নেপাল থেকে আরেকটি শিরোপা

নেপালের মাটি যেন বাংলাদেশ ফুটবলের জন্য লক্ষ্মীর ভা-ার। হিমালয়কন্যারা যুগে যুগে দুহাত ভরে দেয় বাংলাদেশকে। ১৯৯৯ সালে কাঠমান্ডু সাফ গেমসের স্বর্ণপদক জয় দিয়ে শুরু। ২০২২ সালে বাংলাদেশ নারী জাতীয় দল প্রথমবারের মতো দক্ষিণ এশিয়ার সেরা হয়েছিল এই নেপালের মাটিতে। সেবার স্বাগতিকদের হারিয়ে সাবিনা খাতুনরা বসেছিলেন সিংহাসনে। এবার এই দেশেই আরেকটি প্রথমের সঙ্গে সাক্ষাৎ ঘটল বাংলাদেশের। রবিবার প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত সাফ অনূর্ধ্ব-১৬ ওমেন্স চ্যাম্পিয়নশিপের ফাইনালে ভারতকে টাইব্রেকারে ৩-২ গোলে হারিয়ে ইতিহাস গড়েছে বাংলাদেশের মেয়েরা। নির্ধারিত সময় ১-১ থাকার পর টাইব্রেকারে ভারতের তিনটি শট রুখে দিয়ে আনফা কমপ্লেক্সের শেষ বিকেলের সব আলো কেড়ে নেন বাংলাদেশ গোলকিপার ইয়ারজান বেগম।

অথচ ম্যাচের প্রথমার্ধে খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছিল না বাংলাদেশকে। বাঁশি বাজার সঙ্গে সঙ্গে হাই-প্রেসিং ফুটবলে বাংলাদেশকে শুরুতেই এলোমেলো করে দেয় ভারত। চতুর্থ মিনিটে লিডও নিয়ে নেয় তারা। আসরে ষষ্ঠ গোলের দেখা পান আনুশকা কুমারী। পিছিয়ে পড়া বাংলাদেশের খেলা দেখে মনে হচ্ছিল না, এই ম্যাচে তারা আর ঘুরে দাঁড়াতে পারবে। তবে ৭০ মিনিটে মরিয়ম বিনতে আন্নার সুযোগ সন্ধানী গোলে সমতায়  ফেরে বাংলাদেশ। ফলে শিরোপা ভাগ্য গড়ায় টাইব্রেকারে। সেই ভাগ্য পরীক্ষায় ইয়ারজানের বীরত্বে নিশ্চিত হয় শিরোপা। টাইব্রেকারের কথা মাথায় রেখে ভারত কোচ মাঠে পাঠান সুরাজমুনি কুমারীকে। এই দীর্ঘকায় গোলকিপার টাইব্রেকারে বাংলাদেশের  সুরভী আখন্দ প্রীতির নেওয়া শট রুখে দিয়ে কোচের আস্থার প্রতিদান দেন। তবে সুরাজমুনি নন। এই টাইব্রেকারের নাটকের চিত্রনাট্যের শেষটা লেখা ছিল ইয়ারজানের নামে।

পুরো আসরে পাঁচ গোল করা সুরভী ফাইনালে গোল পাননি। টাইব্রেকারেও লক্ষ্যভেদ করতে না পারায় একটা শঙ্কা জেগেছিল। এরপর ভারতের অধিনায়ক শ্বেতা রানী গোল করে ভারতকে এগিয়ে নেন। বাংলাদেশ অবশ্য পরের দুই শটে গোল পায়। সফল লক্ষ্যভেদ করেন মরিয়ম ও থুইনুই মারমা। অন্যদিকে অ্যালেনা ও বনিবিলিয়ার সুল্লাহর শট রুখে দেন ইয়ারজান। তাতে বাংলাদেশ এগিয়ে যায় ২-১ এ। তবে আলপি আক্তার বাংলাদেশের চতুর্থ শটটা ঠিকঠাক নিতে পারেননি। তার শট সাইড পোস্টে লেগে ফিরে আসে। সুযোগ কাজে লাগিয়ে ২-২ করে ফেলেন ভারতের অনিতা। বাংলাদেশের পঞ্চম শটটা অবশ্য ঠিকঠাক জালে রাখেন সাথী মান্ডা। তবে ভারতের দেবযানীর শট রুখে দিয়ে বাংলাদেশকে আনন্দে ভাসান ইয়ারজান।

