রেফারি ব্যাটা লাঞ্চে কী খেয়ে ভিএআর রুমে বসছিল?
ফুটবলের বর্তমান যুগের সেরা দুই কোচের সম্ভাব্য শেষ লড়াইয়ের পর এমনটাই বলেছেন ইয়ুুর্গেন ক্লপ। খেলার একদম শেষ মুহূর্তে লিভারপুলের অ্যালেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টারের বুকে ম্যানচেস্টার সিটির জেরেমি ডকুর বুট আঘাত করলেও রেফারি পেনাল্টি দেননি। ভিডিও রেফারি এই ‘ড্যাঞ্জারাস হাই বুট’ না দেখায় খেদ ঝাড়েন ক্লপ।
এই বিতর্ক নিয়ে সমর্থকরা হয়তো অনেক দিন কথা বলবেন, হয়তো এর ওপর আরেকটি লিগ টাইটেল নির্ধারিত হয়ে যাবে। কিন্তু ক্লপ আর তার প্রতিদ্বন্দ্বী পেপ গার্দিওলার অনবদ্য দ্বৈরথের শেষটা তাদের পুরো সময়ের মতোই ছিল দারুণ উপভোগ্য।
পেপ আর ক্লপ যেন ফুটবল মাঠের দুই দারুণ দাবাড়–। ফুটবলের মজাটা হচ্ছে, এই খেলায় কেবল গোল হওয়া না হওয়া নিয়ে আনন্দ পাওয়া যায়। হাজার পরিসংখ্যানের ভারে ডুবে থাকা যায়, আবার কিংবদন্তি ইয়োহান ক্রুইফ যেমনটা বলতেন, ফুটবল খেলাটা আসলে মাথাতেই হয়, পা এর একটা অংশ মাত্র।
যারা ফুটবলের এই সর্বোচ্চ জায়গাটা নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করেন, তাদের কাছে ক্লপ আর পেপের লড়াই আর হবে না-এই ভাবনাটা ভীষণ কষ্টের। এই দুই ট্যাকটিকাল জায়ান্টের কিছু ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করা যাক:
বিল্ড আপ বনাম প্রেসিং
ক্রুইফের আলাপটা আসায় ওনার ভাবশিষ্য গার্দিওলাকে দিয়েই শুরু করা যাক। পেপ গার্দিওলা টিকিটাকার মাস্টার। এই ট্যাকটিকে বল আয়ত্তে রাখা জরুরি। বিল্ড আপ প্লে করা হয় একদম গোলকিপারের থেকে। ফুলব্যাকরা ওপরে উঠে যান এবং সময়ে-সময়ে একদম উইং লাইন ধরে এগোন; অর্থাৎ হাই অ্যান্ড ওয়াইড। এদের কাভার দেন সেন্ট্রাল মিডফিল্ডার। তিনি প্রতিপক্ষের কাউন্টার অ্যাটাকের সময় নিচে নেমে আসেন। এসব কারণে, এ ব্যবস্থায় বল প্লেয়িং কিপার এবং প্রেসিং ফুলব্যাক খুব জরুরি। আমরা দেখি, সিটির দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম দিকে ক্লদিও ব্রাভো পোস্টের নিচে বেশ কিছু ভুল করলেও ওনার বল পায়ে কন্ট্রোল এবং ডেলিভারির জন্য পেপ তাকে অনবরত খেলান। তবে পেপের টিকিটাকা কেবল পাস আর ডেলিভারি নয়; বরং প্রেসিংয়ের সঙ্গে যুক্ত হয়।
কিংবদন্তি কোচ স্যার আলেক্স ফার্গুসন ওনার আত্মজীবনীতে লিখেছিলেন, পেপের বার্সেলোনার ভিত্তি হচ্ছে ক্রুইফের টোটাল ফুটবল, কিন্তু পেপ এটাকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যান এতে প্রেসিং যোগ করে। পেপের ছেলেরা ‘তিন সেকেন্ড’ রুল অনুশীলন করতেন, যার মানে হচ্ছে প্রতিপক্ষের পায়ে কোনোভাবেই তিন সেকেন্ডের বেশি বল রাখতে দেওয়া হবে না।
আধুনিক ফুটবলে যদি আমরা ট্যাকটিকাল পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় ব্যাপারটা দেখতে পাই তা হচ্ছে, সময়। ট্যাকটিকের ইতিহাস নিয়ে এযাবৎকালের সেরা বই জোনাথন উইলসনের ইনভার্টিং দ্য পিরামিডে তিনি দেখান, পঞ্চাশ বা ষাটের দশকে ড্রিবল করা খেলোয়াড়দের খুব বেশি প্রেস করা হতো না। গারিঞ্চা বা স্ট্যানলি ম্যাথিউসের দুর্দান্ত ড্রিবল দেখে আমরা রোমান্টিক হয়ে যাই, কিন্তু এখনকার দিনে ড্রিবল করতে যে তিন-চার গজ ফাঁকা স্পেস এবং কয়েক সেকেন্ড লাগে তা কোনো ডিফেন্ডারই দেবে না।
