ময়দান থেকে নিউজরুম

মুক্তিযুদ্ধ শুরুর আগে, অর্থাৎ পাকিস্তানি আমলে, দেশীয় গণমাধ্যম সার্বিক অর্থেই ছিল সংবাদপত্র, অর্থাৎ ছাপাখানা কেন্দ্রিক। ২৫ মার্চ গণহত্যা শুরুর পর  সদ্য-স্বাধীনতা ঘোষিত বাংলাদেশের সব সংবাদপত্র বন্ধ হয়ে যায়। নির্বিচার হত্যাযজ্ঞের মুখে সাধারণ মানুষ ঢাকা নগরীসহ দেশের শহর-বন্দর থেকে পালিয়ে যেতে থাকে। এরই মধ্যে, বিচ্ছিন্নভাবে হলেও, দেশের নানা স্থানে বাঙালিদের প্রতিরোধযুদ্ধ শুরু হয়। অবস্থা স্বাভাবিক প্রমাণ করতে সামরিক সরকার ২৯ মার্চ ১৯৭১ থেকে ‘প্রেস ট্রাস্ট অব

পাকিস্তান’-এর নিয়ন্ত্রণাধীন  ইংরেজি দৈনিক ‘মর্নিং নিউজ’ ও ‘দৈনিক পাকিস্তান’ পত্রিকা দুটি পুনঃপ্রকাশ করে। প্রায় একই সময় সরকারি নির্দেশে প্রকাশ করা হয় ‘পাকিস্তান অবজারভার‘, ‘পূর্বদেশ’, ‘দৈনিক আজাদ’ ও ‘দৈনিক পয়গাম’-সহ আরও কিছু পত্রিকা। এ সময় প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান সামরিক বিধি জারি করে  গণমাধ্যমের ওপর কঠোর ‘সেন্সরসিপ’ আরোপ করেন। মোটকথা, বাংলাদেশ বা সাবেক পূর্ব পাকিস্তানের কোনো সংবাদপত্রের পক্ষে পাকিস্তান সৈন্যদের বর্বরতা বা তাদের হাতে পরিচালিত হত্যা-নিপীড়নের খবর ছাপা সম্ভব হয়নি। 

সত্যের এই  নির্বাসন চলে ডিসেম্বর ১৬, ১৯৭১ পর্যন্ত। অথচ এই পত্রপত্রিকাগুলোই ২৫ মার্চ ১৯৭১ পর্যন্ত পেশাগত দক্ষতা ও অসীম সাহসে ৬ দফা দাবিসহ জাতির স্বাধিকার আন্দোলনকে সর্বাত্মক সমর্থন জুগিয়েছে। ‘ইত্তেফাক’, ‘দি পিপল’, ‘সংবাদ’, ‘পূর্বদেশ’,‘ দৈনিক পাকিস্তান’, ‘গণবাংলা’, ‘আজাদ’ এবং ‘পাকিস্তান অবজারভার’ ঊনসত্তরের গণআন্দোলন এবং ১৯৭০-এর সাধারণ নির্বাচনে ঐতিহাসিক ভূমিকা রেখেছে। ঊনিশ শ ষাটের দশকের সাহসী সেই সাংবাদিকতা, তখনকার সাংবাদিকদের দেশপ্রেম, সাহস ও পেশাদারিত্ব বাঙালির জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে বহুলাংশে বেগবান করেছে।

২৫ মার্চ রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর সামরিক অভিযান ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা দেশীয় সংবাদপত্র ছাপতে পারেনি। কারণ ২৬ মার্চ থেকে বেশ কয়েকদিন দেশের সব পত্রিকা বন্ধ থাকে। কিন্তু বিশ্বের বহু গণমাধ্যমে এই ঘটনা কমবেশি প্রকাশ পায়। বিবিসি, ভয়েস অফ আমেরিকা, মার্কিন বার্তা সংস্থা এপি অনেকটা বিস্তারিতভাবে পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাপ্রবাহ প্রচার করে পরদিন। নিউ ইয়র্ক টাইমস, ব্যাংকক পোস্ট, লন্ডনের গার্ডিয়ান, ডেইলি টেলিগ্রাফ, ইভিনিং টাইমস, আইরিশ টাইমস, বুয়েনস আয়ার্স হেরাল্ড, এবং ভারতের স্টেটসম্যান, যুগান্তর, টাইমস অব ইন্ডিয়া, অমৃতবাজার পত্রিকা, আনন্দবাজার, দি হিন্দুসহ প্রায় ৩০টির মতো গণমাধ্যম বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা ও পাকিস্তানি সৈন্যদের আগ্রাসনের খবর প্রচার করে।

মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস বাংলাদেশ ছিল অবরুদ্ধ ও রক্তাক্ত জনপদ। প্রধান বাংলা দৈনিক ‘ইত্তেফাক’ ও ‘সংবাদ’ পত্রিকার অফিসগুলোকে সেনাবাহিনী আগুন দিয়ে জ্বালিয়ে দেয়। দৈনিক ‘গণবাংলা’ ও ‘দি পিপল’-এর অফিস ২৫ মার্চ রাতেই ভস্মীভূত করা হয়। ‘দৈনিক সংবাদ’ অফিসের আগুনে মারা যান  প্রগতিশীল লেখক ও সাংবাদিক শহীদ সাবের। বন্ধ হয়ে যায়   ‘স্বরাজ’, ‘আওয়াজ’ এবং ‘বাংলার বাণী। অবশ্য জামায়াতে ইসলামীর মুখপত্র ‘দৈনিক সংগ্রাম’ এবং মুসলিম লীগের মুখপত্র ‘পয়গাম’-এর মতো এক’দুটি ব্যতিক্রম ছিল, যারা পাকিস্তানের পক্ষ নিয়ে নারকীয় সামরিক বর্বরতাকে সমর্থন জুগিয়েছে। 

মুক্তিযুদ্ধের সাংবাদিকতার একটি বিশেষ উল্লেখযোগ্য দিক রণাঙ্গনের সংবাদপত্র। বিভিন্ন মুক্তাঞ্চল ও সীমান্তবর্তী ভারতীয় এলাকা থেকে অসংখ্য  পত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে। আমার বিশ্বাস, প্রতিষ্ঠিত সংবাদপত্রগুলো সরকারি বাধানিষেধ এবং নিরাপত্তাজনিত কারণে যে-কাজটি করতে পারেনি, সে কাজটি সম্পন্ন করেছে সীমান্ত অঞ্চল থেকে প্রকাশিত  অনিয়মিত এই প্রকাশনাগুলো। এ কাজটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের নিষ্ঠাবান সহযোগীর কাজ, যা স্বাধীনতাকামীদের মনোবল অনেক গুণ বাড়িয়েছে এবং বিশ্ববাসীর সামনে বাঙালিকে আরেকবার আধুনিক জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

একটি যুদ্ধে সমরাস্ত্র যেমন প্রয়োজন তেমনি প্রয়োজন মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ চালাবার জন্য প্রচারযন্ত্র। সে-কারণে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী মুজিবনগর সরকারের নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত সম্প্রচার শুরু করে ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’, যার পত্তন ঘটে চট্টগ্রামে কয়েকজন সাহসী বেতারকর্মীর উদ্যোগে। পরবর্তী সময়ে আগরতলা এবং কলকাতা থেকে মুক্তিযুদ্ধের শেষ দিন পর্যন্ত এই বেতার কেন্দ্রের কার্যক্রম চলতে থাকে। বলা বাহুল্য, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র মুক্তিযুদ্ধে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। 

মুজিবনগর সরকারের উদ্যোগে নিয়মিত প্রকাশিত হয় ‘জয় বাংলা’ সাপ্তাহিক, যা ছিল যুদ্ধ পরিচালনাকারী দল আওয়ামী লীগের মুখপত্র। প্রকাশনাটি ব্যাপক জনপ্রিয়তা লাভ করে এবং মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের অন্যতম প্রধান দেশীয়  সংবাদপত্রে পরিণত হয়। আমার সৌভাগ্য হয়েছিল, মুক্তিযুদ্ধের একজন গেরিলা যোদ্ধা হয়েও স্বাধীন বাংলা বেতার ও জয়বাংলা পত্রিকার সঙ্গে রণাঙ্গন পর্যায় থেকে যুক্ত থাকার। নিজের আগ্রহ থেকে সংগ্রহ, পরবর্তী সময়ের অনুসন্ধান ও দলিলপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাসে বাংলাদেশ-ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চল থেকে প্রায় ৭০টি পত্রপত্রিকা প্রকাশিত হয়েছে। যুদ্ধাবস্থায় এসব প্রকাশনা সাধারণ ও সহজ কাজ ছিল না। অর্থ ও কাগজের অপ্রতুলতা, প্রয়োজনীয় জনবল, ছাপাখানা ও আনুষঙ্গিক সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং যুদ্ধ পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে প্রকাশনাগুলোকে টিকিয়ে রাখা রীতিমতো কঠিন কাজ ছিল। সে কারণে এগুলোর বেশির ভাগই নিয়মিত হতে পারেনি। তবে ইতিহাসের তথ্য ঘেঁটে দেখা যায়, কোনো জাতির মুক্তিযুদ্ধে, কিংবা কোনো যুদ্ধে, এত বিপূল সংখ্যক পত্রপত্রিকা কোনোকালে, কোনো ভূখ-েই প্রকাশিত হয়নি। এসব প্রতিটি প্রকাশনার পেছনে ছিল পাকিস্তানি বর্বরতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধকারী মানুষদের আবেগ ও দেশপ্রেম। এরা কেবল সময়ের আবেগি চাহিদা মিটিয়েছে বললে ভুল বলা হবে, যুদ্ধরত বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়সমূহের দিকেও নজর রেখেছে।      

পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে ঢাকা নগরীতে ২৫-২৬ মার্চের ‘অপারেশন সার্চলাইট’ চালাবার সময় কয়েক ডজন বিদেশি সাংবাদিক ঢাকায় উপস্থিত ছিলেন। ভয়ংকর হত্যাযজ্ঞের খবর ও ছবি যেন ধামাচাপা দেওয়া যায়, সে লক্ষ্যে সামরিক কর্তৃপক্ষ সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করে। সেনাবাহিনীর সদস্যরা ২৫ মার্চ রাতে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে গিয়ে সব বিদেশি সাংবাদিককে পাকড়াও করে, জোর করে দেশ থেকে তাদের বের করে দেয়। এরপরও কয়েকজন লুকিয়ে থেকে গণহত্যার খবর ও ছবি সংগ্রহ করেন। এরপর জীবন বিপন্ন করে তারা দেশের বাইরে চলে যান এবং বাঙালির প্রতিরোধ যুদ্ধসহ নিরস্ত্র মানুষের ওপর সামরিক অভিযানের খবর প্রকাশ করেন। 

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সরকার, অর্থাৎ সেদিনকার প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন ও তার ঘনিষ্ঠ সহযোগী হেনরি কিসিঞ্জারের প্রশাসন পাকিস্তানের পক্ষ ধারণ করে। কিন্তু দেশটির বেশ কয়েকটি প্রধান গণমাধ্যম পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। ব্রিটেন, ফ্রান্স, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়ন, হাঙ্গেরি, যুগোস্ল্যাভিয়া, জাপান, জার্মানি, কানাডা, সুইডেন, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রধান গণমাধ্যম গণহত্যার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। সোভিয়েত সংবাদ সংস্থা ‘তাস’ বাংলাদেশের ঘটনাবলি নিয়ে ব্যাপক ও নিয়মিতভাবে রিপোর্ট করে। 

