গড়াই নদীর কোল ঘেঁষা সুপ্রাচীন জনপদ কুমারখালীর ঐতিহ্য তাঁতশিল্প। এক সময় বাণিজ্যের উদ্দেশে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে নদীপথে কুষ্টিয়ার কুমারখালীতে আসত ব্যবসায়ীরা। তাঁতশিল্পের উৎপাদিত পণ্য পাইকারি কিনে নিয়ে তারা ব্যবসায়ীরা দেশের বড় বড় হাট বাজারে বেচাকেনা করত। এর সুবাদে এই পণ্যের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দেশ জুড়ে।
কুমারখালী তাঁত পণ্য দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশে রপ্তানি হওয়ায় পণ্যের কদর রয়েছে বিশ্ব জুড়ে। কিন্তু কদর থাকলেও বর্তমানে কুমারখালীর তাঁতশিল্পের সেই জৌলুস আর নাই। দফায় দফায় বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধি, রঙ-সুতার দাম বৃদ্ধি এবং দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতিতে শ্রমিকের মজুরি বেড়ে যাওয়ায় কুমারখালীর বহু তাঁত কারখানা বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। ইতিমধ্যেই স্বল্প পুঁজির ব্যবসায়ীদের শত শত তাঁত কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। অনেকেই বাধ্য হয়ে পরিবর্তন করেছেন তাদের পুরনো পেশা।
স্থানীয় ও তাঁতশিল্পের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুমারখালীর উৎপাদিত তাঁত পণ্যের যথেষ্ট চাহিদা থাকায় এসব এলাকার অধিকাংশ মানুষ দীর্ঘদিন ধরে লুঙ্গি, গামছা, তোয়ালে উৎপাদনের সঙ্গে জড়িত। এখানকার উৎপাদিত উন্নত মানের চাদর, লুঙ্গি, গামছা যায় দেশের বিভিন্ন জেলায়। কুমারখালীতে এসব তাঁতপণ্য ক্রয় বিক্রয় হয় সারা বছর। সাপ্তাহের শনি ও মঙ্গলবার বড় হাট বসে। বিভিন্ন জেলা থেকে ব্যবসায়ীরা আসেন লুঙ্গি, গামছা কেনাবেচা করতে। সাপ্তাহিক কাপড়ের হাটে দিনে গড়ে ৫ থেকে ৭ কোটি টাকার কাপড় বেচাকেনা হয়। ঈদ মৌসুমে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান জাকাতের কাপড় এ বাজার থেকে কিনতে এলে সে সময় বিক্রি আরও বেড়ে যায়। দেশ-বিদেশে অনেক কদর থাকলেও বর্তমানে লোকসানের মুখে চাহিদা অনুযায়ী জোগান দিতে পারছেন না ব্যবসায়ীরা। অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বেকার হয়ে পড়েছেন কয়েক হাজার শ্রমিক। তাঁত বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে কুমারখালীতে প্রায় ৮ হাজার পাওয়ার লুম (যন্ত্রচালিত তাঁত) ও ৩ হাজার ৫০০টি পিটলুম (হস্তচালিত তাঁত) রয়েছে। এসব তাঁতের সঙ্গে জড়িত আছে প্রায় ৮৫ হাজার মানুষ।
আন্তর্জাতিক পুরস্কারপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান বুলবুল টেক্সটাইলের স্বত্বাধিকারী ইকবাল কবির দিলু বলেন, ‘পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই যখন তখন তাঁত শিল্পের কাঁচামালের দাম বৃদ্ধি পাওয়ায় পাল্টে গেছে ব্যবসায়ীক পরিস্থিতি। তাঁতশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে বিদ্যুৎ, রঙ, সুতাসহ উৎপাদন সামগ্রীর দাম তাঁতিদের নাগালের মধ্যে রাখতে হবে।’
ক্ষুদ্র শিল্প কারখানা বলাকা টেক্সটাইল মিলের মালিক আতিয়ার রহমান বলেন, ‘লোকসান দিয়ে আর তাঁত কারখানা চালু রাখা অসম্ভব হয়ে পড়েছে।’
তাঁতি তোফাজ্জল হোসেন বলেন ‘দফায় দফায় রঙ সুতার দাম বৃদ্ধিতে লোকসান গুনতে গুনতে বাধ্য হয়ে ছাড়তে হয়েছে আদি পেশা।’
বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের মহাব্যবস্থাপক মেহেদী হাসান বলেন, ‘তাঁত বোর্ড কুমারখালী শাখার আধুনিক ও উন্নত মানের নতুন নতুন মেশিনপত্র খুব শিগগিরই চালু হবে। এতে ব্যবসায়ীদের নানা ধরনের সুযোগ-সুবিধা হবে, কম খরচে বেশি উৎপাদন হবে। ব্যবসার পরিধিও বাড়বে। আশা করি তাঁতশিল্পের সুদিন ফিরে আসবে।’