এর আগের নির্ধারিত ৯০ মিনিটের বেশিরভাগটাই ছিল ভারতের প্রাধান্য। শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক ফুটবলে বাংলাদেশকে এলোমেলো করে তোলে তারা। সুবাদে চতুর্থ মিনিটে লিড পায় লিগপর্বে বাংলাদেশের কাছে ৩-১ গোলে হারা ভারত। আনুশকা কুমারী নিজেদের অর্ধ থেকে সতীর্থ বনিবিলিয়ার লম্বা বল অফসাইডের ফাঁদ ভেঙে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে বক্সে ঢুকে বাঁ পায়ের কোনাকুনি শটে দূরের পোস্টে জমা করেন। বলের দিকে ঝাঁপিয়েও তার নাগাল পাননি ইয়ারজান। গোল খাওয়ার পর আরও ছন্নছাড়া মনে হয়েছে বাংলাদেশকে। তারা বল ও মাঠের নিয়ন্ত্রণ নিতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে প্রথমার্ধে। ৪৩ মিনিটে অবশ্য প্রথম কর্নারের সুযোগ থেকে গোল পেতে পারত বাংলাদেশ। ফাতেমা আক্তারের কর্নার অবশ্য প্রথমে গোললাইন থেকে ফিস্ট করেন ভারত কিপার মুন্নি। পরে পাঞ্চ করে ক্লিয়ার করেন। বিরতি থেকে ফিরেও বাংলাদেশের খেলায় পরিকল্পনার ছাপ ছিল না। তবে ভারতও সেভাবে চড়াও হতে পারেনি। ৭০ মিনিটে সেট পিসের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সমতায় ফেরে বাংলাদেশ। বদলি উইঙ্গার অনন্য মুরমুর কর্নার ভারতীয় কিপার ঠিকঠাক ক্লিয়ার করতে ব্যর্থ হলে ফিরতি বলে মরিয়মের চিপ জালে জড়ায়। পরের ২০ মিনিট বাংলাদেশ চেপে ধরেছিল ভারতকে। বারবার আক্রমণে উঠেছে তারা দুই অর্ধ কাজে লাগিয়ে। তবে প্রতিপক্ষের গোলের মুখ আর খুলতে পারেনি। তাতে ম্যাচ গড়িয়েছে টাইব্রেকারে। সেই ভাগ্য পরীক্ষায় চমক দেখিয়ে ইয়ারজান হয়ে ওঠেন উৎসবের কেন্দ্রবিন্দু।

গত মাসে ঢাকায় এই দুদল ফাইনালে একে অপরের মুখোমুখি হয়েছিল সাফ অনূর্ধ্ব-১৯ চ্যাম্পিয়নশিপে। ঘটনাবহুল সেই ফাইনালটা শেষ হয়েছিল কলঙ্কজনক এক অধ্যায়ের জন্ম দিয়ে। শ্রীলঙ্কান ম্যাচ কমিশনারের ভুল ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তে শিরোপা ভাগাভাগি করতে হয় দুদলকে। এবারও ফাইনালের ভাগ্য গড়িয়েছিল টাইব্রেকারে। তবে ইয়ারজান প্রাচীর হয়ে দাঁড়িয়ে যাওয়ায় শিরোপার হাসি হেসেছে বাংলাদেশের ষোড়শীরা ঠিক ২০২২ সিনিয়র সাফজয়ী পূর্বসূরিদের মতো।

ফাইনালে গোল করতে না পারলেও আসরের সেরা খেলোয়াড় হয়েছেন সুরভী আখন্দ প্রীতি। ছয় গোলে সেরা গোলদাতা অবশ্য ভারতের আনুশকা কুমারী। আর ফাইনালে জ্বলে উঠে সেরা গোলকিপার ইয়ারজান।