শপথের দিনই রাষ্ট্রপতির সম্মান প্রতিষ্ঠা করেছিলেন

স্থিতধী রাজনীতিবিদ, প্রখ্যাত জননেতা, ভাষাসৈনিক, বীর মুক্তিযোদ্ধা এবং দেশিকোত্তম ব্যক্তিত্ব, বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি প্রয়াত মো. জিল্লুর রহমান (৯ মার্চ, ১৯২৯-২০ মার্চ,২০১৩) ছিলেন একজন ক্ষণজন্মা পুরুষ। যিনি ছিলেন আপন মহিমায় ভাস্বর। অমায়িক ব্যবহার, স্বল্পভাষী এবং সদালাপী। দেশ ও জাতির সংকটময় মুহূর্তে অত্যন্ত বিচক্ষণতার ও দৃঢ়তার সঙ্গে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ করার ও রাখার ব্যাপারে অয়োময় প্রত্যয়ের অধিকারী ছিলেন তিনি।

মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র বিধৌত কিশোরগঞ্জের ভৈরব বাজারের ভাটি থেকে উঠে আসা মো. জিল্লুর রহমান তার দলের সাধারণ একজন সদস্য হতে দেশের এক নম্বর ব্যক্তিতে পরিণত হয়েছিলেন। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ৫৪ সালের যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনকালে, ১৯৬২-এর আইয়ুববিরোধী ছাত্র আন্দোলনে, ৬৬-এর ছয়দফা, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থান, ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, এমনকি পরিণত বয়সে ৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের সক্রিয় কর্মী ও নেতা ছিলেন তিনি। তিনি  বঙ্গবন্ধুর অত্যন্ত আস্থাভাজন ছিলেন। ওয়ান ইলেভেনের পরে সংকটকালে দলের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি হিসেবে কোমলে কঠোরে অবস্থান গ্রহণের দ্বারা তিনি সময়ের সাহসী নেতৃত্বে আসীন হন। প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের দুই দুইবার (১৯৭২-৭৫ এবং ১৯৯৬-২০০১) সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন সবচেয়ে গুরুত্ববহ সময়ে। তিনি বঙ্গবন্ধু (১৭ মার্চ ১৯১৯-১৫ আগস্ট ১৯৭৫) এবং জিয়াউর রহমান (১৯ জানুয়ারি ১৯৩৬- ৩০ মে ১৯৮১) এর পর বাংলাদেশের তৃতীয় রাষ্ট্রপতি যিনি দায়িত্ব পালনকালে মৃত্যুবরণ করেন।

২০০১ সালের কথা, তিনি তখন স্থানীয় সরকার ও সমবায় বিভাগের মন্ত্রী। হোটেল পূর্বাণীতে বাংলাদেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতির ওপর একটি সেমিনারে প্রধান অতিথি হিসেবে এসেছিলেন। বিনিয়োগ বোর্ডে বৈদেশিক বিনিয়োগ উইং-এর পরিচালক হিসেবে আমি ওই সেমিনারে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করি। কীভাবে সে সময় দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ প্রবাহ বৃদ্ধি পেয়েছে সে সংক্রান্ত তথ্য পরিসংখ্যানসহ বক্তব্য উপস্থাপনের পর মঞ্চে বসার সময় আমাকে সহাস্য ধন্যবাদ জানিয়ে ছিলেন এবং সেমিনার শেষে চলে যাওয়ার সময় পরম স্নেহে আমার পিঠে হাত রেখে সপ্রশংস শুভেচ্ছা জানিয়েছিলেন। আমাকে ব্যক্তিগতভাবে মনে রেখেছিলেন। পরবর্তী সময়ে যে কোনো অনুষ্ঠান কিংবা বঙ্গভবনে জাতীয় দিবসগুলোতে সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে যখনই দেখা হয়েছে সবসময়ই ব্যক্তিগত কুশলাদি জানতে চেয়েছেন। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডে দায়িত্ব পালনের পর স্বয়ম্ভর বাংলাদেশের প্রত্যাশায় আমার ‘এনবিআরের দিনগুলি’ নামে একটি বই বের হয় মওলা ব্রাদার্স থেকে। তাকে বইটি দিতে গেলাম বঙ্গভবনে। খুব খুশি হলেন এবং সেখানে উপস্থিত তার সচিব, সামরিক সচিব, প্রেস সচিব সবার সামনে আমাকে উপলক্ষ করে বললেন, ‘উনি আমার একজন প্রিয় ব্যক্তি।’ তিনি এ কথাও বললেন যে, রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান থাকার সময় আমার উদ্যোগ ও প্রয়াস তিনি অবহিত হতেন, আমার বক্তব্য তিনি মনোযোগ দিয়ে শুনতেন এবং তার ভালো লাগত।  আমার বইটি সময়ের দলিল হয়ে থাকবে বলে তিনি মন্তব্য করলেন এবং আমাকে বিশেষভাবে অভিনন্দন জানালেন। এরপর বঙ্গভবনে প্রতিবার বিভিন্ন জাতীয় দিবস উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানাদিতে গিয়ে তার সঙ্গে সালাম বিনিময় ও সাক্ষাৎকালে তিনি আমার ও আমার স্ত্রীর সঙ্গে কিছু কথা বলতেনই। এসব ছিল তার সহজাত মহানুভবতা এবং যা আমাদের মতো নগণ্য সুশীল সেবকদের আত্মবিশ্বাস ও মর্যাদার মহান অভিষেক।

রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান এবং তার স্ত্রী মরহুমা আইভি রহমান (৭ জুলাই ১৯৩৬-২৪ আগস্ট ২০০৪) শিক্ষাবিদ ও সুফি সাধক খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লা’র (১৮৭৩-১৯৬৫) অনুরক্ত ভক্ত ছিলেন। তারা উভয়ে নলতা শরিফ সফরও করেছিলেন। ঢাকা আহছানিয়া মিশন থেকে প্রকাশিত ‘খানবাহাদুর আহছানউল্লাহ স্মারক গ্রন্থে’ (২০০২) তাদের দুজনের দুটি লেখাও সংযোজিত হয়েছে। বাংলাদেশের মহামান্য রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটির প্রধান পৃষ্ঠপোষক। আমি যখন সোসাইটির ট্রেজারার তখন খানবাহাদুর আহ্ছানউল্লার শিক্ষা ও সমাজ চিন্তার ওপর একটি গবেষণাকর্মের দায়িত্ব পাই। তিনি এটা জেনে খুব খুশি হয়েছিলেন। নিষ্ঠার সঙ্গে এই মহান শিক্ষাবিদ ও সাধক ব্যক্তিত্বের বিভিন্ন দিক যাতে তুলে ধরতে পারি সেজন্য ইতিহাসের ছাত্র প্রয়াত রাষ্ট্রপতি মো. জিল্লুর রহমান আমাকে বিশেষ পরামর্শ দিয়েছিলেন। এশিয়াটিক সোসাইটি থেকে গবেষণাকর্মটি বই আকারে প্রকাশিত হয়েছে এটি তিনি জেনেছিলেন। বইটি তার করকমলে পৌঁছাতে যাব এমন সময় তিনি বিশেষ অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং ২০ মার্চ ২০১৩ তারিখে সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে ইন্তেকাল করেন।

ভাষা আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করার অপরাধে জিল্লুর রহমান সে সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কৃত হন এবং একই সঙ্গে তার মাস্টার্স ডিগ্রি কেড়ে নেওয়া হয়। কিন্তু প্রবল আন্দোলনের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পুনরায় তার মাস্টার ডিগ্রি ফিরিয়ে দেয়। ১৯৫৩ সালে তিনি বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজলুল হক হল ছাত্র সংসদের সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। এরপর ১৯৫৪ সাল। ঐতিহাসিক গণপরিষদ নির্বাচনে যুক্তফ্রন্টের পক্ষে জিল্লুর রহমান বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলা নির্বাচন পরিচালনা কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে অত্যন্ত সফলতার সঙ্গে কাজ করে বিজয় ছিনিয়ে আনেন। একই সময়ে তখন তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী স্বেচ্ছাসেবক লীগের প্রধান। ১৯৫৬ সালে তিনি কিশোরগঞ্জ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নির্বাচিত হন। ষাটের দশকে তিনি ঢাকা জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হয়েছিলেন। এই সময়েই তিনি আইভি রহমানের সঙ্গে পরিণয় সূত্রে আবদ্ধ হন। বাংলাদেশ মহিলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভানেত্রী এবং জাতীয় মহিলা সংস্থার সাবেক চেয়ারপারসন আইভি রহমান ২০০৪ সালের ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় নিহত হন। মৃত্যুর পূর্ব পর্যন্ত তিনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের মহিলা সম্পাদক হিসেবে দায়িত্বরত ছিলেন। ২১ আগস্ট গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানের মৃত্যুর ঘটনাটি বড় আঘাত হয়ে আসে জিল্লুর রহমানের জীবনে। তবু সেসব সামলে নিয়ে শেখ হাসিনার অনুপস্থিতিতে ১/১১ পরবর্তী সময়ে আবার হাল ধরেন আওয়ামী লীগের। ১৯৬২ সালের সামরিক শাসনবিরোধী শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬-এর ছয়দফা আন্দোলন, ৬৯-এর গণ-অভ্যুত্থানসহ প্রতিটি গণআন্দোলনে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পাশে থেকে তিনি অংশগ্রহণ করেন। ১৯৭০ সালে তিনি বিপুল ভোটে পাকিস্তান জাতীয় পরিষদের সদস্য (এমএনএ) নির্বাচিত হন।

মো. জিল্লুর রহমান ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। মুজিবনগর সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক ছিলেন তিনি। যুক্ত ছিলেন মুজিবনগর সরকার পরিচালিত স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের পরিচালনা এবং জয় বাংলা পত্রিকার প্রকাশনার সঙ্গে। সেই সময় পাকিস্তান সরকার তার সংসদ সদস্য পদ বাতিল করে তাকে ২০ বছর কারাদণ্ড প্রদান করেছিল এবং তার সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করেছিল।

স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশ গণপরিষদের সদস্য হিসেবে সংবিধান প্রণয়নে অংশ নেন। ১৯৭৩ ও ১৯৮৬ সালে তিনি জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৯৬ সালে ৭ম জাতীয় সংসদে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন এবং স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে ২০০১ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি দায়িত্ব পালন করেন মহান জাতীয় সংসদের উপনেতা হিসেবে। ২০০১ সালে ৮ম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি পুনরায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন।

২০০৯ সালে বাংলাদেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে জিল্লুর রহমান বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন এবং ১২ ফেব্রুয়ারি ২০০৯ শপথ গ্রহণের মাধ্যমে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সেদিনের সে মাহেন্দ্রক্ষণের কথা মনে পড়ছে। বঙ্গভবনে দেশের ১৯তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেওয়ার পর রাষ্ট্রপতির আসন গ্রহণ করার আগের মুহূর্তে মহামান্য রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ জিল্লুর রহমান অটল পাহাড়ের মতো বুকটান করে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তখন বিনম্র শ্রদ্ধায় এবং সুশীল আচরণে সরকারপ্রধান থেকে শুরু করে সবাই বাধ্য হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। এভাবে নবনিযুক্ত রাষ্ট্রপ্রধান সবার সম্মান ও সমীহ অর্জন করেন। অর্থাৎ অত্যন্ত অমায়িক ব্যবহারের ঋজু প্রকৃতির মানুষটি রাষ্ট্রপ্রধানের পদকে দীপ্ত ও দৃঢ়চিত্ত সম্মান প্রদর্শনের দ্বারা ঐকবদ্ধ প্রেরণায় প্রবুদ্ধকরণের পক্ষে ছিলেন।

লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান

mazid.muhammad@gmail.com