টানা দুমাস মেঘনা নদীতে সব ধরনের মাছ শিকার ও জাল ফেলা নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে মৎস্য অধিদপ্তর। এ দুমাস কর্মহীন থাকে জেলে সম্প্রদায়ের লোকজন। তাদের পরিবারে আয়ের উৎস মাছ শিকার করা ছাড়া পুরোই অচল। নদীতে মাছ শিকার বন্ধ মানে বেকার-অচল জীবনযাপন। পরিবারে সদস্য থাকে একাধিক। তাদের ভরণ-পোষণ চালানো একেবারেই দায়। দুবেলা দুমুঠো আহার জোগানো কষ্টসাধ্য হয়ে পড়ে জেলে কর্তার।
দুমাস টানা অবরোধে অন্য কাজে তাদের দেখা মেলে না। মাছ শিকারেই নির্ভরশীল তারা। সরকারি ভিজিএফের চাল বরাদ্দে চলে তাদের সংসার। নিবন্ধিত কার্ডধারীরা ৮০ কেজি চাল পান। সংসারে ৪-৫ জন খাওয়ার মানুষ থাকে। সরকারি বরাদ্দে তাদের পরিবারে কোনো মতে চলে। কিন্তু, ভিজিএফের চাল নিতে টাকা দিয়েও ব্যর্থ হতে হয় যখন, তখনই বাধে বিপত্তি। কীভাবে চলবে সংসার, পরিবার? এমন চিন্তার ভাঁজ কপালে থাকে। জেলে এবং নিবন্ধিত কার্ডধারী, অথচ চাল নেই। দুমাসের নিষেধাজ্ঞায় সরকারি বরাদ্দ শতভাগ হচ্ছে না। অর্ধেক বরাদ্দের তালিকায় শতভাগ জেলেরা বঞ্চিত হয়। তাদের পেশাদারিত্বে প্রভাব ফেলে ব্যাপক। জেলে ও নিবন্ধিত কার্ডধারী কয়েক জনের সঙ্গে কথা হয় মেঘনার পাড়ে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন জেলে জানান, তাদের পরিবারে ৫জন নিবন্ধিত কার্ডধারী জেলে রয়েছে। ৫ জনের কার্ড জমা দিয়ে মাত্র ১ জনের নামে চাল বরাদ্দ পেয়েছেন। বাকিরা চাল পাননি। তাদের সংসারে একাধিক সদস্য রয়েছে। মাত্র দুবারে ৮০ কেজি চাল দিয়ে এতজনের সংসার কীভাবে চালাবেন। তাদের দাবি শতভাগ বরাদ্দ হলে সব নিবন্ধিত কার্ডধারীরা চাল পেত।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক জেলে জানান, ৪০ কেজি চাল বরাদ্দ থাকলেও ৩২ কেজি চাল পান তিনি। সংসারে ৪ জন রয়েছে। তিনি বলেন, দুমাস অবরোধে নদীতে নামতে পারব না। তাহলে এত কম বরাদ্দ দিয়ে কীভাবে সংসার চালাবে।
জেলে আব্দুর রহিম, রবিউল জানান, নদীতে মাছ ধরার বয়স তার প্রায় ২৫ বছর। এখনো জেলে কার্ড হয়নি। কয়েকবার জেলে কার্ড করাতে চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। টাকা হলে কার্ড হয়, টাকা নেই কার্ড নেই এমন মন্তব্য করেন।
জেলে মাইন উদ্দিন জানান, পরিবারের ১২ জনের জেলে কার্ড জমা দিয়ে মাত্র ৫ জনের নামে চাল বরাদ্দ পান। তিনি আক্ষেপ করেন, বরাদ্দ সবাই না পেলে কীভাবে দুমাস সংসার চালাবেন। স্থানীয় জেলেরা জানান, সরকার যদি শতভাগ জেলেদের চালের সুবিধা দিত। তাহলে চেয়ারম্যান-মেম্বাররা টাকার বাণিজ্য করতে পারত না।
লক্ষ্মীপুরের রামগতি-কমলনগরে প্রায় ৩৬৯০৭ জন নিবন্ধিত ও কার্ডধারী জেলে নদীতে মাছ শিকার করে। পরিসংখ্যানে দেখা যাচ্ছে, রামগতিতে প্রায় নিবন্ধিত ও কার্ডধারী ২৩৯৬৯ জন জেলের মধ্য চাল পাচ্ছে ১২৭৭০ জন। বাকি ১১১৯৯ জন নিবন্ধিত ও কার্ডধারী জেলে পরিবার চাল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে এবং কমলনগরে প্রায় কার্ডধারী নিবন্ধিত ১২৯৩৮ জন জেলের মধ্য চাল পাচ্ছে ৭৫৩৩ জন। বাকি নিবন্ধিত ও কার্ডধারী ৫৪০৫ জন জেলে পরিবার চাল পায়নি।
রামগতি উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জসিম উদ্দিন জানান, নিবন্ধিত ও কার্ডধারী জেলেদের প্রায় অর্ধেক পরিবার চাল থেকে বঞ্চিত। সরকারি ভিজিএফের বরাদ্দের সংকট থাকায় শতভাগ চাল দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
কমলনগর উপজেলা মৎস্য কর্তকর্তা মো. আব্দুল কুদ্দুস জানান, নিবন্ধিত প্রায় অর্ধেকের একটু বেশি জেলে পরিবার ৮০ কেজি করে চাল পাচ্ছে। বাকিদের চাল সহায়তার আওতায় আনতে পারলে নিষেধাজ্ঞা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা যেত।
এ বিষয়ে জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আমিনুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে জানান, সরকারি বরাদ্দ যেভাবে হচ্ছে, সেভাবেই জেলেরা চাল পাচ্ছে। তবে বরাদ্দ শতভাগ হলে কিছু অনিয়ম ও বাণিজ্য রোধ করা যেত। প্রকৃত জেলেরা সুবিধা পুরোপুরি পেত।