ঠিক এখানেই ক্লপের বৈশিষ্ট্য। পেপের কাছে প্রেসিং যদিও সেকেন্ড লাইন অব ডিফেন্স, ক্লপের কাছে প্রেস, প্রেস, প্রেস আনটিল ডাই। ক্লপের খেলোয়াড়রা বিপক্ষকে প্রেস করে মাঝমাঠে নিয়ে আসেন আবার সেখান থেকে ‘হাউন্ডের’ মতো বল দখল করেন। ক্লপের উইংগাররা বিপক্ষের সেন্ট্রাল ডিফেন্ডারদের প্রেস করতে নির্দেশ দেন এবং একই সময় তাদের কাভার শ্যাড ব্যবহার করে ফুল ব্যাকদের পাসিং লাইন বন্ধ করে দেন।
ক্লপের সিস্টেমে সবচেয়ে জরুরি ফুলব্যাকরা। তারা প্রতিনিয়ত ওঠানামার মধ্যে থাকেন। এমনকি নামতে ব্যর্থ হলেও সেই দায়িত্ব নেন সেন্ট্রাল মিড। যে কারণে আমরা দেখি ট্রেন্ট আলেকজান্ডারের প্রচুর ডিফেন্সিভ এরর হলেও তিনি ক্লপের তুরুপের তাস। ক্লপের সিস্টেমের আরেকটা জরুরি ব্যাপার হচ্ছে হাফ স্পেস। পুরো মাঠটাকে যদি আমরা আনুভূমিক রেখা টেনে পাঁচটা সমান ভাগে ভাগ করি, তবে মাঝখানের অংশটা সেন্টার। দুই প্রান্তের অংশ ওয়াইড এরিয়া আর প্রান্ত ও ওয়াইডের মাঝে যে দুইটা অংশ তাদের বলে হাফ স্পেস। ক্লপের উইংগার আর ফুলব্যাকরা হাফ স্পেস দিয়ে পরস্পরের পজিশনাল ইন্টারচেঞ্জ করে প্রতিপক্ষকে ব্যতিব্যস্ত করে দেয়।
এই পুরো কাজটাই আবার ক্লপের দল করে হাই লাইন ডিফেন্স মেইনটেন করে। ক্লপের দলে সব সময় দরকার দুজন গতিশীল হাফব্যাক, যারা প্রতিপক্ষকে গতি দিয়ে আটকাতে পারবে। আমরা রবিবারের খেলাটাতেও দেখি একাধিকবার ভার্জিল ভ্যান ডাইক শুধু গতি এবং দুর্দান্ত কাভারিং সেন্স দিয়ে হাইলাইন ব্রিচ করা সিটির অ্যাটাক ঠেকিয়ে দিয়েছেন।
ট্যাকটিকাল রিজিডিটি
দুজন পুরো ভিন্ন ঘরানার কায়দায় খেলালেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুজনই নিজেদের খেলায় পরিবর্তন এনেছেন এবং এর পেছনে পরস্পরের প্রভাবই সবচেয়ে বেশি।
ক্লপ গত বছর থেকে ট্রেন্টকে ইনভার্টেড ফুলব্যাক হিসেবে খেলাচ্ছেন। ক্লপের মিডফিল্ডাররা মূলত প্রেসিং এবং ডিফেন্সের দায়িত্বে থাকলেও তিনি থিয়াগোকে এনেছিলেন পাসিং রেঞ্জের জন্য। যদিও পেপের অধীনে অনেক দিন খেলা থিয়াগোকে তিনি ইনজুরির জন্য তেমনটা পাননি। এমনকি পেপ যখন গোল মেশিন হালান্ডকে আনলেন ডিরেক্ট স্ট্রাইকার হিসেবে ক্লপও ফিরমিনোর বদলি হিসেবে ফলস নাইন ধরনের প্লেয়ার না এনে সাইন করালেন ডারউইন নুনেজকে। মিডফিল্ডে অধিকতর সৃষ্টিশীল ম্যাক অ্যালিস্টার।
তবে একটা কথা স্বীকার করতেই হয় যে ইন-গেম ম্যানুভারে ক্লপ অনেকটাই এগিয়ে। পেপ কন্ট্রোল ফ্রিক। তিনি প্রথম সেকেন্ড থেকেই কন্ট্রোল চান। ফলে খেলায় পিছিয়ে পড়লে বা আউট অব কন্ট্রোল হলে তিনি অনেক সময় দিশেহারা হয়ে যান। যদিও আমরা দেখি লিগের শেষ খেলায় দুই গোলে পিছিয়ে থেকে অ্যাস্টন ভিলার বিরুদ্ধে পাঁচ মিনিটে তিন গোল দিয়ে সিটি শিরোপা জেতে। এক পয়েন্টে। এ ব্যাপারটায় পরে আসছি।
