গাজা উপকূলে প্লট বুকিং দিচ্ছেন ইহুদি বসতি স্থাপনকারীরা

গত বছরের সাত অক্টোবর ইসরায়েল ও হামাসের যুদ্ধের পর থেকে অধিকৃত পশ্চিম তীরে ৮০০ একর জমি দখল করেছে দখলদার দেশটি। এবার গাজা সৈকতের দিকে নজর পড়েছে দেশটির ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের।

এমনকি ইতিমধ্যে গাজা উপকূলে প্লট বুকিং শুরু করেছে দখলদার দেশটির নাগরিকেরা। এমন চমকপ্রদ তথ্য জানিয়েছে ব্রিটিশ গণমাধ্যম বিবিসি।

গাজায় ইহুদি বসতি স্থাপনের পক্ষের নেত্রী, ইসরায়েলভিত্তিক নাচালা (স্বদেশ) নামের একটি চরমপন্থী সংগঠনের প্রধান দানিয়েলা উইসের সাথে বিবিসির এক সাক্ষাৎকারে এসব তথ্য উঠে এসেছে।

বিবিসির এক প্রশ্নে ইসরায়েলের বসতি আন্দোলনের নেত্রী ৭৮ বছর বয়সী দানিয়েলা উইস বলেন, তাঁর কাছে ৫০০ মানুষের একটি তালিকা আছে যারা এখনই গাজায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত।

দানিয়েলা বলেন, ‘তেল আবিবে আমার বন্ধুরা আছে। তারা বলে, আমার জন্য গাজার উপকূলের কাছে একটি প্লট রাখার কথা ভুলে যেয়ো না। কারণ, এই উপকূল অপূর্ব সুন্দর, অপূর্ব এর সোনালি বালু।’

দানিয়েলা তাঁদের জানিয়েছেন উপকূলের প্লটগুলোর ইতিমধ্যে বায়না করা হয়ে গেছে।

দানিয়েলা ইসরায়েলের দখলকৃত পূর্ব জেরুজালেম ও পশ্চিম তীরে বসতি স্থাপনে কয়েক দশক ধরে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। ১৯৬৭ সালে আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের পর ফিলিস্তিনের এসব ভূমি দখল করেছিল ইসরায়েল।

২০০৫ সালে ইসরায়েল গাজায় একতরফাভাবে বসতি স্থাপনকারীদের সরে যেতে নির্দেশ দেয়। তখন ২১টি বসতি ভেঙে ফেলা হয়েছিল এবং বসতির প্রায় ৯ হাজার বাসিন্দাকে সরিয়ে নিয়েছিলেন ইসরায়েলের সেনারা। এরপর থেকেই বসতি স্থাপনকারী আন্দোলনের পক্ষের অনেকেই গাজায় ফিরে যাওয়ার স্বপ্ন লালন করে আসছে।

ইসরায়েলের বসতি স্থাপনকারীদের সরে যাওয়ার নির্দেশকে অনেক বসতি স্থাপনকারী রাষ্ট্রের বিশ্বাসঘাতকতা ও কৌশলগত ভুল হিসেবে দেখছেন।

তবে জনমত জরিপে দেখা গেছে, বেশীরভাগ ইসরায়েলি গাজায় আবার বসতি স্থাপনের বিরুদ্ধে। এ ছাড়া এটা সরকারের নীতিতেও নেই। তবে গত ৭ অক্টোবর হামাসের হামলার পর বিষয়টি নিয়ে ইসরায়েলের সরকারের কিছু কর্তাব্যক্তি সোচ্চার হয়েছেন এবং উগ্রপন্থীদের মধ্যেও বিষয়টি নিয়ে জোরেশোরে আলোচনা হচ্ছে।

ইসরায়েলের বসতি আন্দোলনের নেত্রী দানিয়েলা উইস

দানিয়েলা গর্বের সাথে বিবিসির সাংবাদিককে পশ্চিম তীরের একটি মানচিত্র দেখান যেখানে গোলাপী বিন্দু দ্বারা ইহুদি বসতি বুঝানো হয়েছে। বিন্দুগুলি সমস্ত মানচিত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে, যেখানে ফিলিস্তিনিরা তাদের রাষ্ট্র গড়ার আশা করেছিল। সেসব গিলে ফেলছে ইসরায়েল।

