সূচনার ইতিহাস টিটু আবার 

কুমিল্লা ও ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশনসহ স্থানীয় সরকারের ২৩১টি নির্বাচন এবং উপনির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়েছে গতকাল শনিবার। এর মধ্যে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএম) হওয়া দুই সিটির ভোটের ফলে কুমিল্লায় প্রথমবারের মতো নারী মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন ডা. তাহসীন বাহার সূচনা। তিনি কুমিল্লা-৬ আসনের সংসদ সদস্য আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের মেয়ে এবং কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক। অন্যদিকে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আবারও বিপুল ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন সদ্য পদত্যাগকারী মেয়র ইকরামুল হক টিটু। বিচ্ছিন্ন কিছু সহিংসতা ছাড়া এই দুই সিটি করপোরেশন নির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবেই অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাচনসহ সাম্প্রতিক সময়ের অন্যান্য নির্বাচনের চেয়ে ভোটার উপস্থিতি ছিল বেশি।

দিনভর ভোটগ্রহণ শেষে কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের মেয়র পদে উপনির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করা হয়। এতে প্রথম নারী মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়েছেন ডা. তাহসীন বাহার সূচনা। গতকাল সন্ধ্যা সোয়া ৭টার দিকে ফলাফল ঘোষণা শেষে তাকে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। কুমিল্লা জিলা স্কুল অডিটোরিয়ামে উপনির্বাচনের ফলাফল ঘোষণা করেন রিটার্নিং কর্মকর্তা ফরহাদ হোসেন। সেই সঙ্গে কুমিল্লা পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনের ১৩৪ বছরের ইতিহাসে প্রথম নারী মেয়র হলেন কুমিল্লা সদর আসনের চারবারের সংসদ সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা আ ক ম বাহাউদ্দিন বাহারের মেয়ে তাহসীন বাহার সূচনা।

সন্ধ্যায় ফলাফল ঘোষণার স্থল কুমিল্লা জিলা স্কুল অডিটোরিয়ামে আসেন সূচনা। এ সময় সাংবাদিকদের তিনি বলেন, গুরুত্ব দিয়ে তিনি নগরবাসীর সমস্যা সমাধানে কাজ করবেন। নগরবাসীকে অভিনন্দন জানিয়ে সূচনা বলেন, ‘নগরীর অনেক সমস্যা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সবাইকে নিয়ে কুমিল্লা নগরীকে এগিয়ে নিয়ে যাব।’

কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের ১০৫টি কেন্দ্রের বেসরকারিভাবে ঘোষিত ফলাফল অনুযায়ী, বাস প্রতীকের প্রার্থী ডা. তাহসীন বাহার সূচনা পেয়েছেন ৪৮ হাজার ৮৯০ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী টেবিলঘড়ি প্রতীকের মনিরুল হক সাক্কু পেয়েছেন ২৬ হাজার ৮৯৭ ভোট। মনিরুল হকের (সাক্কু) চেয়ে ২১ হাজার ৯৯৩ ভোট বেশি পেয়েছেন ডা. সূচনা। এ ছাড়া অন্য দুই প্রার্থী ঘোড়া প্রতীকের নিজাম উদ্দিন কায়সার পেয়েছেন ১৩ হাজার ১৫৫ ভোট ও হাতি প্রতীকের প্রার্থী নূর-উর-রহমান মাহমুদ তানিম পেয়েছেন ৫ হাজার ১৭৩ ভোট। বৈধ ভোটের সংখ্যা ৯৪ হাজার ১১৫টি, যা মোট ভোটের শতকরা ৩৮.৮২ ভাগ। এই উপনির্বাচন নিয়ে উৎকণ্ঠায় ছিল নগরবাসী। শেষ পর্যন্ত শান্তিপূর্ণভাবে নির্বাচন শেষ হয়েছে।

কুমিল্লা সিটি করপোরেশন এলাকার ২৭টি ওয়ার্ডের ১০৫টি কেন্দ্রে দু-একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয় ভোটগ্রহণ। ইভিএম নিয়েও কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। সকালের দিকে ভোটার সংখ্যা কিছুটা কম দেখা গেলেও বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তা বাড়তে থাকে।

বাস প্রতীকের সমর্থকদের সঙ্গে ঘোড়া প্রতীকের প্রার্থী নিজাম উদ্দিন কায়সারের সমর্থকদের সংঘর্ষে ছাত্রলীগের ওয়ার্ড সভাপতিসহ দুজন গুলিবিদ্ধ হওয়া এবং একটি কেন্দ্রে বাস ও ঘড়ি প্রতীকের নারী সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি ও বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ছাড়া কুসিক উপনির্বাচন শান্তিপূর্ণভাবেই হয়েছে।

নগরীর ১৯ নম্বর ও ৫ নম্বর ওয়ার্ডের ভোটকেন্দ্রে প্রতিপক্ষ প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে গোলাগুলি ও মারধরের ঘটনা ঘটে। এতে ১০ জন আহত হয়েছে। যার মধ্যে ২ জন গুলিবিদ্ধ রয়েছেন। এ ছাড়া ভোটকেন্দ্র থেকে এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন ঘোড়া ও টেবিল ঘড়ি প্রতীকের প্রার্থী।

জানা যায়, সকাল ১০টায় ১৯ নম্বর ওয়ার্ডের মুন্সি এম আলী উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্রের পাশে ঘোড়া প্রতীকের সমর্থক জহিরুল আহমেদ ও তুহিনকে গুলি করে সুমন নামে এক ছাত্রলীগ কর্মী। আহত জহির বলেন, ‘ভোট ক্যাম্পের পাশে আমি দাঁড়িয়ে থাকলে বাস মার্কার সমর্থক মহানগর ছাত্রলীগ নেতা সুজন আমাকে ও তুহিনকে পুলিশের সামনেই গুলি করে।’

অন্যদিকে সকাল সাড়ে ৯টায় ৫ নম্বর ওয়ার্ডে ঘড়ি প্রতীকের এক নারী সমর্থককে মারধর করা হয়।

বাহারকন্যা তাহসীন বাহার সূচনা দীর্ঘদিন ধরে বাবা সংসদ সদস্য হাজি আ ক ম বাহাউদ্দিনের সঙ্গে কুমিল্লা মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। সর্বশেষ মহানগর আওয়ামী লীগের কমিটিতে তিনি সাংগঠনিক সম্পাদকের দায়িত্ব পান। এ ছাড়া তিনি সামাজিক সংগঠন জাগ্রত মানবিকতার সাধারণ সম্পাদক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। করোনা মহামারীর সময় আক্রান্তদের চিকিৎসা ও সাধারণ মানুষদের পাশে থাকায় নির্বাচনে তরুণ ভোটাররা সূচনার পাশে ছিলেন।

এর আগে রাজনীতি ও সমাজকর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও ভোটের মাঠে সূচনা এবারই প্রথম। আর প্রথমবারই বাজিমাত করলেন তিনি। বিজয়ী হয়ে ফিরলেন ঘরে।

২০২২ সালের ১৫ জুন কুমিল্লা সিটি করপোরেশনে মেয়র নির্বাচিত হন আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আরফানুল হক রিফাত। ২০২৩ সালের ১৩ ডিসেম্বর চিকিৎসা চলাকালে মারা যান তিনি। এরপর কুসিকের মেয়র পদ শূন্য ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন উপনির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে। সকাল ৮টায় ভোটগ্রহণ শুরু হয়ে বিকেল ৪টায় শেষ হয়।

