আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা এবং যুদ্ধের অর্থনীতি

দুই হাজার বাইশ সালের গ্রীষ্ম ও শরৎকাল জুড়ে বড় একটা আলোচনার বিষয় ছিল যুদ্ধে যখন জিততে পারবেন না, তখন রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন মুখ রক্ষা করে কীভাবে পালাতে পারেন এমন একটা পথ খুঁজে বের করতে হবে। এখন যে প্রশ্নটি ধীরে ধীরে বাড়ছে সেটা হলো, ইউরোপের মুখ রক্ষার জন্য একটা পথ খুঁজে বের করা দরকার। দুই বছরের নিষ্ঠুর যুদ্ধের পর ইউক্রেনে যে মানবিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে সেটা অপূরণীয়। আর যুদ্ধের অভিঘাতে ইউক্রেনের ধুঁকতে থাকা অর্থনীতি এখনই পঙ্গু হয়ে গেছে। এখানেই শেষ নয়। যুদ্ধের যে ব্যয়ভার, সেটা বিস্ময়করভাবে বেড়ে চলেছে। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, বিশ্বব্যাংক ও জাতিসংঘ সম্প্রতি যে যৌথ মূল্যায়ন করেছে, তাতে দেখা যাচ্ছে ইউক্রেন পুনর্গঠনের জন্য ৪৮৬ বিলিয়ন ডলার প্রয়োজন হবে। এর অর্থ হচ্ছে, ইউরোপীয় ইউনিয়ন ইউক্রেনের জন্য আগামী চার বছর ধরে যে অর্থের বরাদ্দ দিয়েছে, এক বছরেই ইউক্রেনের তার দেড় গুণ অর্থ প্রয়োজন। রাশিয়ার বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরক্ষা গড়ে তুলতে ইউক্রেনকে সহায়তা করার জন্য ন্যাটোর সদস্য দেশগুলো দেশটিকে আরও অস্ত্রশস্ত্র এবং গোলাবারুদ পাঠানোর কথা বিবেচনা করছে। ইউক্রেনকে সবচেয়ে বেশি সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা দেয় আমেরিকা-তালিকায় এর পরেই আছে ক্রমান্বয়ে ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন (ইইউ), জার্মানি আর যুক্তরাজ্য।

ইউক্রেনকে কী পরিমাণ সামরিক সহায়তা দেওয়া হচ্ছে তার হিসাব রাখে কিয়েল ইনস্টিটিউট। এই সংস্থায় তথ্য-উপাত্তের যে হিসাব রয়েছে তা মে মাসের শেষ পর্যন্ত দেওয়া দানের হিসাব। এরপর আমেরিকা ইউক্রেনের জন্য নতুন এক থোক সামরিক সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে, যার পরিমাণ ৫০০ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি ডলার। আমেরিকা আরও নিশ্চিত করেছে যে, তারা ইউক্রেনকে ক্লাস্টার বোমা দেবে, যা একটি বিতর্কিত পদক্ষেপ এবং যা নিয়ে ন্যাটো জোটের কিছু কিছু সদস্য দেশের মধ্যে অস্বস্তি সৃষ্টি হয়েছে। ওদিকে যুক্তরাষ্ট্র থেকে ইসরায়েলের জন্য কত সাহায্য যায় তা নিয়ে প্রেসিডেন্ট বাইডেন নিজের দলের ভেতর থেকেই বেশ কিছু কঠিন প্রশ্নের মুখে পড়েছেন। ডেমোক্রেটিক পার্টির মধ্যে বাম ঘরানার সবচেয়ে সুপরিচিত রাজনীতিক সিনেটর বার্নি স্যান্ডারস বলেছেন, ইসরায়েলকে পাঠানো টাকা কোথায় কীভাবে খরচ করা হচ্ছে সেদিকে গভীর দৃষ্টি দিতে হবে। ২০২০ সালে, যুক্তরাষ্ট্র ইসরায়েলকে ৩.৮ বিলিয়ন (৩৮০ কোটি) ডলার সাহায্য দিয়েছে। প্রেসিডেন্ট ওবামার শাসনামলে ইসরায়েলকে দীর্ঘমেয়াদি যে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার অধীনেই এই সাহায্য গেছে। প্রায় পুরোটাই ছিল সামরিক সাহায্য। ২০১৬ সালে প্রেসিডেন্ট ওবামা ইসরায়েলের সঙ্গে এক চুক্তি সই করেন। যার অধীনে ২০১৭-১৮ সাল থেকে তার পরবর্তী ১০ বছর ইসরায়েল ৩৮ বিলিয়ন ডলার বা ৩৮০০ কোটি ডলার সামরিক সাহায্য পাবে। তার আগে দশ বছরের তুলনায় ওই সাহায্য বেড়েছে প্রায় ছয় শতাংশ। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন শুরুর পরই কিয়েভের মিত্রদেশগুলো যখন কীভাবে সাড়া দেবে, তা নিয়ে হুড়োহুড়ি শুরু করেছিল, সে সময় যুক্তরাষ্ট্র সরকার কিয়েভের কাছে অস্ত্র সরবরাহের আইনগত ভিত্তিটা পুনর্মূল্যায়ন করেছিল। কয়েক দিনের মধ্যে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিন ঘোষণা দিয়েছিলেন, অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হলে তারা সেটাকে যুদ্ধ বলে ধরে নেবেন।

