বিভিন্ন কর্মসূচির মধ্য দিয়ে ১০ মার্চ জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস ২০২৪ পালিত হয়েছে। ১৯৯৭ সাল থেকে জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস পালিত হয়ে আসছে। আল্লাহতায়ালা আমাদের প্রকৃতি দান করেছেন। আমাদের বসবাসের উপযোগী করে এই সুন্দর বসুন্ধরা সাজিয়েছেন অপরূপ মায়াবী কারুকার্যে। যাবতীয় প্রয়োজনীয় বস্তু সামগ্রী দিয়েই মানুষকে পাঠিয়েছেন পৃথিবীর বুকে। এই প্রকৃতি মহান আল্লাহ কর্র্তৃক সৃষ্ট ও পরিচালিত। তবে মাঝেমধ্যে প্রকৃতি বিরূপ রূপ ধারণ করে। আমাদের ওপর আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড়, কালবৈশাখী ঝড়, শিলাবৃষ্টি, অনাবৃষ্টি, জলোচ্ছ্বাস ভারী বর্ষণ, বন্যা, খরা, দাবানল, শৈত্যপ্রবাহ, দুর্ভিক্ষ, মহামারী, ভূমিকম্প, সুনামিসহ ইত্যাকার প্রাকৃতিক দুর্যোগসমূহ। এসব বিপদ থেকে বাঁচার জন্য মহান আল্লাহর কাছে আমাদের দ্বারস্থ হতে হবে।
দুর্যোগে রাসুলের অবস্থা যেমন হতো : কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় দেখা দিলে রাসুলুল্লাহ (সা.) বিচলিত হয়ে পড়তেন। আল্লাহর শাস্তির ভয় করতেন। বেশি বেশি তওবা-ইস্তেগফার করতেন এবং অন্যদেরও তা করার নির্দেশ দিতেন। ঝড়-তুফান শুরু হলে তিনি মসজিদে চলে যেতেন। নফল নামাজে দাঁড়িয়ে আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা জানাতেন। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর এ আমল দ্বারা প্রাকৃতিক দুর্যোগের মুহূর্তে আমাদের করণীয় কী তা জানতে পারি। হাদিসে এসেছে, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেন, ‘মুমিনের বিষয়টি সত্যিই আশ্চর্যের! তার প্রতিটি কাজই কল্যাণকর। যদি তারা সুখে থাকে তবে শুকরিয়া আদায় করে। যার ফলে তা তার জন্য কল্যাণকর হয়। আর সে বিপদে পড়লে ধৈর্য ধরে, তাও তার জন্য মঙ্গলজনক হয়।’ (মুসলিম)
প্রাকৃতিক দুর্যোগে ধৈর্য ধারণ করা : আল্লাহতায়ালা মানুষকে বিভিন্ন বিপদাপদ দিয়ে পরীক্ষা ও সতর্ক করে থাকেন। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘আর আমি অবশ্যই তোমাদের পরীক্ষা করব কিছু ভয়, ক্ষুধা, জান, মাল ও ফলফলাদির ক্ষতির মাধ্যমে। আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা নিজেদের বিপদের সময় বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা আল্লাহরই দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হেদায়াতপ্রাপ্ত।’ সুরা বাকারা ১৫৫-১৫৭
দুর্যোগের সময় পালনীয় সুন্নত আমল : প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় কিছু সুন্নত আমল করার মাধ্যমে ক্ষয়ক্ষতি থেকে বাঁচার চেষ্টা করতে হবে। হাদিস শরিফে এসেছে, যখন কোথাও ভূমিকম্প সংঘটিত হয় অথবা সূর্যগ্রহণ হয়, ঝড়ো বাতাস বা বন্যা হয়, তখন সবার উচিত মহান আল্লাহর কাছে তওবা করা, তার কাছে নিরাপত্তার জন্য দোয়া করা, মহান আল্লাহকে স্মরণ করা এবং ক্ষমা প্রার্থনা করা। এ ক্ষেত্রে রাসুলুল্লাহ (সা.) নির্দেশ দিয়ে বলেছেন, ‘দ্রুততার সঙ্গে মহান আল্লাহর জিকির করো, তার নিকট তওবা করো।’ সহিহ বুখারি ২/৩০
আল্লাহর জিকিরের সর্বোত্তম উপায় হচ্ছে নামাজ পড়া, কোরআন তিলাওয়াত ও দোয়া-দুরুদ পাঠ করা। দুর্যোগের সময় জিকিরের আরও উপায় হতে পারে ইস্তিগফার ও তসবিহ পাঠ করা। হাদিসে বর্ণিত হয়েছে, প্রচ- ঝড়ো হাওয়া শুরু হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে যেতেন এবং নামাজে মশগুল হতেন। (মিশকাত শরিফ ৬৯৬) সাহাবিদের জীবনে আমরা দেখি, বিপদ-আপদে তারা নামাজে দাঁড়াতেন এবং ধৈর্য ধারণ করতেন। ঝড়-তুফানের প্রাদুর্ভাব ঘটলে আল্লাহু আকবার বলে তাকবির ও আজান দেওয়া সুন্নত।
