিং। তাই আলাদা আলাদা করে রান্না করা, আলাদা আলাদা করে খাওয়া এটা খুবই কঠিন হয়ে যায়। তাই গতকাল মিটিংয়ে সবার মতামতের প্রেক্ষিতে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। রমজান মাসে গরুর মাংস খাওয়া হবে। তবে যেদিন গরুর মাংস রান্না করা হবে সেদিন বাইরে থেকে রান্নার এবং খাওয়ার আসবাবপত্র ভাড়া করে নিয়ে আসা হবে এবং জিনিসপত্রের যা খরচ হবে তা হল প্রশাসন বহন করবে।
তিনি আরও বলেন, শুধু রমজান মাসের জন্য সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটা সাময়িক। এখন শিক্ষার্থীরা যদি নিয়মিত খেতে চাই তাহলে হল প্রশাসন থেকে আলাদা পাতিলসহ যা প্রয়োজন সব কিনে নেওয়া হবে।