রাশিয়ার প্রতিরক্ষামন্ত্রী সে সময় বলেছিলেন, তৃতীয় কোনো দেশ যদি উড়োজাহাজের নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহৃত হয় এবং রাশিয়ার সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সেগুলো ব্যবহার করা হয়, তাহলে ধরে নেওয়া হবে যে, ওই দেশগুলো রাশিয়ার সঙ্গে সশস্ত্র সংঘাতে জড়িয়ে পড়েছে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে নিরপেক্ষতার যে আইন প্রচলিত, সেখানে বলা হয়েছে, যদি যুদ্ধরত দেশগুলোর মধ্যে একটি পক্ষ অন্যায্যভাবে আরেকটি পক্ষকে আক্রমণ করে বসে এবং সেই পক্ষ যদি নিজেদের প্রতিরক্ষা করতে অক্ষম হয়, তাহলেই কেউ দেশটিকে অস্ত্র সরবরাহ করতে পারবে। এই সংজ্ঞা অনুযায়ী তৃতীয় কোনো দেশ যুদ্ধে তখনই জড়িয়ে পড়বে, যদি তারা রাশিয়ার বিরুদ্ধে সরাসরি তাদের সেনা নিয়োগ করে। ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসন জাতিসংঘ সনদের দুই এর চার অনুচ্ছেদের গুরুতর লঙ্ঘন। এর অর্থ হচ্ছে, রাশিয়াকে এই সংঘাতে কেউ যদি অস্ত্র সরবরাহ করে, সেটাও আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হবে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ইউক্রেনকে অস্ত্র সহায়তা দেওয়া এবং ইউক্রেনের সামরিক বাহিনীকে রাশিয়ার লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালানোর কাজে সহযোগিতার সহায়তার মধ্য দিয়ে যুক্তরাজ্য কি ইউক্রেনের সহযোদ্ধা দেশ হয়ে উঠল? এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক আইনে স্পষ্ট মীমাংসা নেই।

কিন্তু আইনবিশারদরা মনে করেন, রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনীয় বাহিনীর প্রতিরোধে সহায়তা করা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হবে না। এ ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য সহযোদ্ধা দেশ হবে না। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রে সরাসরি যদি যুক্তরাজ্যের সেনারা অভিযান পরিচালনা করেন কিংবা রাশিয়ার বিরুদ্ধে মিসাইল ছোড়েন, তাহলে সেটা আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হবে। সে ক্ষেত্রে যুক্তরাজ্য-ইউক্রেন যুদ্ধ-দোসর হবে। আন্তর্জাতিক আইন যা-ই বলুক না কেন, ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়া-ন্যাটোর মধ্যে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে। কিন্তু মুখে যতই হুমকি দিক না কেন, রাশিয়া কখনোই ন্যাটোর সঙ্গে সামরিক সংঘাতে জড়াতে আগ্রহী নয়। সুতরাং যতই উত্তপ্ত বাক্যযুদ্ধ হোক না কেন, ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে ন্যাটো ও রাশিয়া পরস্পর মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে পড়ার সুযোগ এ মুহূর্তে খুবই কম। ইউক্রেনীয়দের পরাজয় পশ্চিমা বিশ্বের জন্য বিপজ্জনক রকম অপমান। রাশিয়ার বিজয় হবে বর্তমান আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার ওপর বড় একটা আঘাত। সে ক্ষেত্রে বিশ্বব্যবস্থা এমন একপর্যায়ে প্রবেশ করবে, যেটা মোটেই পশ্চিমাদের পক্ষে হবে না। সে ক্ষেত্রে শীতল যুদ্ধের দুই শিবিরের মধ্যকার সংঘাতের প্রত্যাবর্তন হতে পারে। কিন্তু এবার সম্ভবত চীনের নেতৃত্বাধীন রাশিয়া, ইরান ও উত্তর কোরিয়ার শক্তিশালী শিবিরের সঙ্গে দুর্বল ও কম ঐক্যবদ্ধ পশ্চিমা জোটের সংঘাত ফিরে আসবে। এতে করে জলবায়ু পরিবর্তন ও খাদ্য নিরাপত্তার মতো জটিল সমস্যাগুলোর ওপর মনোযোগ একেবারেই কম দিতে হবে। এ পরিস্থিতি বৈশি^ক দক্ষিণের সেসব দেশের জন্যও হুমকি তৈরি করবে, যারা ইউক্রেনের পক্ষে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়েছে। বেরুনোর একটা পথ খোঁজার মানে অবশ্য এই নয় যে, পুতিনকে জিততে দেওয়া। এর অর্থ হচ্ছে, ইউক্রেন এখন যতটা ভূখণ্ড নিয়ন্ত্রণ করছে, তার প্রতিরক্ষা সুনিশ্চিত করা।

এ ক্ষেত্রে আরও বেশি পশ্চিমা সমর্থন দরকার হবে, কিন্তু অস্ত্রবিরতির জন্য একটা বন্দোবস্তে আসার বিষয়টি আন্তরিকভাবে বিবেচনা করা দরকার। আর লড়াইয়ের পরিসমাপ্তি মানে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলোর শক্তিশালী নিরাপত্তা গড়ে তোলার সময় পাওয়া। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নীতি নিয়ে বিতর্কের মঞ্চ মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্স বার্ষিক ঝুঁকি সূচক প্রকাশ করে। ২০২৩ সালের সূচকে দেখা গিয়েছিল, জি-৭ ভুক্ত সাত দেশের মধ্যে পাঁচ দেশই রাশিয়াকে তাদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বলে মনে করছে। কিন্তু ২০২৪ সালের সূচক বলছে, জি-৭-এর মাত্র দুটি দেশ রাশিয়াকে তাদের দেশের জন্য ঝুঁকি বলে মনে করছে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সামরিক সমর্থন পাওয়ার দিক থেকে ইউক্রেন জি-৭-এর ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল হওয়ায় এটি অবশ্যই উদ্বেগজনক ঘটনা। এ থেকে প্রতীয়মান হয় যে, ইউক্রেনকে সমর্থন দেওয়ার জন্য নিজ নিজ দেশের জনগণের সমর্থন আদায় করা ইউরোপের রাজনীতিবিদদের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। দৃষ্টান্ত হিসেবে বলা যায়, ফ্রান্স ও জার্মানির ভোটাররা পুতিনের পরিকল্পিত ইউক্রেন যুদ্ধের চেয়ে গণ-অভিবাসন ও উগ্রবাদী সন্ত্রাসী গোষ্ঠী নিয়ে বেশি উদ্বিগ্ন। এ ছাড়া পশ্চিমাদের সম্মিলিত মনোযোগের একমাত্র কেন্দ্র ইউক্রেন নয়। গাজা যুদ্ধ এবং মধ্যপ্রাচ্য জুড়ে বিস্তার পাওয়া সংঘাত এখন পশ্চিমাদের অ্যাজেন্ডার শীর্ষে রয়েছে। তা ছাড়া আরও অনেক সমস্যা রয়েছে, যেটা বৈশ্বিক সংবাদের শিরোনাম হয় না। সুদানের গৃহযুদ্ধ, ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোয় বাড়তে থাকা সংঘাত, ইথিওপিয়া ও সোমালিয়ার মধ্যকার উত্তেজনা এ সবকিছুই পশ্চিমা দেশগুলোর মধ্যে অভিবাসীর নতুন ঢেউ শুরুর উদ্বেগ তৈরি করছে।

এ প্রেক্ষাপটের বাইরেও আরেকটা কারণ এখন ইউক্রেনের জন্য দুঃখের একটা প্রধান কারণ হয়ে উঠেছে। ইউরোপের দেশগুলোর অনেক নেতা এখন এই উদ্বেগে আছেন যে, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে হোয়াইট হাউজে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রত্যাবর্তন হবে। তাতে করে ট্রান্স আটলান্টিক অ্যালায়েন্স বা ন্যাটো জোটের সমাপ্তি রচিত হতে পারে। আর যুক্তরাষ্ট্র যদি ইউক্রেন থেকে সমর্থন তুলে নেয় তাহলে যুদ্ধটা চালিয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে ইউরোপের সামনে যে চাপ এসে পড়বে, সেটা এখনকার চেয়ে অনেক বেশি। ১৭ ফেব্রুয়ারি মিউনিখ সিকিউরিটি কনফারেন্সে ভলোদিমি জেলেনস্কি বলেছেন, গত কয়েক মাসে সামরিক সরঞ্জামের ঘাটতির কারণে ইউক্রেনীয় বাহিনীকে অনেক ভুগতে হচ্ছে। রুশ বাহিনীর হাতে আভদিবকা শহরের আসন্ন পতন তারই দৃষ্টান্ত। এই পরাজয়ের কারণে ইউক্রেনীয় বাহিনীর ফ্রন্ট লাইন কয়েকশ মিটার পিছিয়ে যাওয়া ছাড়া আর যে বড় ক্ষতি হচ্ছে, তা বলা যাবে না। কিন্তু এই পরাজয়ের মনস্তাত্ত্বিক প্রভাব তাৎপর্যপূর্ণ। পশ্চিমাদের ওপরেও এর প্রভাব পড়ছে। কেননা, পশ্চিমা জনমনে এই চিন্তাটা আসতে শুরু করেছে যে, যুদ্ধ জয়ের ব্যাপারে ইউক্রেনীয়দের ইচ্ছা ও প্রচেষ্টা টেকসই কি না। লড়াইয়ের গতিমুখ এখন যেদিকে তাতে করে ইউক্রেনের পরাজয় ঠেকানো কঠিন। সম্প্রতি মার্কিন টিভি উপস্থাপক টাকার কার্লসনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে পুতিন তার বিজয়ের লক্ষ্যমাত্রার কথা বলেছেন। প্রতিরোধের সক্ষমতা কমে গেলে পুতিনের সেই লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়ে যেতে পারে।

লেখক: গবেষক ও কলাম লেখক

raihan567@yahoo.com