‘এ আকাশও আমাদের’- ঘুড়ি উৎসবে প্রতিরোধের বার্তা ফিলিস্তিনিদের

আপডেট : ১২ জুলাই ২০২৬, ০২:২০ এএম

ইসরায়েল অধিকৃত পশ্চিম তীরের (ওয়েস্ট ব্যাংক) ফিলিস্তিনি গ্রাম বুরিনে প্রতিবছরের মতো এবারও অনুষ্ঠিত হয়েছে ঘুড়ি উৎসব। শিশুদের আনন্দের এই আয়োজন স্থানীয়দের কাছে কেবল উৎসব নয়, এটি নিজেদের ভূমি ও অস্তিত্বের দাবিতে প্রতীকী প্রতিবাদেরও একটি মাধ্যম।

২০০৯ সাল থেকে প্রতি গ্রীষ্মে আয়োজিত এ উৎসব এবারও অনুষ্ঠিত হয় সেই পাহাড়ি ঢালে, যেখানকার কিছু জমি ইসরায়েলি বসতি স্থাপনের কারণে হারানোর দাবি করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। উৎসবস্থলের ওপরে পাহাড়ের চূড়ায় দেখা যায় ১৯৮৩ সালে প্রতিষ্ঠিত ইসরায়েলি বসতি হার ব্রাখা। আন্তর্জাতিক আইনে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের বসতিগুলোকে অবৈধ হিসেবে গণ্য করা হলেও ইসরায়েল এ অবস্থান প্রত্যাখ্যান করে।

উৎসবের অন্যতম আয়োজক ঘাসান নাজ্জার বলেন, ‘আমরা বসতিস্থাপনকারীদের জানাতে চাই-এটি আমাদের ভূমি, এটি আমাদের আকাশ। যদি আমরা আমাদের জমিতে যেতে না পারি, অন্তত আমাদের ঘুড়িগুলো সেখানে উড়তে পারে।’ তার ভাষায়, শিশুদের জন্য আয়োজিত হলেও এ উৎসবের একটি স্পষ্ট রাজনৈতিক বার্তা রয়েছে।

বুরিনে বসবাসকারীদের দৈনন্দিন জীবনে ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারীদের হামলা এবং বসতির সম্প্রসারণ দীর্ঘদিনের বাস্তবতা। জাতিসংঘের মানবিক সহায়তা সমন্বয় কার্যালয় (ওসিএইচএ) ২০০৮ সালেই এ এলাকায় বসতিস্থাপনকারীদের হামলা, গুলি ছোড়া এবং জলপাইগাছ উপড়ে ফেলার ঘটনার কথা উল্লেখ করেছিল।

২০২৩ সালের অক্টোবরে গাজায় যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পশ্চিম তীরে বসতিস্থাপনকারীদের সহিংসতা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ। একই সময়ে ইসরায়েলের কয়েকজন মন্ত্রী পশ্চিম তীরের পুরো বা আংশিক এলাকা সংযুক্ত করার পক্ষে প্রকাশ্যে মত দিয়েছেন।

তবে কয়েক ঘণ্টার জন্য হলেও উৎসবের মাঠে ছিল অন্যরকম আবহ। শিশুদের মুখে রঙ আঁকেন এক ক্লাউন, বাজতে থাকে গান। পরিবারগুলো খোলা আকাশের নিচে পিকনিক করে। আকাশজুড়ে উড়তে থাকে ফিলিস্তিনি পতাকার রঙে তৈরি ঘুড়ি। এর পাশাপাশি মিসরের জাতীয় ফুটবল দলের প্রতি সংহতি জানিয়ে দেশটির পতাকার রঙে তৈরি একটি ঘুড়িও ওড়ানো হয়।

ঘাসান নাজ্জার বলেন, ‘আমাদের শিশুদের খেলাধুলা করার এবং একটি সুন্দর জীবন পাওয়ার অধিকার আছে।’

তবে উৎসবের আনন্দেও নিরাপত্তা নিয়ে ছিল শঙ্কা। স্থানীয়রা জানায়, উৎসব শুরুর আগে নিশ্চিত হতে হয়েছে যে আশপাশে কোনো ইসরায়েলি বসতিস্থাপনকারী দল নেই।

১৫ বছর বয়সী সানা বাশার নাজ্জার বলেন, ‘আমরা অনেক সময় ভয় পাই। গত বছর বসতিস্থাপনকারীদের হামলার কারণে এখানে আসতে পারিনি। এখন আধা ঘণ্টা বা এক ঘণ্টার জন্য এলেও কিছুটা স্বস্তি পাই। যুদ্ধ আর অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে এটাই আমাদের একটু নিঃশ্বাস নেওয়ার সুযোগ।’

স্থানীয় বাসিন্দা দালিয়া জাবান জানান, বসতিস্থাপনকারীরা তাদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে জানালার কাচ ভেঙে দেয় এবং গাড়ি ভাঙচুর করে। তিনি বলেন, ‘আজ শুধু চাই, তারা যেন এখানে না আসে।’

বিকালের দিকে বাতাস কমে এলে ধীরে ধীরে মাটিতে নেমে আসে ঘুড়িগুলো। তবে গ্রামবাসীদের আশা, আগামী গ্রীষ্মেও তারা আবার এই পাহাড়ে ফিরবেন। নিজেদের ভূমির অধিকার এবং অস্তিত্বের দাবির প্রতীক হিসেবে আকাশে আবারও উড়বে রঙিন ঘুড়ি।

গ্রামের বাসিন্দা কুসাই ওয়ালিদ ঈদ বলেন, ‘আমি প্রতি বছর এই উৎসবে অংশ নিই। এ উৎসব আমাদের এই মাটির সঙ্গে শিকড়ের বন্ধনকে আরও দৃঢ় করে।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত