রওশনের কমিটিতে পাঁচ ব্র্যাকেটে জাপা

জাতীয় পার্টির (জাপা) রওশন এরশাদপন্থিরা জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে তিন বছরের জন্য নতুন কমিটি ঘোষণা করেছেন। দলের একপক্ষের এ সম্মেলনে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন রওশন এরশাদ, তার সঙ্গে নির্বাহী চেয়ারম্যান কাজী ফিরোজ রশীদ ও মহাসচিব পদে কাজী মামুনুর রশীদ নির্বাচিত হয়েছেন। আর সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান হয়েছেন আবু হোসেন বাবলা। এ ছাড়া কো-চেয়ারম্যান হিসেবে রাখা হয়েছে শহিদুর রহমান টেপা, শফিকুল ইসলাম সেন্টু, সাদ এরশাদ, গোলাম সারোয়ার মিলন ও সুনীল শুভ রায়কে। রওশনের অবর্তমানে সাদ দলের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করবেন বলেও সম্মেলনে ঘোষণা দেওয়া হয়।

দলের মহাসচিব পদে কাজী মামুনকে নিয়ে আপত্তি ছিল অধিকাংশ নেতার। এ নিয়ে দফায় দফায় গত শুক্রবার রাতে বৈঠক হয়, তবে মামুন ছাড়া আর কাউকে মহাসচিব বানাতে রাজি হননি রওশন।

ফলে বাধ্য হয়ে নির্বাহী চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি করে কাজী ফিরোজকে সেই পদ দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়। তবে সম্মেলনে চমক দেখানোর ঘোষণা দেওয়া হলেও তাতে ব্যর্থ হয়েছেন রওশনপন্থিরা। অধিকাংশ জেলা থেকেই প্রতিনিধিদের আসতে দেখা যায়নি। নির্বাচন-পরবর্তী সংকট থেকে যে নেতারা জাপা থেকে পদত্যাগ করেন কিংবা বহিষ্কার হন, তাদের বাইরে বড় কোনো নেতাকে এই সম্মেলনের মঞ্চে দেখা যায়নি।

জাপা প্রতিষ্ঠাতা হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের জীবদ্দশায় ১৯৯৬ সালে প্রথমবার ভাঙনের মুখে পড়ে। সে সময়ের যোগাযোগমন্ত্রী আনোয়ার হোসেন মঞ্জু জাতীয় পার্টি নামে নতুন দল গঠন করেন। ২০০১ সালের নির্বাচনের আগে নাজিউর রহমান মঞ্জু ও এম এ মতিন জাতীয় পার্টি নামে আরেকটি দল গঠন করেন। নাজিউরের নেতৃত্ব থেকে বের হয়ে এম এ মতিন গঠন করেন আলাদা জাতীয় পার্টি। ২০১৪ সালে সাবেক প্রধানমন্ত্রী কাজী জাফরের নেতৃত্বে আবারও ভাঙে দলটি। সবশেষ গতকাল শনিবার রওশন এরশাদের নেতৃত্বে পৃথক হয় জাতীয় পার্টি।

গতকাল শনিবার রাজধানীর ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে আয়োজিত এই সম্মেলনের শুরুতে চেয়ারম্যানের দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ান রওশন এরশাদ এবং সভায় সভাপতিত্ব করেন কাজী ফিরোজ রশীদ। নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে দলের প্রেসিডিয়াম মেম্বার গোলাম সারোয়ার মিলন ও ফখরুজ্জামান জাহাঙ্গীর চেয়ারম্যান হিসেবে রওশন এরশাদ এবং অন্যান্য পদে নির্বাচিত নেতাদের নাম প্রস্তাব করেন। এ সময় উপস্থিত কাউন্সিলর ও ডেলিগেটরা দুই হাত উঁচিয়ে সমর্থন জানান। একইভাবে অন্যান্য পদেও নির্বাচন করা হয়।

সম্মেলনে রওশন এরশাদ বলেন, ‘দশম এই সম্মেলনের মাধ্যমে পল্লীবন্ধু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের দেখানো পথে জাপার চলার পথ সুগম হয়েছে। জনগণের মাধ্যমে আমাদের বিশ্বাস আবার প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছি এই সম্মেলনের মাধ্যমে। প্রতিকূল পরিস্থিতি মোকাবিলা করেই জাপার রাজনীতি টিকে আছে। ৯৬ সালের নির্বাচনের পর আমাদের দলীয় প্রতীক ছিনিয়ে নেওয়ার প্রচেষ্টা চালানো হয়। কিন্তু পল্লীবন্ধু এরশাদ ও আমি লড়াই করে সেই প্রতীক রক্ষা করি। এই প্রতীক কেউ ছিনিয়ে নিতে পারবে না, আমাদের হাতেই থাকবে। এরশাদের জাপায় কোনো বিভেদ নেই। সবাই এই ছাতায় আসবে।’