বৃষ্টি-বাদলের সময় যে দোয়া পড়া সুন্নত : আম্মাজান হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বর্ণনা করেন, বৃষ্টি হলে রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দোয়া পড়তেন, ‘আল্লাহুম্মা ছায়্যিবান নাফিআ।’ অর্থাৎ হে আল্লাহ! এই বৃষ্টি যেন আমাদের জন্য উপকারী ও কল্যাণকর হয় । (সহিহ বুখারি)
হজরত যায়েদ ইবনে ছাবেত (রা.) বর্ণনা করেন, বৃষ্টির পর রাসুলুল্লাহ (সা.) বলতেন, ‘আল্লাহতায়ালার দয়া ও অনুগ্রহে আমরা বৃষ্টিস্নাত হয়েছি।’ সহিহ বুখারি
অতিবৃষ্টির সময় দোয়া পড়া : হজরত আনাস ইবনে মালেক (রা.) বর্ণনা করেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) অধিক বৃষ্টি ও ভারী বর্ষণের সময় এই দোয়া পড়তেন, ‘হে আল্লাহ! এই ঝড়, তুফান ও ভারী বর্ষণ আমাদের আশপাশ থেকে সরিয়ে নিন, দয়া করে আমাদের ওপর ঝড়, তুফান ও ভারী বর্ষণ দেবেন না। হে আল্লাহ, এই ভারী বর্ষণ দিন টিলা-পর্বতে, উঁচু ভূমিতে, উপত্যকায়, বনভূমি ও চারণ ভূমিতে।’ সহিহ বুখারি
ঝড়-তুফানের সময় দোয়া পড়া : হজরত আয়েশা সিদ্দিকা (রা.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) ঝড়-তুফানের সময় এর ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে এই দোয়া পড়তেন, হে আল্লাহ! আমি আপনার নিকট প্রার্থনা করি এই ঝড়ের কল্যাণ, এর মধ্যস্থিত কল্যাণ, এর সঙ্গে প্রেরিত কল্যাণ। আমি আপনার নিকট পানাহ চাই এই ঝড়ের অনিষ্ট থেকে, এর মধ্যস্থিত অনিষ্ট থেকে, এর সঙ্গে প্রেরিত অনিষ্ট থেকে। সহিহ বুখারি
বজ্রপাত থেকে বাঁচার দোয়া : প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয়াবহ করুণ এক রূপ হলো বজ্রপাত, যা মহান রাব্বুল আলামিনের শক্তিমত্তা ও ক্রোধের বহিঃপ্রকাশ। এ সম্পর্কে কোরআন মজিদে বর্ণিত হয়েছে, ‘বজ্রধ্বনি তার মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা করে, ফেরেশতাগণও তাকে ভয় করে (প্রশংসা ও পবিত্রতা বর্ণনা করে)। তিনি বজ্রপাত ঘটান এবং যাকে ইচ্ছা তা দ্বারা আঘাত করেন। আর তারা আল্লাহ সম্পর্কে বিতণ্ডা করে, অথচ তিনি মহা শক্তিশালী।’ সুরা রাদ, আয়াত ১৩
হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) বর্ণনা করেন, বজ্রপাত ও বিজলি চমকানোর সময় এর ক্ষয়ক্ষতি থেকে রক্ষা পেতে রাসুলুল্লাহ (সা.) এই দোয়া পড়তেন, ‘হে আল্লাহ! গজব দিয়ে আমাদের নিঃশেষ করবেন না, আজাব দিয়ে আমাদের ধ্বংস করবেন না, এর পূর্বেই আমাদের ক্ষমা করে দিন। সুনানে তিরমিজি
প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে বাঁচার উপায় : প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণ হলো আল্লাহতায়ালার অসন্তুষ্টি। আল্লাহতায়ালা মানুষকে আশরাফুল মখলুকাত হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। তিনি অযথা কাউকে শাস্তি দিতে চান না। আল্লাহর আজাব থেকে বাঁচার জন্য আমল পরিশুদ্ধ করতে হবে। যে আমলে আল্লাহ খুশি হন, সে আমল বেশি বেশি করতে হবে। নামাজ, কোরআন তিলাওয়াত, দান-সদকা ইত্যাদি ভালো কাজ করতে হবে। হাদিস শরিফে বর্ণিত হয়েছে, ‘সদকা আল্লাহর অসন্তুষ্টিকে নিভিয়ে দেয় এবং অপমৃত্যু রোধ করে।’ সুনানে তিরমিজি
মুমিন বান্দার উচিত, সবসময় আল্লাহর পথে অগ্রসর হওয়া, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা, তার নির্দেশিত বিধিবিধান পালন করা। বিশেষ করে তার নিষেধাজ্ঞাগুলো অক্ষরে অক্ষরে পালন করার চেষ্টা করা। তবেই আল্লাহতায়ালা পার্থিব জীবনের কঠিন বিপদাপদ ও দুর্যোগ থেকে মুক্তি দেবেন এবং মৃত্যুর পরে উত্তম প্রতিদান দেবেন।
লেখক : কলামিস্ট ও সংগঠক