এই ফেনার কোনো স্বাক্ষী নাই।
এখানে বাতাসে খুনের মতলব
মাটির শরীর থেকে খুলে গেছে বাকল
গলে গেছে তারাদের বাসী ছায়া
আমি একটা আঙুলের রেখা খুঁজছি
সহস্র ভোরের ফলায় আমি উপুড় হয়ে আছি
এক নীল বরফের বন্দুকের ওপর
লাশের ওমে ঝরে গেছে মাখনের বাঁট
রক্তপিছল নলগুলো হয়ে ওঠেছে
ফেলে আসা স্কুলের অংক খাতার দাগ
আমি এখনো আঙুলের রেখাটি খুঁজে পাইনি
আমি তার নামটি মনে করতে পারছি না
আনাস না আমিনাহ, জয়নাব না এব্রাহিম
আমার কিছুই মনে আসছে না, তবে সে মানুষ ছিল, একজন আস্ত জীবন্ত মানুষ মাথায় চুল ছিল কীনা আমার মনে নেই, আমি তার কনুই বা হাঁটুর ভাঁজ খেয়াল করিনি, চোখের মণি বা থুতনির দাগ কিছুই মনে নাই, তালু বা গোড়ালি কিছুই বলতে পারব না
তবে আমি তাকে দেখেছিলাম
নিতান্তই একজন জীবন্ত মানুষ
এইতো, জীবন্ত মানুষেরা যেমন হয়
লাশের মতো হারিয়ে যায় না
কান্নার উজান উপুড় করে ভাটির পাতালে
তবে মানুষটি লাশ ছিল না, এ নিয়ে দস্তখত দেয়ার মতো প্রমাণ আমার আছে, আমি তার বয়স নিয়ে কিছু বলতে পারব না, দুধদাঁত পড়েছে, না মাসিক শুরু হয়েছে জানি না, সে কি এখনো মায়ের দুধ টানে নাকি লাঠি ভর করে হাঁটে, আমি কী করে বলি?
আমি কেবল তাকে জীবন্ত দেখেছিলাম
জয়তুন ফুলের রেণু মেলে বাতাসের ছায়ায় নেচেছিল, এমনও হতে পারে
তখন সে গভীর ঘুমে
কিংবা রুটির টুকরো ছুঁড়েছিল কোনো পোয়াতি কুকুরের মুখে, কুকুর না বিড়াল আমার মনে নেই
আমি তার থাবার গন্ধ কিংবা নখের আওয়াজ পাইনি, তবে রুটি হাতে আমি একজনকে দৌড়াতে দেখেছি, আধখান রুটি, বাম তলাটা তখনো ভাল করে সেঁকা হয়নি, ময়দার দলার মাঝবরাবর এক ধ্যাবড়ানো আঙুলের দাগ লেগেছিল, ময়ানটি যে মেখেছিল হয়তো গত তিনরাত সে দুঃস্বপ্ন দেখেছে কিংবা পানির দানা মুখে দিতে পারেনি
এমনও হতে পারে পূবের জানালাগুলি সে খোলা রেখেছিল
ঘরের ভেতর ঢুকে পড়েছিল
কোনো দুষমন্ত ফড়িং
আমার স্পষ্ট মনে আছে, সেই ফড়িংয়ের ডানায় রক্তের ছাপ লেগেছিল, মানুষের রক্ত!
কারণ রক্ত ছাড়া আর কোনো ফুল রাখেনি কেউ
পুড়ে যাওয়া তকতকে নাদান হীরের মতো দ্যুতি
আমি তখন কেবল এক বিভ্রম বন্দুকের ওপর দাঁড়িয়েছিলাম, জাদুঘর থেকে ডাকাতি করা রাজার মুকুট দিয়ে আমার চোখ থ্যাৎলে দেয়া হয়েছিল, কানে ঝুলানো হয়েছিল নিযুত কোটি স্বর্ণখন্ড, আমি কিছুই দেখতে পাইনি, আমি কিছুই শুনতে পাইনি
কোনো গন্ধের আওয়াজ পাইনি
জন্মের পর আমার নাক পুড়িয়ে দেয়া হয়
চোখ গুঁড়িয়ে দেয়া হয়
টান মেরে জিব ফালি ফালি করা হয়
আমার এসব কিচ্ছু মনে নেই, আমি নিশ্চিত আমি কোনো ঘোরের ভেতর নাই
কোনো মাতলামি বা পাগলামি
আমি কোনো চাতুরি করিনি
কোনো প্রলাপ বা চিৎকার
আমি কেবল মেয়াদ হারানো এক
বারুদের ভাগাড়ে দাঁড়িয়ে
একটা আঙুলের রেখা খুঁজে চলেছি
পইনানা ডিঙিয়ে পইনানা থেকে আরেক পইনানা, সব পইনানাদের চেয়েও বুড়ো এক জয়তুন গাছ ছিল আমাদের গ্রামের নাইকুন্ডে
আমরা তাকে সিডো বলে ডাকতা, হেলে পড়া শরতে সিডোর আকাশ ভরে যেত জলপাই তারায়, বসন্তের বাতাস ছাড়লে সিডোর কাঁধ, কনুই কী কোলে আমরা ঘুমিয়ে যেতাম।