কাজী ফিরোজ বলেন, ‘নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে আজ আমরা একত্র হয়েছি। যারা দলের চেয়ে নিজের স্বার্থ বেশি চিন্তা করেন, তাদের হাত থেকে দলকে মুক্ত করা হয়েছে। আপনারা আজকের পর থেকে নতুন উদ্দীপনা নিয়ে কাজ শুরু করেন। দেশের মানুষ চায় জাপা সত্যিকারের রাজনীতিতে ফিরে আসুক, মানুষের কথা বলুক। আমাদের পথ হবে একটাই, যেটা পল্লীবন্ধু এরশাদ দেখিয়ে গেছেন।’

নতুন মহাসচিব কাজী মামুনুর রশীদ তার বক্তব্যে বলেন, ‘এটা একটা ঐতিহাসিক সম্মেলন। এই সম্মেলন থেকে এরশাদের জাতীয় পার্টি সঠিক কক্ষপথে ফিরে আসবে। রওশন এরশাদ দিকনির্দেশনা দেবেন এবং কাজী ফিরোজ রশীদ ও আবু হোসেন বাবলার মতো নেতার নেতৃত্বে সারা দেশে দল প্রাণ ফিরে পাবে। সারা দেশ থেকে নেতাকর্মীদের জমায়েতই প্রমাণ করে দেয় যে জাপা ফুরিয়ে যায়নি, আগামী দিনে আমরাই মানুষের পক্ষে আওয়াজ তুলব।’

রওশন এরশাদের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত জাপা থেকে বহিষ্কৃত মহাসচিব মশিউর রহমান রাঙ্গা এবং দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সচিব সাবেক রাষ্ট্রদূত গোলাম মসীহকে এই সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন না। দীর্ঘদিন ধরে রওশন এরশাদের হয়ে জাতীয় পার্টির রাজনৈতিক বিভিন্ন দিক সামলালেও এই সম্মেলনে তারা উপস্থিত ছিলেন না। জাপার দায়িত্বশীল একাধিক নেতা বলেন, দলের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ মারা যাওয়ার পর থেকে রাঙ্গা ও মসীহ রওশন এরশাদের সব বিষয়ে দেখভাল করতেন। নিতেন দলের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তও। সম্প্রতি তাদের বাদ দিয়ে নেওয়া হয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। তা ছাড়া কমিটির মহাসচিব হিসেবে কাজী মামুনুর রশীদকে মেনে নিতে আপত্তি ছিল এই দুই নেতার।

সম্মেলনে উপস্থিত না থাকা বা কমিটিতে পদ না পাওয়ার বিষয়ে মশিউর রহমান রাঙ্গার সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি রংপুরে আছেন বলে জানান। সম্মেলনে না থাকার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘নো কমেন্টস।’

একাধিক নেতা জানান, শুধু এই দুই নেতাই নন, মহাসচিব পদ নিয়ে আপত্তি ছিল কাজী ফিরোজ ও আবু হোসেন বাবলারও। শুক্রবার রাতভর মহাসচিব পদ ছিল আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। কাজী ফিরোজ ও বাবলা উভয়ই মহাসচিব পদ দাবি করেন। কিন্তু রওশন এরশাদ মামুনকে ছাড়া আর কাউকে এই পদে দায়িত্ব দিতে আগ্রহ দেখাননি। শেষ পর্যন্ত নির্বাহী চেয়ারম্যান পদ সৃষ্টি করে কাজী ফিরোজকে দায়িত্ব দিয়ে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয় এবং সিনিয়র কো-চেয়ারম্যান করা হয় বাবলাকে।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে নতুন কো-চেয়ারম্যান ও দলের মুখপাত্র সুনীল শুভ রায় বলেন, ‘আমরা দলকে ঐক্যবদ্ধ ও গতিশীল করার লক্ষ্যে কাজ করব। দ্রুতই কমিটি পূর্ণাঙ্গ করা হবে। সেখানে অনেকে পদে আসবেন।’ এর বাইরে অন্য কোনো বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি এই নেতা।

এদিকে রওশন এরশাদপন্থিদের এই সম্মেলন দলের গঠনতন্ত্রবিরোধী বলে উল্লেখ করেছেন জাতীয় পার্টির (জিএম কাদের নেতৃত্বাধীন) মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ডাল-পালা, লতা-পাতা নিয়ে জাতীয় পার্টির নাম ব্যবহার করে অনেকে সম্মেলন করতে পারে। অনেক কমিটি হতে পারে। তবে জিএম কাদের নেতৃত্বাধীন আমরাই মূল জাতীয় পার্টি। এর আগেও জাপাকে অনেকেই ব্র্যাকেটবন্দি করার চেষ্টা করেছেন কিন্তু রাজনীতির মাঠে তাদের কোনো সফলতা নেই।’