পাক আফগান সীমান্তে প্রায়শই হতাহতের ঘটনা এবং জঙ্গি কার্যকলাপের দায় দুই দেশ একে অপরের দিকে আঙুল তুলে আসছিল। এসব অভিযোগ সাম্প্রতিক বছরগুলিতে, পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের মধ্যে সম্পর্কে ফাটল ধরিয়েছিল কিন্তু সম্প্রতি দুই দেশের মধ্যে লাগাতার সংঘর্ষ প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে ‘অনিশ্চিত দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক’কে একেবারে তলানিতে নিয়ে গেছে , যা এই অঞ্চলে স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে আন্তর্জাতিক মহলে।
২০২১ সালের আগস্ট মাস থেকে আফগানিস্তানে আশ্রয় নেওয়া তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি) এবং তার সহযোগীদের দ্বারা অসংখ্য জঙ্গি হামলার সম্মুখীন হয়েছে পাকিস্তান। ওই সব হামলায় নিরাপত্তা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ব্যাপক পরিমাণে বেসামরিক জনগণ হতাহতের ঘটনা ঘটেছে। তোরখামের প্রধান সীমান্ত ক্রসিং একাধিক বার বন্ধ থাকায় দুই পক্ষের মধ্যে সীমান্ত সংঘর্ষও আরও বৃদ্ধি পেয়েছে।
উল্লেখ্য টিটিপি তালেবানের প্রতি অনুগত এবং প্রায় দেড় দশক ধরে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। পাকিস্তানের কর্তৃপক্ষ টিটিপি জঙ্গিদের আরও ‘কার্যকলাপ সংক্রান্ত স্বাধীনতা’ দেওয়ার জন্য এবং তাদের দেশের অভ্যন্তরে হামলা চালানোর অনুমতি দেওয়ার জন্য তালেবানদের দায়ী করেছে। পাকিস্তানের মতে, জঙ্গিদের আস্তানা সম্পর্কে তথ্য প্রদান এবং আফগানিস্তানকে একত্রে কাজ করার আহ্বান জানানোর পরেও তালেবানরা এই গোষ্ঠীটিকে সহায়তা ও সমর্থন করার বিষয়ে নিজেদের ভূমিকার কথা অস্বীকার করেছে। বিশ্লেষকদের মতে টিটিপি-র সঙ্গে দৃঢ় ঐতিহাসিক ও জাতিগত বন্ধন এবং মতাদর্শগত সখ্যের কারণে তালেবানরা এই গোষ্ঠীর বিরোধিতা করে না। অন্যান্য জঙ্গি গোষ্ঠীও টিটিপিতে যোগদানের বিষয়ে গুঞ্জন রয়েছে যা উদ্বেগ বাড়িয়েছে পাকিস্তানের।
যদিও টিটিপি-র কার্যকলাপের ওপর তালেবানের প্রভাবের অর্থ হল ইসলামাবাদের ওপরেও তালেবানের প্রভাব পড়া। তালেবান আফগানিস্তানে ক্ষমতা দখলের পরপরই টিটিপি ও পাকিস্তানের মধ্যে আলোচনায় মধ্যস্থতা করতে সাহায্য করেছিল এবং খোস্ত ও কুনার এলাকা থেকে কিছু শরণার্থীকে প্রত্যন্ত আফগান প্রদেশে স্থানান্তরিত করেছিল। তা সত্ত্বেও আফগানিস্তান আন্তসীমান্ত আক্রমণের সঙ্গে জড়িত থাকার কথা অস্বীকার করে, যা আদতে টিটিপি পরিচালনা করেছিল এবং এই সমস্যাটিকে আফগানিস্তান নিতান্তই পাকিস্তানের অভ্যন্তরীণ সমস্যা বলে চিহ্নিত করে আসছে।
গত শনিবার (১৬ মার্চ) বিস্ফোরকভর্তি ট্রাক নিয়ে একজন আত্মঘাতী হামলাকারী উত্তর ওয়াজিরিস্তান জেলায় একটি সামরিক চেকপয়েন্টে ঢুকে পড়ে বিস্ফোরণ ঘটায়; এতে পাকিস্তানের সাত সেনা নিহত হন। জইশ-ই-ফুরসান-ই-মুহাম্মদ গোষ্ঠী এই হামলার দায় স্বীকার করেছে। যদিও পাকিস্তানের নিরাপত্তা কর্মকর্তারা বিশ্বাস করেন, সংগঠনটি টিটিপি সদস্যদের নিয়ে গঠিত। এর প্রতিশোধ হিসেবে একই দিনে আফগানিস্তানের পূর্বাঞ্চলে সীমান্ত ডিঙিয়ে কয়েকটি এলাকায় দুটি বিমান হামলা চালিয়েছে পাকিস্তান। এতে তিন শিশুসহ আটজন নিহত হয়েছেন। পাকিস্তানের এই হামলাকে আফগানিস্তানের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন বলে নিন্দা জানিয়েছেন তালেবান সরকারের মুখপাত্র জাবিহুল্লাহ মুজাহিদ।