তবে, বহুবার দেখা গেছে ক্লপের খেলোয়াড়রা শেষ মিনিটে বা ইনজুরি টাইমের গোলে জিতেছে। আমরা এই সিজনেই বেশ কয়েকবার দেখেছি, বিরতির সময় ক্লপের পরিবর্তন ছিল ম্যাজিকের মতো। নিউক্যাসেলের সঙ্গে এক গোলে পিছিয়ে এবং একটা লাল কার্ড নিয়েও ক্লপের দল শেষতক ২-১ গোলে জেতে। যেভাবে তিনি সেদিন ট্যাকটিকাল মাস্টার ক্লাস করে পুরো খেলা মাঝমাঠে এনে ফেলেছিলেন, তা নিয়ে অনেক বড় একটা আর্টিকেল লেখা যায়।
পারস্পরিক শ্রদ্ধা
এই যুগে আমরা দেখতে পাই, ফ্যান থেকে শুরু করে সব মিডিয়া সারা দিন উত্তেজনায় ব্যস্ত। খেলোয়াড়, কোচ আর ফ্যানদের হাতাহাতি, গালাগালি চলছেই। সেই জায়গায় এই দুজনের সম্পর্ক যেন অবিশ্বাস্য। ইন্টারনেটে অজস্র ভিডিও দেখা যায় যেখানে পরস্পরকে হাসিমুখে প্রগাঢ় আলিঙ্গনে জড়িয়ে ধরছেন। রেফারিদের নিয়ে দুজনই নানা সময় অনেক কিছু বলেছেন, কিন্তু পরস্পরকে নিয়ে কখনো খারাপ কথা বলতে শোনা যায়নি।
অবশ্য তাই বলে মাঠের লড়াইয়ে এই দুই যোদ্ধা এক ইঞ্চি ছাড় দেননি। পরস্পরের বিপক্ষে হারা যাবে না- এই মন্ত্রে উজ্জীবিত হলেও খেলার কৌশল রক্ষণাত্মক করেননি। এই দুজনের অধীনে লিভারপুল বনাম ম্যানচেস্টার সিটির ২১ ম্যাচে গোল হয়েছে গড়ে ৩ দশমিক ২টি করে, যা লিগের গড়ের চেয়ে অনেক অনেক বেশি।
সাফল্য
ক্লপকে চরম দুর্ভাগা বলাই যায়। দুই-দুইবার তিনি মাত্র এক পয়েন্টের জন্য শিরোপা পাননি। চ্যাম্পিয়নস লিগের ফাইনালে দারুণ খেলেও হেরেছেন এক গোলের ব্যবধানে। একবার তো সাদিও, মানে সিটির বিপক্ষে গোল পেলেন না কয়েক মিলিমিটারের জন্য। অন্যদিকে সিটি অজেয়। পাঁচটি লিগ শিরোপার পাশাপাশি একটা ইউসিএল। মুখোমুখি লড়াইয়ে ক্লপ সামান্য এগিয়ে থাকলেও (১২-১১) সার্বিক সাফল্যে ক্লপ অনেকটাই এগিয়ে।
যদিও লিভারপুলকে যে অবস্থায় দায়িত্ব নিয়েছিলেন, ক্লপের সাফল্য অভাবনীয়। ক্লাবটা তখন ২৫ বছর ধরে শিরোপা জেতে না, মাঝে মাঝেই টেবিলের মাঝের অবস্থানগুলোতে লিগ শেষ করে, ইউসিএল খেলা অনিয়মিত। সেই জায়গা থেকে অঢেল বিত্তের, সর্বজয়ী কোচের অধীনে খেলা ম্যানচেস্টার সিটির সঙ্গে পাল্লা দেওয়াই একটা রুপকথা।
পেপ এবং ক্লপই ইংলিশ ফুটবলে একই যুগে সবগুলো মেজর ট্রফি জেতা কোচ। এ রকম জোড়া কোচ আগে কখনো আসেনি। (বব পেইসলি ও ব্রায়ান ক্লফ ইউরোপিয়ান কাপ জিতলেও এফএ কাপ জেতেননি আর্সেন ওয়েঙ্গার চ্যাম্পিয়নস লিগ জিততে পারেননি)।
পেপ আর ক্লপের বাইরে কেবল স্যার অ্যালেক্স ফার্গুসনই ইংলিশ ক্লাবের হয়ে লিগ, ইউসিএল, এফএ কাপ ও লিগ কাপ জিতেছেন।
তবে সব ছাপিয়ে মনে পড়বে এই দুই কোচের দল একই সিজনে ৯০ পয়েন্টের বেশি পেয়েছিল। ওইরকম ভয়ানক লড়াই আর কখনো ইংলিশ লিগ দেখেনি, আর কোনো সময়েই দুইটা দল একই বছর ৯০-এর সীমা পার হয়নি।
ক্লপ আর পেপ পরস্পরের প্রতি বিপুল শ্রদ্ধাবোধ, শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে লড়াই করার মানসিকতা আর প্রতিনিয়ত শেখার তাড়নায় ইংলিশ লিগকেই অন্য পর্যায়ে নিয়ে গেছেন।
গোটা ফুটবলের ট্যাকটিক আর মানের ইতিহাসকেও।