আবারও টিটুকে বেছে নিল ময়মনসিংহবাসী : উৎসবমুখর ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশে দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে ময়মনসিংহ সিটি করপোরেশন নির্বাচন। নির্বাচনে আবারও বিপুল ভোট পেয়ে দ্বিতীয়বারের মতো সিটি মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন সদ্য পদত্যাগকারী মেয়র ইকরামুল হক টিটু। গতকাল রাতে নগরীর অ্যাডভোকেট তারেক স্মৃতি অডিটোরিয়ামে অস্থায়ী ঘোষণা মঞ্চে ঘোষিত ফলাফলে ইকরামুল হক টিটুকে বেসরকারিভাবে নির্বাচিত ঘোষণা করা হয়। এই ফলাফলে ঘড়ি প্রতীকে ইকরামুল হক টিটু পেয়েছেন ১ লাখ ৩৫ হাজার ৯৫৯ ভোট। তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী হাতি প্রতীকের সাদেকুল হক খান মিল্কী টজু পেয়েছেন ৩৪ হাজার ৩৯৫। এ ছাড়া ঘোড়া প্রতীকের প্রার্থী এহতেশামুল আলম পেয়েছেন পেয়েছেন ১০ হাজার ৬৪৩ ভোট, হরিণ প্রতীকের কৃষিবিদ রেজাউল হক ১৪৫৮ ভোট আর জাতীয় পার্টির লাঙ্গল প্রতীকের প্রার্থী শহিদুল ইসলাম পেয়েছেন ১২৭৬ ভোট।

ফলাফল ঘোষণার পর বিভিন্ন এলাকায় বিজয় মিছিল নিয়ে বের হন ইকরামুল হক টিটুর কর্মী ও সমর্থকরা।

সকাল ৮টা থেকেই ভোটাররা কেন্দ্রে আসা শুরু করেন। ভোটকেন্দ্রগুলোতে ভোটার উপস্থিতি ছিল সন্তোষজনক। কেন্দ্রের বাইরে ভোটার ও প্রার্থীদের সমর্থকদের উপস্থিতিতে জমজমাট পরিবেশ ছিল। কেন্দ্রের বাইরে ছিল প্রার্থীদের নির্বাচনী ক্যাম্প। তবে ইভিএমে ভোটগ্রহণে কিছুটা ধীর গতি ছিল। ইভিএম মেশিনে অনেকের আঙুলের ছাপ ঠিকমতো না ওঠায় তারা ভোট দিতে সমস্যায় পড়েন। বিভিন্ন কেন্দ্রে ভোটারদের এমন পরিস্থিতিতে পড়তে দেখা গেছে। অনেক কেন্দ্রের পোলিং অফিসারদের মতে, বিভিন্ন কারণে ভোটগ্রহণ দেরি হয়েছে। আঙুলের ছাপ নিতে দেরি হয়েছে। তাই ভোটগ্রহণ ধীর গতিতে হয়েছে।

এ ছাড়া কয়েকটি কেন্দ্রে কোনো কোনো ভোটার বিশেষ করে বয়স্ক ভোটাররা ইভিএমে ভোট দিতে বিড়ম্বনায় পড়েছেন। তবে নারী ভোটারের উপস্থিতি উল্লেখযোগ্য।

বিকেল ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীর সমর্থকরা কেন্দ্রের বাইরে ফলাফলের জন্য অপেক্ষা করতে থাকে এবং কেন্দ্র থেকে ফলাফল ঘোষণার পরপরই বিজয়ী প্রার্থীর সমর্থকরা উল্লাসে মেতে ওঠেন। এ সময় অনেক কর্মী-সমর্থক বিজয়ী প্রার্থীদের আবেগাপ্লুত হয়ে জড়িয়ে ধরেন।

ফলাফল ঘোষণার পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় ইকরামুল হক টিটু বলেন, ‘আমি নগরবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ। আগামী দিনে ভালো কাজের মাধ্যমে আমি জনগণের ভালোবাসার প্রতিদান দেব। দ্রুতসময়ে নগরীর অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করে ময়মনসিংহবাসীকে একটি সুন্দর নগরী উপহার দেব।’