বিবিসি বলছে, এই এলাকায় এখন প্রায় ৭ লাখ ইহুদি বসতি স্থাপনকারী রয়েছে এবং তাদের সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদসহ অধিকাংশ আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে বসতি স্থাপনকে আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ বলে মনে করে। তবে ইসরায়েল তা মনে করে না।

দানিয়েলের দৃষ্টিতে ভবিষ্যতে গাজাতে ইহুদিদের বসবাস হবে। সেই গাজায় যেখানে এখন ২৩ লাখ ফিলিস্তিনি অনাহারে দিন কাটাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘গাজার আরবরা গাজা উপত্যকায় থাকবে না। তাহলে কারা থাকবে? ইহুদিরা।’

দানিয়েলার দাবি, ফিলিস্তিনিরা গাজা ছাড়তে চান। অন্য দেশগুলোর উচিত, তাঁদের ঢুকতে দেওয়া।

তিনি বলেন, ‘বিশ্ব অনেক বড়। আফ্রিকা বিশাল। কানাডাও বড়। বিশ্ব গাজার লোকদের ঠাঁই করে দিতে পারবে। আমরা কীভাবে? আমরা উৎসাহ দেই। গাজার যেসব ফিলিস্তিনি ভালো, তারা এটা করতে সুযোগ পাবে। আমি জোর করার কথা বলছি না, আমি তাদের সুযোগ পাওয়ার কথা বলছি। কারণ, তারা যেতে চায়।’

বিবিসির সাংবাদিক দানিয়েলাকে তার মন্তব্যগুলি জাতিগত হত্যার পরিকল্পনার মতো শোনাচ্ছে বলেন। তখন দানিয়েলও এটা অস্বীকার করে না। জানান ইসরায়েলকে রক্ষার জন্য এই পথ বেছে নিয়েছেন তিনি।

তবে দানিয়েলার মন্তব্যের সাথে বিশ্ব পরিস্থিতির কোন মিল নেই। ফিলিস্তিনিরা তাঁদের স্বদেশ ছাড়তে চান এ ধরনের কোনো প্রমাণ নেই। জীবন বাঁচাতে হয়ত অনেকেই সাময়িকভাবে দেশ ছাড়তে চান। কিন্তু বেশীরভাগ ফিলিস্তিনিরই দেশ থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তা নেই। কারণ, সীমান্তগুলো ইসরায়েল ও মিসর কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। তা ছাড়া কোনো দেশ ফিলিস্তিনিদের শরণার্থী হিসেবে নেওয়ার প্রস্তাবও দেয়নি।

দানিয়েলা বর্তমানে তার চিন্তাটি সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিচ্ছেন। এমনকি অন্যান্য বসতি স্থাপনকারীদের মধ্যে ‘গাজায় ফিরে যাও’ লেখা প্রচারপত্র দেখাচ্ছেন তিনি।

দানিয়েলার মত ইসরায়েলের মন্ত্রিসভার সদস্য কট্টর ডানপন্থী নেতা ও জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা বেন গেভিরও গাজায় বসতি স্থাপনের পক্ষে। তিনি নিজেও একজন বসতি স্থাপনকারী।

জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবরের পর ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের হামলার ঘটনা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। জাতিসংঘ অনেক আগে থেকেই বলছে, বসতিগুলো ‘শান্তির পথে বাধা’।

কিন্তু এরপরও বসতি স্থাপনকারী সংস্থাগুলো আবারও গাজার দিকে নজর দিচ্ছে। গাজার সমুদ্রসৈকতে বসতি স্থাপনকারীদের পৌঁছানোর আসলেই কি কোনো সম্ভাবনা রয়েছে?

একজন ফ্রিল্যান্স ইসরায়েলি সাংবাদিক বিবিসিকে বলেন, ‘কখনোই তা হবে না।’ তিনি বলেন, গাজায় আবার বসতি স্থাপন করার আহ্বান নীতিতে রূপ নেবে না।‘