পশ্চিমা বিশ্বের খ্যাতিমান যে-কাগজগুলো পাকিস্তানি বর্বরতাকে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনসমর্থন গড়ে তুলে, তাদের অন্যতম ‘নিউইয়র্ক  টাইমস’, ‘গার্ডিয়ান’, ‘সানডে টাইমস’, ‘নিউ স্টেটসম্যান’, ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’, ‘ইকোনমিস্ট’, ‘ইভিনিং স্টার’, বোস্টন গ্লোব’, ‘ওয়াশিংটন পোস্ট’, ‘লস এঞ্জেলস্ টাইম্স’, ‘ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল, ‘টাইম ম্যাগাজিন’ ও ‘নিউজউইক’। হংকং-এর ‘ফার ইস্টার্ন ইকোনমিক রিভিউ’ পত্রিকাটিও বিশেষ ভূমিকা রাখে। লন্ডনের ‘বিবিসি- বাংলা সার্ভিস’ অসামান্য  ভূমিকা রাখে। কার্যত ১৯৭১ সালের ভূমিকার কারণেই বাংলাদেশের শ্রোতাদের  কাছে বিবিসি একটি বহুল পরিচিত গণমাধ্যমে পরিণত হয়।

এ ছাড়াও নেপালের ‘রাইজিং স্টার’,‘সিঙ্গাপুরের ‘নিউ নেশান’, যুগোস্ল্যাভিয়ার  ‘দি কমিউনিস্ট’, অস্ট্রেলিয়ার ‘সিডনি মর্নিং হেরাল্ড’-এর ভূমিকা প্রণিধানযোগ্য। ‘লাইফ’ ম্যাগাজিন বাংলাদেশের গণহত্যার ওপর বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছাপে। কমিউনিস্ট চীন ও আরব দুনিয়ার গণমাধ্যমগুলো  স্বাভাবিক কারণেই বাংলাদেশের বিরোধী। 

পশ্চিমা সাংবাদিকদের মধ্যে যারা বাংলাদেশের ঘটনাপ্রবাহসহ মুক্তিযুদ্ধের দৈনন্দিন কর্মকা- সরাসরি রিপোর্ট করেছেন তাদের অন্যতম সিডনি শ্যনবার্গ, ডেন কগিন,  সাইমন ড্রিং, কলিন স্মিথ, পিটার হেজেলহার্স্ট, টনি ক্লিফটন, মাইকেল লোরাঁ, মার্ক টালি, আরনল্ড জেটলিন, সিরিল জন, মিশেল রবার্ট, লুই হেরেন, নিকলাস টমালিন, ডিটার আর কান ও পিটার আর হেনরিস প্রমুখ।

মার্কিন সাংবাদিক আর্নল্ড জেটলিন বার্তা সংস্থা এপি-র প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকায় পাকিস্তান বাহিনীর সামরিক অভিযানের অন্যতম প্রত্যক্ষদর্শী। ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের ডেন কগিনকে ২৫ মার্চ রাতে সামরিক কর্তৃপক্ষ জোর করে দেশ থেকে বের করে দেয়। এরপর তিনি ভারত হয়ে পুনরায় বাংলাদেশে প্রবেশ করে নবগঠিত মুক্তিবাহিনীর তৎপরতার ওপর বিস্তারিত প্রতিবেদন লেখেন। তার লেখা ‘টাইম’ ম্যাগাজিনের ১৯ এপ্রিল ১৯৭১-এর ‘দ্য ব্যাটেল অব কুষ্টিয়া’ প্রতিবেদনটি ছিল সাড়া জাগানো।

লন্ডনের ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এর তরুণ প্রতিবেদক সাইমন ড্রিং ৬ মার্চ, ১৯৭১ পূর্ব পাকিস্তানের ঘটনাবলি রিপোর্ট করতে ঢাকায় আসেন। ২৫ মার্চের গণহত্যা শুরু সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকা থেকে বিদেশি সাংবাদিককে জোর করে বের করে দিলেও তিনি ঢাকার ইন্টার কন্টিনেন্টাল হোটেলের ছাদে এপি’র ফটোগ্রাফার মাইকেল লঁরার সঙ্গে কোনোভাবে লুকিয়ে থাকেন। এরপর সম্ভাব্য বিপদ উপেক্ষা করে তারা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য এলাকায়, যেখানে সৈন্যরা গণহত্যা চালিয়েছে, সেখানে যান এবং ছবি ও তথ্য সংগ্রহ করেন। এরপর সুযোগ বুঝে ঢাকা ছাড়েন। সাইমন ড্রিং পরবর্তী সময়ে তার পত্রিকার জন্য একটি বিস্তারিত রিপোর্ট লেখেন, যা ‘ডেইলি টেলিগ্রাফ’-এ প্রকাশিত হয় ৩০ মার্চ ১৯৭১। তার ‘God and a united Pakistan’ রিপোর্টটি ছিল ঢাকার ২৫ মার্চের গণহত্যার ওপর প্রথম কোনো পশ্চিমা সাংবাদিকদের ব্যাপকভিত্তিক প্রতিবেদন। 

এ ছাড়াও এন্থনি মাসকারেনহাসের সাহসী ভূমিকার কথা সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করতে হবে। এই সাংবাদিক করাচির ‘মর্নিং নিউজ’ পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। পাকিস্তানের সামরিক সরকার ৮ জন পাকিস্তানি সাংবাদিককে সরকারের পক্ষে লেখার জন্য ১০ দিনের এক সফরে ঢাকায় নিয়ে আসে এপ্রিল মাসে। কিন্তু সরেজমিনে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের পর মাসকারেনহাস বিবেকের দংশনে ভুগতে থাকেন। এরপর সুযোগ বুঝে তিনি পালিয়ে লন্ডন চলে যান। সেখানে তিনি ‘সানডে টাইমস’ পত্রিকার সম্পাদক হেরাল্ড ইভান্সের সঙ্গে দেখা করেন এবং নিজের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দেন। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের গণহত্যার ওপর এবহড়পরফব শিরোনামে  ‘সানডে টাইম্স’-এ ১৩ জুন ১৯৭১ তার বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়, যা  বিশেষভাবে বিশ্ববিবেক নাড়িয়ে দেয়।

নারকীয় পাকিস্তানি হত্যাযজ্ঞ ও মুক্তিযুদ্ধের খবর প্রচারের ক্ষেত্রে অনন্যসাধারণ  ভূমিকা রাখে ভারতের সংবাদপত্র, রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রিত ‘আকাশবাণী’ রেডিও এবং ভারতীয় বার্তা সংস্থা পিটিআই এবং ইউএনআই। ভারতের প্রতিটি অঞ্চলের প্রতিটি সংবাদপত্র কার্যত স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশের সংবাদপত্রে পরিণত হয়। প্রথাগত সাংবাদিকতার বাইরে গিয়ে তারা পাকিস্তানি গণহত্যার বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তোলেন এবং বাংলাদেশের জাতীয় যুদ্ধকে নিজেদের নৈতিক যুদ্ধ হিসেবে   প্রতিষ্ঠিত করেন। 

কলকাতার প্রধান বাংলা দৈনিক ‘যুগান্তর’, ‘আনন্দবাজার পত্রিকা’, ‘দৈনিক বসুমতি’, ‘দৈনিক সত্যযুগ’, ‘দৈনিক কালান্তর’, ‘গণবার্তা’,  ‘দেশ’ সাময়িকী’,    ইংরেজি ‘দি স্টেটসম্যান’, ‘অমৃতবাজার পত্রিকা’সহ পান্নালাল দাশগুপ্ত সম্পাদিত ‘কম্পাস’; নতুন দিল্লির ইংরেজি পত্রিকা ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’, ‘ন্যাশনাল হেরাল্ড’; মাদ্রাজ বা চেন্নাই-এর প্রধান দৈনিক ‘দি হিন্দু’, আসামের ‘আসাম ট্রিবিউন’, মেঘালয়ের ‘শিলং টাইমস’; বোম্বে বা মুম্বাইয়ের ‘ব্লিৎস’, ‘ইলাস্ট্রেটেড উইকলি’; ত্রিপুরার প্রধান ‘দৈনিক সংবাদ’-এর ভূমিকা বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মুক্তিযুদ্ধের ৯ মাস ধরে এসব জাতীয় ও আঞ্চলিক ভারতীয় পত্রিকাগুলো মুক্তিবাহিনী ও  প্রবাসী মুজিবনগর সরকারকে সর্বাত্মক সমর্থন জুগিয়ে গেছে। তারা অকুণ্ঠচিত্তে  বাংলাদেশের গণমানুষের পক্ষে দাঁড়িয়েছে। ভারতের সংবাদ সংস্থা ‘প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া’ বা ‘পিটিআই’ এবং ‘ইউনাইটেড নিউজ অব ইন্ডিয়া’ বা ‘ইউএনআই’ ব্যাপকভাবে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক সংবাদ সরবরাহ করেছে। ‘আকাশবাণী’ কলকাতা কেন্দ্রের প্রাত্যহিক বাংলা সংবাদ ও ‘সংবাদ পরিক্রমা’ মুক্তিবাহিনী ও বাংলাদেশের মানুষের মনোবল বাড়িয়েছে বহুগুণ।  

১৯৭১ সালে ক্ষুদ্র ভারতীয় রাজ্য ত্রিপুরা হয়ে ওঠে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের  অন্যতম প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। বিশ্ব গণমাধ্যমের কাছে আগরতলা হয়ে ওঠে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান ‘ডেটলাইন’। যে-ত্রিপুরার মোট জনসংখ্যা ছিল প্রায় ১৫ লাখ, সেই ত্রিপুরাকে ঠাঁই দিতে হয় সেদিন প্রায় ১৫ লাখ  বাংলাদেশের শরণার্থী।

সেদিনের ত্রিপুরায় মূল পত্রিকা ছিল ‘দৈনিক সংবাদ’, সম্পাদক ভূপেন দত্ত ভৌমিক। সব অর্থেই এ কাগজটি ত্রিপুরায় মুক্তিযুদ্ধের প্রধান দৈনিকে পরিণত  হয়। আগরতলা থেকে ‘সাপ্তাহিক সমাচার’ নামে আরও একটি পত্রিকা  প্রকাশিত হয়, যার সম্পাদক ছিলেন কলকাতার যুগান্তর প্রতিনিধি অনিল ভট্টাচার্য। ট্যাবলয়েড সাইজের এই কাগজটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের জোরালো  সমর্থক। তখনকার প্রধান বিরোধী দল সিপিআই (এম-এল)-এর মুখপত্র ‘দেশের কথা’ উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে। এ ছাড়াও  ‘জাগরণ’ ও ‘দৈনিক গণরাজ’ পত্রিকা দুটির ভূমিকার প্রশংসাযোগ্য। 

এখানে কলকাতা-কেন্দ্রিক দুজন ভারতীয় সাংবাদিকের নাম উল্লেখ করা  প্রয়োজন, যারা অবরুদ্ধ বাংলাদেশে এসে আর ফিরে যাননি। এই দুই তরুণ  ভারতীয় সাংবাদিকের একজন সুরজিৎ ঘোষাল, অন্যজন দীপক ব্যানার্জি। এরা নিজেদের পরিচয় গোপন করে গণহত্যার খবর সংগ্রহ করতে যুদ্ধরত বাংলাদেশে প্রবেশ করেন। বিভিন্ন গ্রামগঞ্জে ঘুরে পাকিস্তান বাহিনীর  অত্যাচারের ছবি ও খবর সংগ্রহ করেন। এক সময় তারা কুমিল্লাতে পাকিস্তান  সেনাবাহিনীর হাতে ধরা পড়েন এবং নৃশংসভাবে নিহত হন।

লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, সাংবাদিক ও লেখক।