তায়ির ও নাসর পাখিরা আমাদের উড়িয়ে নিত মরাসাগর কি নীগেভ মরুর কিনারায়, গ্রাম থেকে উপচানো ঝুড়ি নিয়ে দাঁড়াত কৃষক, জাতর ভর্তা দিয়ে টাবু রুটি বা রঙীন ফালাইয়ে দিয়ে মাকলুবের তবে আমরা কোনোদিন এসব খাবার মুখে দিতে পারিনি, ক্ষুধা নিয়েই মরতে হতো আমাদের, ঘুমের ভেতরেই খুন করা হতো একের পর এক শিশু-জল্লাদদের; আমরা তাই ছিলাম, শুনেছি কিছু বাচ্চা নীল রক্ত নিয়ে, দেবশিশু হয়ে জন্মায়,
তাদের নাকি কোনো মৃত্যু নাই
শুনেছি আমরা জল্লাদ, আমাদের রক্ত লাল, আমাদের হত্যার জন্য
পৃথিবীর সবচে সস্তা বন্দুকটি ব্যবহৃত হয়
নিজেদের মৃত্যু
কোনোদিন আমরা চোখে দেখিনি
কীভাবে মানুষ মারা যায় আমরা জানি না
আমাদের গ্রামে আলাদা কোনো কবরস্থান ছিল কীনা আমার মনে নেই
পুরো গ্রামটাই ছিল এক জীবন্ত কবর, তবে কোন গ্রাম থেকে আমরা এসেছি আমার মনে নেই ইসদুদ, কারাতিয়া, নাজলা, ডিমরা, সিমসিম নাকি আল-আতাতরা কিছুই মনে নেই, আমি কখনো জন্ম নিয়েছি কীনা জানিনা, তবে ঘুমের ভেতরেই আমাকে হত্যা করা হয়; আমি কেবল একের পর এক বারুদের গ্রাম সাঁতরে গেছি
একটা আঙুলের রেখার খোঁজে নাছোড়বান্দার মতো।
আমি এসব মানত করিনি কিংবা অঙ্গীকার
ঘামের দোহাই আমায় উসকে দিয়েছে
মাটির কুসুম আমায় ছলকে দিয়েছে
ইতিহাসের দায় নির্দেশ করা আছে
আমি তাই এক রক্তপিছল বরফ তাতানো
বন্দুকের নলের ওপর দাঁড়িয়েছি
এইসব বন্দুক নাকি জুরাসিক যুগেই তাদের খুনের ক্ষমতা হারিয়েছে; এখন কেবল ঘুমন্ত শিশুদের হত্যা ছাড়া আর কোনো জোয়ানি নাই এদের; আমাদের এখানে ঘুমের স্কুল আছে
কীভাবে কত মাপে কি লহমায় ঘুমাতে হয়; আমাদের শিখতে হয়
আমরাই পৃথিবীর সেই সৌভাগ্যবান যাদের ঘুমের ভেতর হত্যা করা হয়
প্রতিবার ঘুমানোর সময় আমরা জানি,
হয়তো এটাই হবে আমার শেষ ঘুম
আঙুলের রেখাটি খোঁজার জন্য কোনো সংঘ আমাদের সঙ্গী হয়নি, কোনো ফিসফাস, কোলাহল বা ক্রন্দন কোনো সভা ডাকেনি
কোনো খন্ড, খিস্তি, খসখস বা খারাবি আমরা করিনি, তবুও আমাদের শরীরের শিরায় আর কোনো বারুদ নাই, রক্তের জলে সব গলেপুড়ে গেছে, আমরা হয়তো তখন রোদের ফণা, চোখের পাতারা কেবল ফুটতে শুরু করেছে;
ডবকানো বালির ঢেউ উল্টেপাল্টে ডানাঅলা এক দরাজ ঘোড়া হাঁটু মুড়ে শুয়ে থাকে কোনো রোল নাই, কোনো রা নাই
আমাদের বহু বংশ গেছে যাদের কেশর পুড়েছে, কানের লতি ভেঙেচুরে গেছে, তাদের কথা আমার মনে নাই, কোনো বংশ, পদবী কী গোত্র কিছুই আর অবশেষ নাই, আমি কেবল
একটা আঙুলের রেখা খুঁজে চলেছি
আমি জানি না
কার আঙুল কিংবা হয়তো আমার আঙুল
বারুদের ময়দান বা বন্দুকের স্তুপ থেকেও
আমি অই রেখাটি চিনতে পারব
অই রেখায় আমার জন্মক্ষত আছে;
লাল কালো, সাদা, সবুজের মায়ায় আমার
জবানবন্দির ছাপ
এই ছাপ ছাড়া আমি আমাকে প্রমাণ করতে পারছি না, আমাকে শনাক্ত করতে পারছি না
কে আছো এমন ক্ষুব্ধ মায়াময়
এক হারানো আঙুলের রেখা খুঁজে পেতে
ধার দেবে রক্তকুসুম?
রচনাকাল: ৩০ নভেম্বর থেকে ১২ ডিসেম্বর ২০২৩
জলবায়ু সম্মেলন, দুবাই, সংযুক্ত আরব আমিরাত