তিনি বলেন, সীমান্ত প্রদেশে বেসামরিক বাসস্থান পাকিস্তানি বিমান ও ড্রোন দ্বারা বোমা হামলার শিকার হয়েছে বলে জানা গেছে। তিনি যোগ করেছেন যে আফগানিস্তানের অভ্যন্তরে পাকিস্তানের এই বিনা উসকানি হামলার ফলে আফগান নারী ও শিশুদের হতাহতের ঘটনা ঘটেছে এবং কোন জঙ্গি নয়। তিনি এ ঘটনার তীব্র নিন্দা প্রকাশ করে বলেন, ‘তালেবান সরকার হামলাগুলোকে সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন হিসেবে দেখছে। তিনি পাকিস্তানের এই ধরনের কর্মকাণ্ডের তীব্র নিন্দা জানান।
তালেবান সরকারের আর এক মুখপাত্র এনায়াতুল্লাহ খোয়ারিজমি এক্সে লিখেছেন, ‘‘বিশ্বের বড় বড় শক্তি গুলির সঙ্গে দীর্ঘ লড়াইয়ের ইতিহাস রয়েছে আফগানিস্তানের। বর্তমানে তারা কোনো বিদেশি শক্তিকে নিজেদের ভূখণ্ডে হস্তক্ষেপের অনুমতি দেয় না। পাকিস্তানের হামলার তীব্র বিরোধিতা করছে তালেবান।’’ তার পোস্টে পাকিস্তানের আগ্রাসী পদক্ষেপের মোকাবিলায় প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা বাহিনীর প্রস্তুতির কথা তুলে ধরা হয়েছে।
এদিকে আজ ২৮ মার্চ পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে বলেছেন, ‘সন্ত্রাসী ঘটনা বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে সীমান্ত পরিস্থিতির মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন। পাকিস্তানে সন্ত্রাসবাদের উৎস আফগানিস্তানে এবং আমাদের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও, কাবুল এই দিকে কোনো অগ্রগতি করছে না।’ তিনি হতাশা নিয়ে বলেন, তালেবান প্রশাসন সন্ত্রাসবাদের আস্তানা সম্পর্কে অবগত থাকা সত্ত্বেও সন্ত্রাসীরা তাদের ভূখণ্ড থেকে পাকিস্তানের বিরুদ্ধে অবাধে তৎপরতা চালাচ্ছে। তিনি জোর দিয়ে বলেন, ‘কাবুল থেকে (সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবিলায়) সহযোগিতা পাওয়া যাচ্ছে না।’
আফগান পাকিস্তানের সম্পর্কের টানাপোড়েন নিয়ে ভারতের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক হরাষ ভি পান্ত বলেন, আফগানিস্তানের প্রতি পাকিস্তানের এই একতরফা পদক্ষেপগুলি উভয় পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাসকে আরও প্রশস্ত করেছে, তালেবানদের তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য এই অঞ্চলে পাকিস্তানের বাইরে তাকাতে বাধ্য করেছে। উদাহরণ হিসেবে পাকিস্তানে আফগান শরণার্থীদের কথা বলেন তিনি।
পাকিস্তানের অভ্যন্তরে থাকা ৪ মিলিয়ন বিদেশির মধ্যে প্রায় ৩.৮ মিলিয়নই আফগান, যার মধ্যে প্রায় ১.৭ মিলিয়ন আফগান অবৈধ ভাবে পাকিস্তানে প্রবেশ করেছেন। সর্বশেষ সিদ্ধান্তের আগে ইসলামাবাদ অযৌক্তিক গ্রেপ্তার এবং ছোট আকারে নির্বাসনের মাধ্যমে শরণার্থীদের দ্বারা তালেবানের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ দেওয়ার চেষ্টা করেছিল। যখন সর্বশেষ নীতি নির্দেশনা ঘোষণা করা হয়, তখন পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ২৪টি আত্মঘাতী বোমা হামলার নেপথ্যে থাকা ১৪ জন আফগান নাগরিকের ভূমিকার কথা তুলে ধরেন, ২০২৩ সালে যার সাক্ষী থেকেছে গোটা দেশ। প্রধানমন্ত্রী আফগান পক্ষ থেকে অসহযোগিতার সিদ্ধান্তকেও তুলে ধরেছেন। পাকিস্তান সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত পদক্ষেপের সঙ্গে বাণিজ্যকে সহজলভ্য করে তোলার চেষ্টাকে সংযুক্ত করতে চাইছে। তালেবান এই সিদ্ধান্ত গুলিকে ‘একতরফা’, ‘অন্যায্য’ এবং ‘অমানবিক’ বলে মনে করে এবং পাকিস্তান যদি তার নীতির পরিবর্তন না করে, তা হলে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের জন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব-সহ প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপ করারও হুঁশিয়ারি দিয়েছে আফগানিস্তান।
তিনি বলেন, এখন ওই সীমান্তে যা হচ্ছে তা এসব আগের সমস্যাগুলোর সমাধান ব্যর্থতার বহিঃপ্রকাশ। যা দিন দিন ওই অঞ্চলের মানবিক পরিস্থিতি খারাপতর করে তুলেছে। এই উভমুখী সমস্যার মাঝে পড়ে আফগান শরণার্থীরা বর্তমানে একটি জটিল অবস্থানে আটকে রয়েছেন। তাঁদের অবস্থা নিয়ে পাকিস্তানের তরফে কোনো সন্তোষজনক ভূমিকা না থাকলেও নির্মম প্রশাসনের অধীনে আফগানিস্তানে ফিরে যেতে বাধ্য করা বা যে দেশ এক সময়ে তাঁদের স্বাগত জানিয়েছিল অর্থাৎ পাকিস্তানে আটকে পড়ে থাকার ঝুঁকি তাঁদের সমস্যা বহু গুণ বৃদ্ধি করেছে। যেহেতু আফগানিস্তান ইতিমধ্যেই ত্রাণের ধারাবাহিকতা ব্যাহত হওয়া এবং অক্টোবরে ঘটে যাওয়া বিধ্বংসী ভূমিকম্পের কারণে একটি মানবিক সংকটে ভুগছে, তাই এত বেশি সংখ্যক প্রত্যাবর্তনকারীর আগমন সে দেশেও নতুন সমস্যার সৃষ্টি করবে। প্রায় ৯,০০০-১০,০০০ শরণার্থী অল্প জিনিসপত্র এবং সামান্য নগদ টাকা নিয়ে প্রতি দিন ট্রাকে করে আফগানিস্তানে প্রবেশ করছেন এবং প্রায় তিন লাখ শরণার্থী এখনো পর্যন্ত পাকিস্তান থেকে আফগানিস্তানে ফিরে যেতে বাধ্য হয়েছেন। তালেবানরা যথেষ্ট পরিমাণে খাদ্য, আশ্রয় ও স্বাস্থ্যসেবা সংক্রান্ত সুবিধা-সহ ক্যাম্প স্থাপন করেছ- এ রকম দাবি করলেও শরণার্থীদের বেঁচে থাকা এবং শেষ পর্যন্ত দেশে পুনর্বাসনের বিষয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ রয়েছে।
পাকিস্তানি প্রধানমন্ত্রী তালেবানের সামনে পাকিস্তান ও টিটিপি এই দুইয়ের মধ্যে যে কোনো একটি বিকল্প বেছে নেওয়ার কথা বললেও পাকিস্তান নিজেই চরমপন্থী গোষ্ঠী গুলিকে সমর্থন করার দুমুখো নীতি লালন করছে যা এখন পাকিস্তানকেই সমস্যায় ফেলেছে। তালেবানদের তরফে পাকিস্তানের দাবি মেনে নেওয়ার সম্ভাবনাও নিতান্ত ক্ষীণ।
একসময় পাকিস্তান এবং তালেবানের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ ছিল। এমনকি, পাকিস্তান দীর্ঘ সময়ের ধরে তালেবানদের বিভিন্নভাবে সমর্থন দিয়ে আসছিল। ২০২১ সালে তালেবান আফগানিস্তানের মসনদ দখল করে নেওয়ার পর থেকেই পাকিস্তান এবং আফগানিস্তানের সম্পর্ক নতুন করে খারাপ হতে শুরু করে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তালেবান ক্ষমতায় আসার পর পাকিস্তানের সঙ্গে তাদের বিরোধের অন্যতম কারণ হল দুই দেশের দৃষ্টিভঙ্গির তফাত। তালেবান পাক সরকার তথা পাক সেনাবাহিনীকে আগেই চিনে নিয়েছিল। তাই ক্ষমতায় আসার পর তাদের আর বিশ্বাস করেনি। আফগানিস্তানের মসনদ দখলের পরেও পাকিস্তানের ‘হাতের পুতুল’ হয়ে থাকতে চায়নি তালেবান। সময়বিশেষে পাকিস্তান নিজের অবস্থান বদলে তালেবান সদস্যদের আমেরিকার হাতে তুলে দিয়েছে বলেও অভিযোগ। ২০২২ সালের এপ্রিল মাসে আফগানিস্তানের পূর্ব প্রান্তে একটি বিমান হামলা হয়। তাতে ৪৭ জনের মৃত্যু হয়েছিল। আফগানিস্তান দাবি করে, এই হামলার নেপথ্যে ছিল পাকিস্তান।
সাম্প্রতিক সংঘর্ষগুলি পাকিস্তান-আফগানিস্তান সীমান্তে নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভঙ্গুরতা এবং আরও রক্তপাত রোধে সংলাপ এবং কূটনৈতিক সমাধানের জরুরি প্রয়োজন। উভয় দেশ যেহেতু অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ এবং বাহ্যিক চাপ মোকাবিলা করছে, এই অঞ্চলে স্থায়ী শান্তি ও স্থিতিশীলতার জন্য অভিন্ন ভিত্তি খুঁজে বের করা এবং পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি করা অপরিহার্য।