যুদ্ধকালীন নির্বাচন ও পুতিনের ভোটযুদ্ধ

কারাগারে আলেক্সি নাভালনির রহস্যমৃত্যু নিয়ে সমালোচনার ঝড় এবং ইউক্রেন যুদ্ধে নিহত সেনাদের তালিকা দীর্ঘ হওয়ায় দেশের ভেতরে দানা বাঁধতে থাকা ক্ষোভের মধ্যেই হয়ে গেল রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। রাশিয়া যেসব অঞ্চল নিজেদের দখলে নিয়েছে, সেগুলোতেও ভোট হচ্ছে। যদিও ইউক্রেন এই নির্বাচন অবৈধ আখ্যা দিয়ে এর কড়া সমালোচনা করেছে।

২০১৮ সালে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের সময় পুতিন বলেছিলেন, ২০২৪ সালের পর আর রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে থাকবেন না। কিন্তু পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে সেই সিদ্ধান্ত বদলান তিনি। টানা দুবারের বেশি প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়ানোর জন্য ২০২১ সালেই আইন পরিবর্তন করেছিলেন পুতিন। গত বছর ডিসেম্বরে বড় ধরনের এক সামরিক পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানে পুতিন রুশ জনগণের উদ্দেশে বলেছিলেন, তিনি পঞ্চমবারের মতো প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে দাঁড়াবেন। পুতিন সেই ২০০০ সাল থেকেই রাশিয়ার ক্ষমতায়। প্রথমে পূর্বসূরি বরিস ইয়েলেৎসিনের স্থলাভিষিক্ত হন ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে। পরে ওই বছরের মার্চে তিনি প্রথমবার নির্বাচনে জয়লাভ করেন। ২০০৮ থেকে ২০১২, এই সময়টায় তিনি প্রধানমন্ত্রীর চেয়ার বসলেও ক্ষমতা পুরোপুরি নিজের কাছে রাখেন। সে সময়টায় রাশিয়ার সংবিধান অনুযায়ী একজন প্রেসিডেন্ট টানা দুবারের বেশি ক্ষমতায় থাকতে পারতেন না। ২০২০ সালে সংবিধানের সেই নিয়মেও পরিবর্তন আসে। এখন বহুল প্রচলিত বিশ্বাস হলো প্রেসিডেন্ট পুতিন ২০৩৬ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকবেন। আর সে পর্যন্ত থাকলে তিনি হবেন রাশিয়ার সবচেয়ে দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শাসক। পেছনে ফেলবেন কমিউনিস্ট নেতা জোসেফ স্ট্যালিন ও অষ্টাদশ শতকের সম্রাজ্ঞী ক্যাথরিন দ্য গ্রেটকে, যারা দুজনেই ৩০ বছরের বেশি ক্ষমতায় ছিলেন।

রাশিয়ায় ১৫ থেকে ১৭ মার্চ পর্যন্ত তিন দিনব্যাপী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। পুতিন যে জিতবেন এবং পঞ্চমবারের মতো দায়িত্ব নেবেন এটা প্রায় সবাই-ই জানতেন। তাহলে কেন ক্রেমলিন এত আয়োজন করে প্রেসিডেন্ট নির্বাচন করছে? আর এই নির্বাচন থেকে প্রেসিডেন্ট পুতিনের সত্যিকারের জনপ্রিয়তার ধারণা পাওয়ার সম্ভাবনাইবা কতটুকু? এসব প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে। রাশিয়ার নির্বাচনে কখনোই তেমন কোনো প্রতিদ্বন্দ্বিতা থাকে না। কিন্তু এর ফলাফল জরুরি, যারা ক্ষমতায় যায় তাদের বৈধতার জন্য এবং জনগণের ইচ্ছার গুরুত্ব দেখানোরও একটা জরুরত থাকে। পাশাপাশি এবারের নির্বাচনে পুতিনের জন্য শুধু জয়টাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। যুদ্ধ পরিস্থিতিতে ভোটারের উপস্থিতি ও পুতিনের প্রতি রুশদের সমর্থন দেখানোর প্রয়োজনীয়তা ছিল। রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তাদের জন্য এই নির্বাচন ছিল তাদের সামর্থ্যরে একটা পরীক্ষা। যাতে তারা সমস্ত প্রশাসনিক উপায় ব্যবহার করে তাদের প্রেসিডেন্টকে একটা নিরঙ্কুশ বিজয় এনে দিতে পারে। ভোট-পূর্ব এক গবেষণায় দেখা যায়, কাক্সিক্ষত ফল পেতে হলে, প্রশাসনকে রাষ্ট্রের সমস্ত কর্মীকে সচল করে তুলতে হবে, যারা স্থানীয় এবং কেন্দ্রীয় কর্র্তৃপক্ষের সঙ্গে কাজ করছে এবং রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত করপোরেশনেও যুক্ত, তাদের উৎসাহ সহকারে নির্বাচনে অংশ নিতে হবে এবং বর্তমান প্রেসিডেন্টকে সমর্থন দিতে হবে।

নির্বাচনী প্রচারণার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে অংশ নিতে দেখা গেছে পুতিনকে। শুরুর দিকে তিনি বিভিন্ন অঞ্চলে গিয়ে শিক্ষার্থী এবং শ্রমিকদের সঙ্গে দেখা করেন। ইউক্রেন অভিযানকে মস্কো বলছে বিশেষ সামরিক অপারেশন। সে বিষয়ে কোনো ধরনের কথা বলা এড়িয়ে গেছেন ভøাদিমির পুতিন। কিন্তু এই যুদ্ধ এখন রাশিয়ার প্রতিদিনের জীবনের অংশ হয়ে উঠেছে। আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা, সীমিত বিদেশ ভ্রমণ, বিদেশি পণ্য আমদানি কমে আসা এবং ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকা থেকে এক রকম বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া। এই যুদ্ধ হাজারো রাশিয়ান সৈন্যর প্রাণ কেড়ে নিয়েছে। আরও লাখো রাশিয়ান, যাদের বেশিরভাগ তরুণ, শিক্ষিত ও উচ্চবিত্ত পরিবারের তারা গত ২৪ মাসে দেশ ছেড়েছে, কারণ তারা হয় এই যুদ্ধের পক্ষে নয় অথবা যুদ্ধে যেতে রাজি হয়নি। তাই নির্বাচনী প্রচারণায় যুদ্ধ ব্যাপারটা অনুপস্থিত থাকলেও মিডিয়ার কাছে এটি একটি প্রধান অনুষঙ্গ এবং সাধারণ রাশিয়ানদের এটি এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই। উচ্চ ভোটার উপস্থিতির হার ও প্রেসিডেন্টের প্রতি নিরঙ্কুশ সমর্থন যুদ্ধসহ তার আসন্ন সবগুলো সিদ্ধান্তকেই আসলে বৈধতা দেবে।

পুতিন ছাড়াও নির্বাচনে আরও তিনজন নিবন্ধিত প্রার্থী ছিলেন। তারা হলেন লিওনিদ সøাটস্কি, তিনি একজন জাতীয়তাবাদী কনজারভেটিভ; কমিউনিস্ট পার্টির প্রার্থী নিকোলাই খারিতোনভ এবং ব্যবসায়ী ভøাদিসøাভ দাভানকোভ, যিনি সদ্য প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল ‘নিউ পিপল’ থেকে নির্বাচনে এসেছেন, দুমা রাজ্য থেকে রাশিয়ার সংসদের নিম্নকক্ষে দলটির অল্পকিছু প্রতিনিধি আছে। এই তিনজনই ইউক্রেন যুদ্ধে রাশিয়াকে এবং প্রেসিডেন্ট পুতিনকে সমর্থন দিয়ে আসছেন এবং তাদের কেউই আসলে পুতিনের জন্য সত্যিকারের হুমকি নয়। যারা তার সত্যিকারের প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল তারা হয় কারাগারে, নয়তো তাদের সরিয়ে ফেলা হয়েছে কিংবা তারা দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। পুতিনের সবচেয়ে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যালেক্সেই নাভালনি এই ফেব্রুয়ারিতে কারাগারের কড়া নিরাপত্তার মধ্যে মারা যান।

বিবিসির স্টিভ রোজেনবার্গ নিকোলাই খারিতোনভকে জিজ্ঞেস করেন তিনি কি মনে করেন সুযোগ পেলে তিনি ভøাদিমির পুতিনের চেয়ে আরও ভালো প্রেসিডেন্ট হবেন? এর উত্তরে এই প্রেসিডেন্ট প্রার্থী বলেন, এটা তিনি বলতে পারেন না, বরং ভোটাররাই এ ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেবে। একই সঙ্গে খারিতোনভ ভবিষ্যতে বামপন্থি রাজনীতির ডাক দিচ্ছেন। তিনি ২০২২ সাল থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞায় আছেন। লিওনিদ সøাটস্কি, লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি অব রাশিয়ার (এলডিপিআর) একজন এমপি, তার বিরুদ্ধে বেশ কিছু যৌন হয়রানির অভিযোগ আছে। তিনি দখল করা ক্রিমিয়ায় রাষ্ট্রীয় সফরে গিয়েছিলেন এবং ২০১৪ সাল থেকে আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার আওতায় আছেন। ভøাদিসøাভ দাভানকোভ, একটি নতুন রাজনৈতিক দলের নতুন মুখ, গণমাধ্যমে তার উপস্থিতি সবচেয়ে কম। একটি কসমেটিকস কোম্পানির সহ-প্রতিষ্ঠাতা দাভানকোভ ২০২৩ সালে মস্কোর মেয়র নির্বাচনে মাত্র ৫ শতাংশ ভোট পান। ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধে তিনি শান্তি ও আলোচনার পক্ষে থাকলেও, ইউক্রেনের অঞ্চল দখলের পক্ষে ভোট দেন, ফলে তিনি আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার কবলে পড়েছেন। যুদ্ধবিরোধী অবস্থান নিয়ে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হতে চাওয়া বরিস নাদেজদিনকে নিবন্ধনই করতে দেয়নি কর্র্তৃপক্ষ, যদিও তার পক্ষে স্বাক্ষর দিয়ে সমর্থন জানাতে হাজার হাজার রাশিয়ান লাইন ধরেছিলেন।

রাশিয়ার ইতিহাসে প্রথমবারের মতো প্রেসিডেনশিয়াল নির্বাচন ১৫ থেকে ১৭ মার্চ, অর্থাৎ তিন দিন ধরে চলল। এর প্রথম পরীক্ষামূলক নির্বাচন হয়েছিল ২০২০ সালে। তখন কভিড মহামারী চলাকালে জনস্বাস্থ্যের কথা চিন্তা করে সংবিধান সংশোধন করা হয়। যদিও এখন মহামারীর কারণে কোনো স্বাস্থ্যঝুঁকি নেই, তবুও একই পদ্ধতি অবলম্বন করেই এবারের নির্বাচনে ভোটগ্রহণ হয়েছে। স্বতন্ত্র পর্যবেক্ষকরা তিন দিনব্যাপী নির্বাচনের সমালোচনা করছেন। তাদের মতে, এভাবে ভোট নেওয়ার ফলে নির্বাচনের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়টি আরও জটিল হয়ে উঠবে।

একই সঙ্গে, প্রথমবারের মতো ঘরে বসেই ভোট দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষ করে সেই জায়গাগুলোতে যেখানে নির্বাচন ঘিরে প্রতিবাদ চলমান, আবার ভোটার উপস্থিতি নিশ্চিত করার বিষয়টি নিয়েও রয়েছে শঙ্কা। ইউক্রেনের দখল করা জায়গাগুলোকেও এই নির্বাচনে অন্তর্ভুক্ত করেছে রাশিয়া আর এ নিয়ে আছে সমালোচনা। এমনকি ওইসব স্থানের স্থানীয় বাসিন্দাদের ওপর চাপ প্রয়োগেরও অভিযোগ আসছে।

১৯৯৩ সাল থেকে অর্গানাইজেশন ফর দ্য সিকিউরিটি অ্যান্ড কো-অপারেশন ইন ইউরোপের (ওএসসিই) পার্লামেন্টারি অ্যাসেম্বলি (পিএ) রাশিয়ায় তাদের পর্যবেক্ষক পাঠালেও তিন বছর ধরে তা বন্ধ আছে। রাশিয়ায় কোনো স্বতন্ত্র জরিপ নেই। রাষ্ট্রীয় মিডিয়া থেকেই খবর পান বেশিরভাগ রাশিয়ান। আর এই গণমাধ্যমগুলোর বিরুদ্ধে পুতিন ও তার নীতির প্রতি ব্যাপকভাবে পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবুও বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস যে সরকারের দেখানো কর্মকাণ্ড নিয়ে রাশিয়ানরা যথেষ্ট সন্দিহান। কিন্তু এ নিয়ে তারা কথা বলতে ভয় পায়। এমনকি বিরোধীদের সামান্য সমর্থনেও কঠোর শাস্তির ঝুঁকি থাকায় তারা প্রকাশ্যে নিজেদের ভিন্নমত প্রকাশ করে না। আলেক্সি নাভালনির বিধবা স্ত্রী, ইউলিয়া, তার স্বদেশিদের এই ভোট বয়কট করার পাশাপাশি বিদেশি সরকারগুলোকে এই নির্বাচনের ফলাফলকে স্বীকৃতি না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তার এসব আহ্বানে কতটা সাড়া মিলবে তা বলা কঠিন। প্রথম আহ্বানের সাড়া মিললেও তা প্রমাণ করাও সহজ হবে না। কারণ, স্বাধীন গণমাধ্যম মেদুজা পুতিন-প্রশাসনের ঘনিষ্ঠ এক সূত্রকে উদ্ধৃত করে বলেছিল যে, নির্বাচনে কম ভোটার উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।

এটা প্রায় জানাই যে এই নির্বাচনের সম্ভাব্য ফলাফল হলো ভøাদিমির পুতিনের জন্য অন্তত কাগজে-কলমে একটি বিশ্বাসযোগ্য বিজয়। যা-ই হোক, ১৯৯৯ সাল থেকে রাশিয়ায় ক্ষমতায় আছেন পুতিন। কখনো প্রেসিডেন্ট হিসেবে, কখনোবা প্রধানমন্ত্রী পদে। দেশটিতে সর্বশেষ ২০১৮ সালে নির্বাচন হয়েছিল। ওই নির্বাচনে জিতে পুতিন নিজের অবস্থান পোক্ত করেন। এবারের নির্বাচনেও ৬ বছরের জন্য জিতে ২০৩০ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকতে চলেছেন তিনি। নির্বাচনে পুতিনের জয় কার্যত নিশ্চিত হওয়ায় তিনি এখন সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দুই নেতার রেকর্ড ভাঙার সময়ের অপেক্ষায়। এবার রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পদে বসে নতুন রেকর্ড গড়বেন পুতিন।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক

raihan567@yahoo.com