২৫ মার্চ ১৯৭১। কাজ শেষে রাত সাড়ে ১১টার দিকে অফিস থেকে বাসায় ফিরছেন দৈনিক আজাদের তরুণ ফটোসাংবাদিক মোহাম্মদ আলম। ঢাকেশ্বরী সড়কে তখন আজাদ অফিস। বাসায় যেতে যেতে পথে শুনতে পান গুলির শব্দ। বিকট শব্দটা আসছে পলাশীর মোড় থেকে। ট্রেসার বুলেট থেকে বেরুচ্ছে আগুন। মোহাম্মদ আলম আসেন পলাশী মোড়ে ফায়ার সার্ভিস কার্যালয়ের সামনে। দেখেন ফায়ার সার্ভিস কার্যালয়ের সামনে অসংখ্য লাশ। অন্ধকারে ফ্ল্যাশ জ্বালিয়ে কয়েকটা ছবি তোলেন। তাকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়ে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী। তিনি মাটিয়ে শুয়ে পড়েন। গুলি শরীরে লাগল না। ভাগ্যের জোরে অন্ধকারে মিশে গেলেন। গভীর রাতে অফিসে ঢুকে ফিল্ম ডেভেলপ ও ছবি প্রিন্ট করে জমা দেন। বাসায় ফিরতে ফিরতে বেশ রাত।
শুনলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হলের মাঠে অনেক ছাত্রের লাশ পড়ে আছে। যে ছেলেটি তাকে পথ দেখিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন, হলের দেয়ালের ওপর মাথা তুলতেই গুলিতে ছেলেটির মগজ বের হয়ে গেল। এ যাত্রায়ও বেঁচে গেলেন মোহাম্মদ আলম।
এরপর পুরান ঢাকার চাঁনখারপুল আর শাঁখারীবাজারের ঘরে ঘরে আগুন, সোনার গহনা, টাকার বান্ডিল পড়ে আছে রাস্তায়; গলিতে-ড্রেনের পাশে বিক্ষিপ্ত লাশ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিববাড়ি কোয়ার্টারে মশারির নিচে ঝাঁজরা হয়ে যাওয়া মা ও শিশুর ছবিসহ অসংখ্য বর্বরতার চিত্র কান্নাভেজা চোখে তোলেন মোহাম্মদ আলম। এরপর এপ্রিলের শুরুর দিকে পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর ব্রিগেডিয়ার রফিক তাকে বেইলি রোড অফিসে ডাকেন। ব্রিগেডিয়ার রফিক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পতাকা উত্তোলনের ছবি দেখিয়ে জানতে চান ‘এ ছবি তোমার?’ তিনি অস্বীকার করেন। পাল্টা প্রশ্ন- ‘তুমি পিন্ডিতে গিয়ে কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে শেখ মুজিবের সামনে বলতে পারবে?’ মোহাম্মদ আলম চালাকির আশ্রয় নিয়ে বললেন, পারব। ব্রিগেডিয়ার রফিক তাকে পরদিন নেগেটিভ নিয়ে আসতে বলে ছেড়ে দিলেন। পরদিন আইডি কার্ড, ক্যামেরা, লেন্স ও নেগেটিভ নিয়ে রামচন্দ্রপুর আর কসবা হয়ে আগরতলায় পাড়ি জমান। সেখান থেকে কলকাতায়। এরপর মুজিবনগর সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত আলোকচিত্রী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের ছবি তুলেছেন বাকিটা সময়।
মোহাম্মদ আলম শুধু ছবিই তোলেননি, বন্দুক চালিয়েছেন; স্বাধীন বাংলা বেতারে তবলা বাজিয়েছেন। ‘পূর্ব দিগন্তে সূর্য উঠেছে’- গানের তবলচি তিনি। রণাঙ্গন থেকে সংগ্রহ করা তার রিপোর্ট থেকে এম আর আখতার মুকুল রচনা করেন চক্ষুমিয়ার কমেডি রিপোর্ট ‘চরমপত্র’। জয়বাংলা পত্রিকা ছাপা হয়েছে, হকারদের কাছে পৌঁছে দিতে হবে; জিপ টান দিয়ে সেই কাজও করেছেন মোহাম্মদ আলম। ৯ মাস যুদ্ধের পর তিনি দেশে ফিরেছিলেন বীরের বেশে। তিনি ছিলেন কলকাতায় প্রবাসী সরকারের নিয়োগপ্রাপ্ত একমাত্র ওয়্যার ফটোগ্রাফার।
এছাড়া, পঁচিশে মার্চের কালরাতে নারকীয় গণহত্যার বেশ কিছু ছবি তুলেছিলেন বরেণ্য আলোকচিত্রশিল্পী আনোয়ার হোসেন। তিনি তখন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থাপত্যবিদ্যার ছাত্র। শ্বাসরুদ্ধকর সেই রাতে মৃত্যুভয় উপেক্ষা করে তিনি তার ওয়ান টুয়েন্টি রোলিকর্ড ক্যামেরায় তুলেছিলেন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের নিহত কয়েকজন বাঙালি জোয়ানের ছবি। রাজারবাগ পুলিশ লাইনসে ঢুকেও ছবি তুলেছিলেন তিনি। শাহবাগের মোড়ে গাড়ির ভেতর স্টিয়ারিং ধরা গুলি খাওয়া চালক, গুলিতে ক্ষতবিক্ষত তার মুখ বাইরে থেকে কাচের ভেতর দিয়ে দৃশ্যটি দেখেছিলেন তিনি। কুকুর টেনে নিয়ে যাচ্ছে লাশ সেই কুকুরের ‘পশুত্বের’ সঙ্গে পাকিস্তানি বর্বরতা যেন একাকার হয়ে ধরা পড়ে তার লেন্সে। ছবিতে তিনি এভাবেই ধরে রেখেছেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের সেই ভয়াবহতম চিত্র। ১৬ ডিসেস্বর যে উল্লাসের দৃশ্য দেখেছে বাংলাদেশ, যা আমাদের বিজয়ের আইকনিক চিত্রে পরিণত হয়েছে সেই ছবিটিও তারই তোলা।
একাত্তরে মহান মুক্তিযুদ্ধের যে অসংখ্য ছবি তুলেছিলেন মোহাম্মদ আলম আর আনোয়ার হোসেন তার কিছু আমাদের দেখা কিছু অদেখা। এই দুজন ক্যামেরাযোদ্ধা এখন আর আমাদের মধ্যে নেই। ফলে এই ৫৩ বছর পর তাদের তোলা অদেখা ছবিগুলো এখন কোথায় কীভাবে আছে কে জানে!
এই দুজন ছাড়া যে গুটিকয়েক বাঙালি আলোকচিত্রী সে সময় ক্যামেরায় ধারণ করেছিলেন যুদ্ধদিনের আলোকচিত্রসম্ভার তাদের মধ্যে বিশেষভাবে উজ্জ্বল নাইব উদ্দিন আহমেদ, মনোয়ার আহমদ, সুজিত কুমার রায়, মনজুর আলম বেগ, শফিকুল ইসলাম স্বপন, আবদুল হামিদ রায়হান, এস এম সফি, নীতিশ রায় ও হারুন হাবীবের নাম। নাইব উদ্দিন আহমেদ তখন ছিলেন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের আলোকচিত্রী। নাইব উদ্দিন আহমেদকে বলা হয় বাংলার সৌন্দর্য ও প্রকৃতির পুরোধা আলোকচিত্রী। মুক্তিযুদ্ধ তার জীবন ও ছবি তোলার বাঁক বদলে দেয়। বঙ্গবন্ধু ৭ মার্চে ভাষণে বলেছিলেন, ‘যার যা কিছু আছে তাই নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ো।’ বঙ্গবন্ধুর ডাকেই তিনি ক্যামেরা নিয়ে নেমে পড়েছিলেন যুদ্ধে। ছবি তোলার কারণে তাকে পালিয়ে থাকতে হতো। মানুষ যে কত নৃশংস হতে পারে, কত পশুত্ব মানুষের মধ্যে বিরাজমান এসব তিনি খুব কাছ থেকে দেখেছেন ক্যামেরার লেন্সে। মানুষের দুঃখ-কষ্ট, সব হারানোর হাহাকার, নিঃস্ব হয়ে যাওয়ার বেদনা মূর্ত হয়ে উঠেছে তার ক্যামেরায়। একজন শিল্পীর মনের বেদনা নিয়ে তিনি ছবিগুলো নির্মাণ করেছিলেন। একাত্তরের ভয়াবহতা তাকে এতখানি উদ্বেলিত করেছিল যে, এরপর জীবনের বাকি সময়ে তিনি আর ছবি তুলতে পারেননি। বলতে গর্ব হয় এমন প্রাণোদ্দীপ্ত আর মানবিক আলোকচিত্রশিল্পী আমাদের দেশে জন্মেছিলেন।
মুক্তিযুদ্ধের আগে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আলোকচিত্রী ছিলেন সুজিত কুমার রায়। মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে ১৫ নভেম্বর মুজিবনগর সরকারের অধীন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আলোকচিত্রী হিসেবে নিয়োগ পান তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানিরা তার ব্যক্তিগত স্টুডিও ‘যুথিকা ফটোগ্রাফার্স’ পুড়িয়ে দিয়েছিল। সাপ্তাহিক চিত্রালীর প্রধান ফটোসাংবাদিক চাকরি ফেলে চলে গিয়েছিলেন যুদ্ধে। মুক্তিযুদ্ধের ট্রেনিং নিয়ে ফিরে এসেছিলেন মানিকগঞ্জে। যোগ দিয়েছিলেন মানিকগঞ্জের মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ক্যাপ্টেন আবদুল হালিমের সঙ্গে। তিনি মানিকগঞ্জ হরিরামপুরের পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও রাজাকারদের আত্মসমর্পণের ছবি তোলেন। তার ছবিতে দেখতে পাই মুক্তিযোদ্ধাদের বিজয় উল্লাস।
মুক্তিযুদ্ধের সময় হারুন হাবীব ঠিক আলোকচিত্রী ছিলেন না। তিনি তখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগে পড়তেন। সময়ের প্রয়োজনেই তাকে আলোকচিত্রী হতে হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের সময় ১১ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার কর্নেল আবু তাহেরের কাছ থেকে পেয়েছিলেন একটি ইয়াসিকা ক্যামেরা। যুদ্ধের ফাঁকে ফাঁকে সেই ক্যামেরা দিয়ে তুলেছেন রণাঙ্গনের দুঃসহ শরণার্থী জীবন, মুক্তিবাহিনী আর ভারতীয় মিত্রবাহিনীর ছবি। সহযোদ্ধাদের দেশপ্রেম, সাহস আর প্রত্যয় ধরে রাখার এক অলঙ্ঘনীয় ভালোবাসায় পেয়ে বসেছিল তাকে। সীমান্ত অঞ্চল থেকে অনেক দূরে, মেঘালয়ের তুরা শহরের ছোট্ট একটা স্টুডিওতে বসে ফটো পেপারে ফুটিয়ে তুলতেন মুক্তিযুদ্ধের ছবি। আলোকচিত্রী শফিকুল ইসলাম স্বপন ছিলেন ২ নম্বর সেক্টরের মুক্তিযোদ্ধা। রণাঙ্গনে ক্যামেরাটা তার সঙ্গেই ছিল। ফলে তার ক্যামেরায় ধরা পড়ে মুক্তিযুদ্ধের নানা চিত্র। আলোকচিত্রাচার্য মনজুর আলম বেগ মুক্তিযোদ্ধাদের কিছু ছবি তোলেন বলে জানা যায়। একাত্তরে হত্যাযজ্ঞের তালিকায় নাকি তার নাম ছিল। আগেই খবর পেয়ে সরকারি কোয়ার্টার থেকে পালিয়ে যাওয়ার কারণে তিনি প্রাণরক্ষা পান।
একাত্তরের ১৫ সেপ্টেম্বর মুজিবনগর সরকার অনুমোদিত বাংলাদেশ ভলান্টিয়ার সার্ভিস কোরে [বিভিএসসি] যোগ দিয়েছিলেন কুষ্টিয়ার আলোকচিত্রী আবদুল হামিদ রায়হান। এই সংগঠনের আলোকচিত্রী হিসেবে মুক্তিযুদ্ধের প্রশিক্ষণ ক্যাম্প, মুক্তিযোদ্ধাদের ঘাঁটি, হাসপাতাল, সীমান্ত এলাকা ও মুক্তাঞ্চলসহ বিভিন্ন শরণার্থী শিবির ঘুরে ঘুরে ক্যামেরায় বন্দি করেন পাকিস্তানিদের নির্মম বর্বরতা, ধ্বংসযজ্ঞ আর বীভৎতার চিত্র। তার তোলা ছবিগুলো বিশ^ জনমত গঠনে ব্যাপক ভূমিকা পালন করেছিল। শেরপুরের আলোকচিত্রী নীতিশ রায় ১৯৭১ সালের মে মাসে ভারতে পালিয়ে যান। ১৬ জুন মুজিবনগর থেকে প্রকাশিত ‘জয়বাংলা’ পত্রিকার প্রেস ফটোগ্রাফার হিসেবে যোগ দিয়ে তুলে ধরেন মুক্তিযুদ্ধের আলেখ্য। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন হানাদারদের আক্রমণ ও তাদের নিষ্ঠুরতার ছবি তুলেছিলেন যশোরের আলোকচিত্রী ও গেরিলা যোদ্ধা এস এম সফি।
যশোরে প্রতিবাদী নারী সমাজের মিছিল, লাশ নিয়ে শেয়াল-কুকুরের টানাটানি, ধর্ষিত তরুণী ধরা পড়ে তার ক্যামেরায়। সম্মুখযুদ্ধে ছবি তুলতে গিয়ে তার পায়ে গুলি লাগে। সারা জীবন তাকে পঙ্গুত্ব মেনে নিতে হয়। এস এম সফির তোলা বৃহত্তর যশোর অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন ঘটনার ছবি দিয়ে ২০০৬ সালে ‘আলোকচিত্রে একাত্তর’ শিরোনামে একটি অ্যালবাম প্রকাশিত হয়।
এই ১১ ক্যামেরাযোদ্ধা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে যে সব বরেণ্য আলোকচিত্রী ছবি তুলেছেন তাদের ছবিগুলো একাত্তরের পঁচিশে মার্চের আগে কিংবা ১৫ ডিসেম্বরের পরে তোলা। তাই বলে তাদের অবদানকে খাটো করে দেখার কোনো অবকাশ নেই। মুক্তিযুদ্ধ ও মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে যত প্রকাশনা হয়েছে তার সবগুলোতেই আছে তাদের আলোকচিত্রকর্মের সরব উপস্থাপন। কিন্তু রাষ্ট্র কতটুকু মর্যাদা দিয়েছে এইসব ক্যামেরাযোদ্ধাদের? এখন সময় এসেছে তাদের নিয়ে ভাবার।
লেখক : দেশ রূপান্তরের আলোকচিত্র সম্পাদক