বাফুফে নির্বাচন: নতুন সম্ভাবনা ও পুরনো অভিজ্ঞতা

আপডেট : ০৮ অক্টোবর ২০২৪, ০৩:৩৩ পিএম

বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন (বাফুফে) প্রতিষ্ঠার শুরুতে যে আশা-আকাঙ্ক্ষা ছিল, সেই লক্ষ্য আজ ধীরে ধীরে ফিকে হতে চলেছে। ১৯৭২ সালের ১৫ জুলাই তৎকালীন শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া বিষয়ক মন্ত্রী অধ্যাপক ইউসুফ আলী বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনিই বাফুফের প্রথম সভাপতি এবং ওয়ারী ক্লাবের আবুল হাসেম ছিলেন প্রথম সাধারণ সম্পাদক। সংস্থাটি ১৯৭৩ সালে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) এবং ১৯৭৪ সালে আন্তর্জাতিক ফুটবল ফেডারেশন (ফিফা)-র সদস্য পদ লাভ করে।

বর্তমান পরিস্থিতি: কর্পোরেট সংস্কৃতির দিকে অগ্রসর

বর্তমানে বাফুফে যেন একটি কর্পোরেট অফিসে পরিণত হয়েছে, যেখানে ফুটবল উন্নয়ন এবং খেলোয়াড় তৈরি বাদ দিয়ে বিদেশ সফরের সংগঠন হিসেবে কাজ করছে। এর ফলে দেশের ফুটবলের প্রাণ ও সম্ভাবনা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফুটবলের মৌলিক বিষয়গুলো অধিকাংশ সময় উপেক্ষিত হচ্ছে, এবং যুব প্রকল্প ও স্থানীয় লিগগুলোর উন্নয়ন নিয়ে যথাযথ পরিকল্পনার অভাব দেখা যাচ্ছে।

নির্বাচনের আগে ভাবনা: আশা ও হতাশার মিশ্রণ

আগামী ২৬ অক্টোবর বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। এই নির্বাচনকে ঘিরে নতুন মাসের শুরু থেকেই উত্তাপ বাড়ছে। কিন্তু এটি কি কেবল একটি নির্বাচন? যারা নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে চাচ্ছেন, তাদের অনেকেরই রয়েছে সাংগঠনিক দক্ষতা ও বিত্তবৈভব। বিগত ১৫ বছর ধরে ফুটবল ফেডারেশনের নির্বাচনে কাউন্সিলরদের টাকা দিয়ে প্রভাবিত করে ও ভোট কিনে লোক দেখানো নির্বাচন হয়েছে।

বিভিন্ন জেলা থেকে কাউন্সিলর বানানোর মহোৎসবে পরিণত হয়েছে এই নির্বাচন, যা নির্বাচনের প্রকৃত উদ্দেশ্য থেকে সরে গেছে। এ বিষয়ে যখন প্রশ্ন করা হয়, তখন দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা উপরের নির্দেশনার কথা উল্লেখ করেন। এমনকি ভোট কেনা-বেচার অভিযোগও উঠে এসেছে, যেখানে কাউন্সিলররা প্রকাশ্যে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।

খেলোয়াড় এবং সংগঠক: নতুন নেতৃত্বের প্রয়োজন

এটি সবার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা যে, একজন ভালো ফুটবল খেলোয়াড় মানেই একজন ভালো ক্রীড়া সংগঠক নয়। যারা সভাপতি পদে নির্বাচনে প্রার্থী হচ্ছেন, তারা যদি সম্মিলিতভাবে একটি প্যানেল তৈরি করেন, তবে তারা বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনকে ক্রীড়াবান্ধব হিসেবে ঢেলে সাজাতে সক্ষম হতে পারেন।

রাজনৈতিক প্রভাব: শিক্ষা ও উদাহরণ

ক্রীড়াঙ্গনের চার খলিফা হিসেবে খ্যাত হারুনুর রশিদ (আবাহনী ক্লাব), মনিরুল হক চৌধুরী (মোহামেডান), প্রয়াত মেয়র ও সাবেক যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রী সাদেক হোসেন খোকা এবং মরহুম মোঃ আমিন (রহমতগঞ্জ ক্লাব) ক্রীড়া পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহার করেননি। তাদের এই কাজ আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, যা আমরা পালন করতে পারিনি।

ফুটবলের উন্নয়নে ব্যর্থতা

বাফুফের দায়িত্বশীলদের কার্যক্রমে ফুটবলের মৌলিক বিষয়গুলো উপেক্ষিত হচ্ছে। খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়া, যুব প্রকল্প এবং স্থানীয় লিগগুলোর উন্নয়নের জন্য কার্যকর পরিকল্পনার অভাব দেখা যাচ্ছে। ফুটবল অনুরাগীরা দীর্ঘকাল ধরে উন্নত মানের খেলা এবং নতুন খেলোয়াড়ের আবির্ভাবের জন্য অপেক্ষা করছেন, কিন্তু ফেডারেশনের অদূরদর্শী নীতির কারণে তাদের আশা-আকাঙ্ক্ষা ধূসর হয়ে যাচ্ছে।

বিদেশ সফরের দিকে মনোযোগ: অর্থনৈতিক লাভের সন্ধানে

বর্তমানে বাফুফে প্রধানত বিদেশ সফরের সংগঠন হিসেবে পরিচিত হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন দেশ সফর করে আন্তর্জাতিক ম্যাচে অংশগ্রহণ করার চেয়ে, ফেডারেশনটির জন্য আর্থিক লাভের সুযোগ অধিক গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। খেলোয়াড়দের মান উন্নয়ন এবং দেশীয় ফুটবলের উন্নয়ন বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা হচ্ছে না, যার ফলে দেশের ফুটবল দর্শকদের মধ্যে হতাশা দেখা দিয়েছে।

প্রভাব ফুটবলের উপর: যুব প্রজন্মের আগ্রহ হারানো

বাফুফের এই পরিবর্তনের ফলে বাংলাদেশের ফুটবলে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। দেশের তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ফুটবল খেলার আগ্রহ কমে যাচ্ছে, এবং নতুন প্রতিভাদের বিকাশের সুযোগ সীমিত হচ্ছে। মাঠে খেলার পরিবর্তে প্রশাসনিক কর্মকাণ্ডের দিকে বেশি মনোযোগ দেওয়ার ফলে ফুটবলের গুণগত মানও হ্রাস পাচ্ছে।

সমাধান ও ভবিষ্যৎ: নতুন দিগন্তের সন্ধানে

বাফুফের এই অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ফুটবল উন্নয়নে আন্তরিকতা নিয়ে কাজ করতে হবে এবং খেলোয়াড় তৈরির প্রক্রিয়া পুনরুজ্জীবিত করতে হবে। স্থানীয় লিগগুলোর উন্নয়ন এবং যুব প্রকল্পের প্রতি বেশি মনোযোগ দিতে হবে, যা দেশের ফুটবলের ভবিষ্যৎ গড়তে সহায়তা করবে।

শেষ কথা: সময় এসেছে ফুটবলের প্রাণ ফিরিয়ে আনার

আশা করা যায়, বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশন তার মূল লক্ষ্যগুলি পুনর্বিবেচনা করে দেশের ফুটবলের উন্নয়নের পথে নতুন করে হাঁটবে এবং খেলার প্রতি সাধারণ মানুষের আগ্রহ বৃদ্ধি করবে। ফুটবলের প্রাণ ফিরে পাওয়ার সময় এখনই। সাবেক ক্রীড়া সংগঠক ও খেলোয়াড়দের অন্তর্ভুক্তি এবং তাদের অভিজ্ঞতার সদ্ব্যবহার করেই ফুটবলের আগামী দিনে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা সম্ভব।

লেখক: রাষ্ট্রীয় পুরস্কার প্রাপ্ত সাবেক জাতীয় দলের খেলোয়াড় ও ক্রীড়া সংগঠক।

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত