সামনে নতুন বাজেট আসছে। আগের এক লেখায় বাজেটে কৃষি খাতের জন্য বিশেষ বিবেচনার কথা বলেছিলাম। আজ প্রাণিসম্পদের বিষয়ে কিছু লেখার জন্য খোদ সুন্দরবন থেকে সন্দেশ মিলছে। সুন্দরবনের প্রাণিসম্পদম-লী যা বাবাহকু (বাঘ বানর হরিণ কুমির) নামে স্বশাসিত স্বতঃপ্রণোদিত সংগঠন। এর প্রেসিডিয়াম প্রধান গত পরশু সুন্দরবনের নীলডুমুর রেঞ্জে অবকাশ যাপনকালে সাম্প্রতিককালে লোকালয়ে প্রাণিসম্পদের কতিপয় কর্মকা- ও তাদের প্রতিক্রিয়া নিয়ে সবাইকে চিন্তাভাবনার আহ্বান জানিয়ে একটি বিবৃতি দিয়েছেন। বাবাহকুর জনসংযোগ বিভাগ বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে গরু ও হাতির আচরণ ও তা-ব তুলে ধরে প্রকাশিত কিছু নিউজ কাটিং সংগঠনের প্রেসিডিয়াম প্রধান বাঘ সম্প্রদায়ের বর্ষীয়ান নেতা সুন্দর মিয়ার কাছে উপস্থাপন করা হলে তিনি এই বিবৃতি দেন ।
‘গরু গ-গোলে’ গণভোটে সুইজারল্যান্ড
মধ্য সুইজারল্যান্ডের আরওয়ানগেন গ্রামের একটি অ্যাপার্টমেন্টে ভাড়া থাকে এক দম্পতি। পাশেই সবুজ চারণভূমি। সারা রাত ছাড়া থাকে গরু। আর থেমে থেমেই টুংটাং শব্দ। নিস্তব্ধ নিশুতির নীরবতা ভেঙে ছোট ছোট আওয়াজ একেবারে যেন কানে এসে লাগে! উড়ে যায় শান্তির ঘুম! আর এই নিয়েই বাধে ‘গোল’- যা গড়ায় ‘গ-গোলে’। এএফপি। গ্রামের আবাসিক এলাকার পাশে আল্পাইন পর্বতমালার চারণভূমিতে রাতভর গরুর গলায় লাগানো ধাতব ঘণ্টা থেকে আসা ‘বিরক্তিকর’ শব্দ নিয়ে রীতিমতো অভিযোগ করে বসেন ওই দম্পতি। মাঠটিতে প্রায় ১৫টি গরুর পাল রাতভর চরতে থাকে। গরুর ঘণ্টা যেন রাতে না বাজে সেজন্য কর্র্তৃপক্ষকে হস্তক্ষেপ করতে বলেছিল তারা। কিন্তু এই দম্পতির করা অভিযোগে চরম প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন আরওয়ানগেন গ্রামের বাসিন্দারা। ঘণ্টার ঐতিহ্যগত ব্যবহার রক্ষায় উঠেপড়ে লেগেছে তারা। গরুর ঘণ্টা নিয়ে শুরু হওয়া এই ‘গ-গোলে’ রীতিমতো গণভোটে যাচ্ছে সুইজারল্যান্ড। স্থানীয়ভাবে এই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে। এ ঘটনায় বাবাহকু প্রধান সুন্দর মিয়ার মন্তব্য ‘মনুষ্য সমাজের ঐতিহ্য চেতনায় প্রাণিসম্পদের ভূমিকা স্বীকৃতি পেয়েছে জেনে আনন্দিত হলাম’। তিনি যোগ করেন গণভোটের গৌরব আমাদেরও অনুপ্রেরণা জোগায়।
ঝাড়খ-ের সংসদে হাতির আক্রমণ এবং হাতির ‘অনুপ্রবেশ’ নিয়ে ‘হাতাহাতি’ কা-ও বাবাহকু প্রধানের দৃষ্টি এড়ায়নি। আন্তর্জাতিক সীমান্ত টপকে বেআইনিভাবে এক দেশের নাগরিক অন্য দেশে ঢুকে পড়লে অনেক সময় তাকে পুশব্যাক করে ফেরত পাঠিয়ে দেওয়া হয়। যদিও বন্যপ্রাণীরা সেই নিয়মের ঊর্ধ্বে। কিন্তু নজিরবিহীন ঘটনা ভারতের ঝাড়খ- এবং পশ্চিমবঙ্গের। সেখানে এক রাজ্য থেকে অন্য রাজ্যে অসুস্থ ও উন্মত্ত হাতিকে ইচ্ছাকৃত পুশব্যাক করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন পশ্চিমবঙ্গের বনমন্ত্রী জ্যোতিপ্রিয় মল্লিক। তার অভিযোগ, ‘ঝাড়খণ্ডের দিক থেকে মাঝেমধ্যেই অসুস্থ ও উন্মত্ত হাতিদের বাংলার দিকে জোর করে ঠেলে দেওয়া হচ্ছে। তারা বাংলায় ঢুকে তা-ব চালাচ্ছে। এতে জমির ফসল তো নষ্ট হচ্ছেই, প্রাণহানির ঘটনাও ঘটছে।’ ঝাড়খ- সরকারের তরফে আবার পাল্টা অভিযোগ ‘দুই রাজ্যের সীমানা বরাবর পরিখা কেটে হাতির স্বাভাবিক রুট ব্লক করে বা আটকে দিয়েছে পশ্চিমবঙ্গ। ফলে, তাদের স্বাভাবিক চলাচল ব্যাহত হচ্ছে। বাংলায় ঢুকতে না-পেরে হাতিরা ঝাড়খ-ে ফিরে গিয়ে তা-ব চালাচ্ছে। এমনকি তারা রাজ্য সংসদ ভবনে গিয়ে এর প্রতিবাদে তছনছ করছে সবকিছু’। এসব খবরে দুঃখ প্রকাশ করে বাবাহকু প্রধান সুন্দর মিয়া দুঃখ প্রকাশ করে সব পক্ষকে ধৈর্যধারণ ও দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানিয়েছেন।
আগুনে পুড়ল দুই ঘরসহ গোয়ালে থাকা ৪ গরু
কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার দক্ষিণ গ্রামের ফুল মিয়ার ছেলে জামশাদ হোসেন জানান, আগুন লেগে তার দুটি ঘরসহ গোয়ালে থাকা চারটি গরু পুড়ে যায়। বুড়িচং থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে রাতে গিয়ে তদন্ত করেছেন। মর্মান্তিক এ ঘটনায় শোক প্রকাশ করে সুন্দর মিয়া বলেন, আগুনে অস্বাভাবিক মৃত্যুর মিছিল বাড়ছে। তদন্ত করে কোনো বিহিত কেন কার্যকর হয় না জানতে চান বিক্ষুব্ধ এই প্রাণিনেতা।
সপ্তাহের ব্যবধানে ৪০ গরুর মৃত্যু
দিনাজপুরে সপ্তাহের ব্যবধানে একটি খামারের ৩৫টিসহ মোট ৪০টি গরু মারা যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও অসুস্থ রয়েছে কয়েকটি খামারের প্রায় অর্ধশতাধিক গরু। এতে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন স্থানীয় খামারিরা। জেলা প্রাণিসম্পদ দপ্তরের কর্মকর্তারা খুরা রোগ বললেও চিকিৎসায় মিলছে না কোনো প্রতিকার। মৃত্যুর কারণ নির্ণয় করতে রক্ত সংগ্রহ করে ঢাকায় পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় দুঃখ প্রকাশপূর্বক প্রাণিসম্পদের সুস্বাস্থ্য ও সুচিকিৎসার জন্য বাজেটে বাড়তি বরাদ্দ দাবি করে সুন্দর মিয়া আশা করেন কর্তাব্যক্তিরা নিশ্চয়ই দায়িত্বশীল হবেন।
বগুড়ায় গরুর র্যাম্প শো
বগুড়ায় ব্যতিক্রমী এই র্যাম্প শোতে দেখা গেছে, গানের তালে শতাধিক গরু হাজার হাজার দর্শনার্থীর সামনে হাঁটছে। হাঁটার সময় সঙ্গে থাকা গরুর মালিকরা তাদের গরুর জাত, বয়স ও দাম সবাইকে জানিয়ে দিচ্ছেন। শো শেষে মালিকরা তাদের গরু নিজ নিজ স্টলে নিয়ে যান। বাংলাদেশ ডেইরি ফারমার্স অ্যাসোসিয়েশন আয়োজিত এই মেলায় ২১৬টি স্টলে বিভিন্ন জাতের গরু, মহিষ, ছাগল, দুম্বাসহ অন্যান্য শখের পশু নিয়ে প্রদর্শনী করেন খামারিরা। সুন্দর মিয়া এই র্যাম্প শোতে অংশগ্রহণকারীদের অভিনন্দন জানান।
ট্রেনে কাটা পড়ে মরল ৫ গরু
চুয়াডাঙ্গা জেলার জীবননগর উপজেলার উথলী রেলস্টেশনের কাছে ট্রেনে কাটা পড়ে ৫টি গরুর মৃত্যু হয়েছে। খুলনা থেকে ছেড়ে আসা চিলাহাটিগামী রূপসা এক্সপ্রেস ট্রেনে কাটা পড়ে ঘটনাস্থলেই ৫টি গরুর মৃত্যু হয়। এর মধ্যে ৪টি গাভী ও ১টি ষাঁড় রয়েছে। যার আনুমানিক বাজারমূল্য ৬ লাখ টাকা। এক মুহূর্তেই নিঃস্ব হয়ে গেলেন গরুগুলোর মালিক মসলেম আলী। শেষ সম্বলটুকু হারিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তিনি। এই মর্মান্তিক ঘটনায় সুন্দর মিয়া দাবি করেন, গরুগুলোর মালিক মসলেম আলীকে ৫টি গরু প্রতিস্থাপনের দায়িত্ব রেলওয়ে বিভাগের।
রেললাইনে দাঁড়িয়ে থাকায় গরু আটক
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সিতে রেললাইনের ওপর থেকে একটি গরুকে আটক করেছে পুলিশ। তবে কয়েক ঘণ্টা পর অবশ্য ষাঁড় গরুটিকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। গরুটি নেওয়ার্ক পেন স্টেশনের অদূরে রেললাইন ধরে দৌড়াচ্ছিল। এতে নিউ জার্সি থেকে নিউ ইয়র্কগামী ট্রেনগুলো ছাড়তে সর্বোচ্চ ৪৫ মিনিট পর্যন্ত দেরি হয়। এবিসি নিউজ জানিয়েছে, স্থানীয় সময় বৃহস্পতিবার সকাল সাড়ে ১০টায় প্রথম রেললাইনে দেখা যায় গরুটিকে। বিষয়টি জানতে পেরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে গরুটিকে আটকের চেষ্টা করে। কিন্তু বেয়াড়া প্রাণীটি পুলিশ সদস্যদের গলদঘর্ম করে ছেড়েছে। ধরার চেষ্টা করতেই দৌড়ে পালাতে থাকে বড়সড় শিংঅলা গরুটি। নেওয়ার্ক পেন স্টেশনের লাইন ধরে এদিক-ওদিক দৌড়ানোর পর এক পর্যায়ে সে স্থানীয় বিমানবন্দরের দিকে রওনা দেয়। পুলিশ পিছু নিয়ে ভিক্টোরিয়া স্ট্রিটের কাছে একটি ভবনের পেছনে গিয়ে ষাঁড়টিকে কোণঠাসা করে। পরে তাকে ধরে একটি বেড়া দিয়ে ঘেরা জায়গায় রাখা হয়। গরুটি কোথা থেকে এসেছে, সে ব্যাপারে প্রাথমিকভাবে কিছু জানা যায়নি।
যুক্তরাষ্ট্রের মতো উন্নত দেশে ট্রেন স্টেশন বা শহরাঞ্চলে ঘুরে বেড়ানো গরু দেখা যাওয়া কার্যত অসম্ভব ঘটনা। শেষ পর্যন্ত প্রাণী আশ্রয়কেন্দ্র পরিচালনাকারী স্থানীয় একটি প্রতিষ্ঠান দায়িত্ব নিয়েছে গরুটির। যুক্তরাষ্ট্রে গরুর কারণে যান চলাচলে বিপত্তির ঘটনা অবশ্য এবারই প্রথম নয়। ২০২১ সালে নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডে গরুর কারণে মহাসড়ক বন্ধ রাখতে হয়েছিল। তার আরও কয়েক বছর আগে ব্রুকলিনেও এ ধরনের ঘটনা ঘটেছিল। বিষয়টি বন্ধুরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ বিষয় বলে সুন্দর মিয়া মন্তব্য করেননি। তবে তিনি দুনিয়ার সব গরু এবং প্রাণিসম্পদের জন্য কাউন্সিলিংয়ের পরামর্শ দেন। তিনি বাবাহকুর পরামর্শ ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের প্রধান মহিষুণ গরিয়ানকে নির্দেশনা দেবেন।
বিবৃতিতে সুন্দর মিয়া প্রশ্ন তোলেন তিপ্পান্ন বছর বয়সী বাংলাদেশে প্রাণিসম্পদ-এর নামনিশানা নিয়ে ‘বোধগম্যতা’ কিংবা ‘দৃষ্টিসীমা’ কেন প্রসারিত হয়নি বা হচ্ছে না তা প্রাণিসম্পদের পক্ষ থেকে কেন বলতে হচ্ছে? আগে ‘পশু’ সম্পদ পরে ‘প্রাণী’ সম্পদভুক্ত (মিউটেশনে একধাপ উন্নতি?) হতে পেরেছে তারা। এক সময় অধম অনাচারী মানুষের কীর্তিকলাপকে ‘পশুর চাইতে অধম’ বলার চল থাকাতে দুপক্ষেরই মানসম্মান নিয়ে টানাটানি পড়ার কারণে কিনা বলা যায় না, তবে শেষ পর্যন্ত এদেশের পশু প্রাণীতে পরিণত হয়েছে। কিন্তু বিগত বাজেটগুলোতে এই উত্তরণের কোনো সুফল দেখা না গেলেও মন্ত্রণালয় ও দপ্তরের লোকবল, বেতন, পদ-পদবি, দক্ষতা-সক্ষমতা বৃদ্ধির এন্তেজাম আছে প্রচুর। গেলবার ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসে সুন্দরবন কিংবা অদূর নিঝুম দ্বীপে প্রাণিসম্পদের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে কোনো তত্ত্ব-তালাশ হয়েছে কিনা, জানা যায় না। হায় মিডিয়া! মধ্যবিত্তের সংসারের টানাটানির কথা চিবিয়ে চিবিয়ে বলার সঙ্গে সঙ্গে যদি জলোচ্ছ্বাসে ভেসে আসা মরা হরিণের প্রসঙ্গ টেনে দুটো লাইন যদি তারা লিখত, তাহলেও হয়তো বাজেট প্রণেতাদের চোখ খুলত। মৎস্য ও পশুসম্পদ বিভাগের কাজ একত্রে থাকায় এবং মৎস্য চাষাবাদ ও ব্যবসায়ের সঙ্গে নগদ স্বার্থবাদিতার সম্পর্ক বেশি থাকায় মাছেদের দেখভাল প্রক্রিয়া পশুসম্পদের বাজেটের হিস্যায় ভাগ বসাচ্ছে। আগামী বাজেটে প্রাণিসম্পদের কথা আলাদা করে মনে রাখতে হবে।
লেখক: সাবেক সচিব ও এনবিআর-এর সাবেক চেয়ারম্যান
mazid.muhammad@gmail.com