মন্ত্রণালয়ের অনুমতি ছাড়া ও ভূমি অধিগ্রহণের নিয়ম ব্যতি রেখেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অভ্যন্তরে সিটি কর্পোরেশনকে (রাসিক) প্রাচীর তুলতে ও তার পাশে সবুজায়ন করার জন্য জমি দিয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিনোদপুর গেটের পর থেকে কাজলা গেট পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সীমানা প্রাচীর আছে তার থেকে প্রায় ১৫ ফুট ভেতরের দিকে এই প্রাচীর তোলা হচ্ছে। কিন্তু কত কিলোমিটার জায়গা নিয়ে এই প্রাচীর ও সবুজায়ন হবে তা নির্দিষ্ট করে কেউ বলেননি।
সিটি কর্পোরেশন বলছে, বিশ্ববিদ্যালয় তাদের এই জমি দিয়েছে। তবে, বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, জমির মালিকানা বিশ্ববিদ্যালয়েরই থাকবে। সিটি কর্পোরেশন শুধু তাদের অর্থায়নে প্রাচীর ও মেইন গেট তৈরি করে দেবে। এখানে গ্রিনজোন হবে। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
কিন্তু বর্তমান সিন্ডিকেট সদস্যদের একাধিক জন বলছে তারা এই বিষয়ে জানেন না। হয়তো তাদের আগের কমিটি এই বিষয়ে অবগত আছে।
এ নিয়ে গত মেয়াদের সিন্ডিকেট সদস্যদের সাথে যোগাযোগ করা হলে একাধিকজন বলেন, মালিকানা বিশ্ববিদ্যালয়ের রেখে জমি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক গত মেয়াদের এক সিন্ডিকেট সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, এটা নিয়ে আলোচনা হয়েছিল। আমার যতটুকু মনে পড়ে সেখানে এই শর্ত দেওয়া হয়েছিল যে, জমির মালিকানা বিশ্ববিদ্যালয়ই থেকে জায়গা ছেড়ে দেবে। তবে অন্য কোনো দিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কোনোভাবে লাভবান হচ্ছে না। শুধু সিটি কর্পোরেশন তাদের অর্থায়নে প্রাচীর করে দেবে।
তিনি আরও বলেন, এটা নিয়ে একটা কমিটিও করা হয়েছিল। যাতে সিটি কর্পোরেশনের সাথে সবকিছু দেখভাল করা হয়। তবে দুঃখের বিষয় ওই কিমিটির কোনো কাজই হয়নি। আমার জানা মতে, ওই কিমিটির কোনো মিটিংই হয়নি। তবে এরপর আবার নতুন করে কমিটি করে কিছু করা হয়েছে কি না সেটা আমি জানি না।
বিশ্ববিদ্যালয় ও সিটি কর্পোরেশন সূত্রে জানা যায়, মহানগরীর সমন্বিত নগর অবকাঠামো প্রকল্পের আওতায় তালাইমারী মোড় থেকে কাটাখালী বাজার পর্যন্ত অযান্ত্রিক যানবাহন লেনসহ ৬ লেন সড়ক নির্মাণকাজ হচ্ছে। এছাড়াও সড়কটির সৌন্দর্য বর্ধনে ডিভাইডার ও সড়কের উভয় পাশে বৃক্ষরোপণ করা হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, যখন এই রাস্তার কাজ শুরু হয় তখন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে থেকে রাস্তার জন্য জমি চাই সিটি কর্পোরেশন। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের অনুমতি না থাকায় ওই সময় জমি দেয়নি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তাই ছয় লেনের এই রাস্তা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের কাছে এসে চার লেন হয়ে গেছে।
এবার সবুজায়নের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে জমি চাই সিটি কর্পোরেশন। এর জন্য মন্ত্রণালয়ের কাছে চিঠি পাঠায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। তবে মন্ত্রণালয় থেকে কোনো জবাব না আসায় সিন্ডিকেট মিটিং ডাকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। সেখানে সিদ্ধান্ত হয় জমির মালিকানা বিশ্ববিদ্যালয়েরই থাকবে এবং যে প্রাচীর করা হবে তার সামনে সবুজায়ন করবে। যার অর্থায়ন করবে সিটি কর্পোরেশন। এর ভিত্তিতেই সবুজায়নের নাম করে গড়ে ১৫ ফুট করে জমি দিচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান প্রকৌশলী (ভারপ্রাপ্ত) আবুল কালাম আজাদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ক্যাম্পাসের কেউ এটার দেখভাল করছে না। সিটি কর্পোরেশন দেখভাল করছে। আমি আর কিছু বলতে পারবো না। উপাচার্যের সাথে কথা বলেন।’
এ বিষয়ে রাজশাহী সিটি কর্পোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর ইসলাম তুষার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আপনাদের যে প্রকৌশল শাখা আছে তাদের সাথে আমাদের কথা হয়েছে। উনাদের সাথে কথা বলেন ভালো বলতে পারবে। আমাদেরকে উনারাই দিয়েছে। আমরা জানি সিন্ডিকেটে পাশ করা হয়েছে। সব কাগজপত্রের বিষয়ে উনারা ভালো বলতে পারবে। আমাদেরকে ডেকে নিয়ে গিয়ে উনারা আমাদের দিয়েছে। ওখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫/১০ জন শিক্ষকও ছিলো।’
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নব নির্বাচিত এক সিন্ডিকেট সদস্য বলেন, ৫২৮ নম্বর সিন্ডিকেট সভা থেকে আমি এসেছি। এর মধ্যে এটা নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। হয়তোবা আগের সিন্ডিকেটে এটা নিয়ে কথা হয়েছে। তবে এটা সিন্ডিকেট হয়েই যাবে কিনা তা আমার জানা নেই। আমার জানা মতে বিশ্ববিদ্যালয় চাইলেও এটা দিতে পারবে না। মন্ত্রণালয়ের অনুমতি সাপেক্ষে জমি দিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, এটাতো সহজ বিষয় না। আমার মনে হয় না বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো শিক্ষক এই সিদ্ধান্ত মেনে নেবেন। আমাদের কানেও তো আসেনি। বিশ্ববিদ্যালয় তো কারোর একার না তাই না। শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এটা জানলে তো তখন সোচ্চার হবে। আমিতো বিভিন্ন মিটিংয়েই থাকি কখনও তো এটা নিয়ে কোনো আলোচনাও হয়নি।
সার্বিক বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক সুলতান-উল-ইসলাম বলেন, আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে একটা গ্রিনজোন বানাতে চাই। গ্রিনজোনের সামনে রাস্তার পাশে স্টেইনলেসের বেরিকেড দেওয়া হবে। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে যে দেয়ালটা আছে রাস্তা করতে গিয়ে সেটা প্রায় ভেঙে পড়েছে। তাই সিটি কর্পোরেশন সেটা করে দেবে। আর আমাদের যে একটা গ্রিনজোন তৈরি করা দরকার তাই আমাদের জায়গা বের করতে হবে। বিধায় ১০ থেকে ১২ ফিট দূরে প্রাচিরটি সিটি কর্পোরেশন আমাদের করে দেবে। সিন্ডিকেটের সিদ্ধান্ত অনুসারেই এটি করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, সিটি কর্পোরেশন আমাদের কাছে জমি চেয়েছিল। কিন্তু আমরা দেইনি। কারণ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ এক ছটাক জমিও কাউকে দিতে পারে না। যদি মন্ত্রণালয় অনুমতি দেয় অর্থাৎ সরকার অনুমতি দিলেই কেবল সেটি সম্ভব। আমরা মন্ত্রণালয়ে বিষয়টি নিয়ে লিখেছিলাম। আপাতত সেই উত্তর এখনও আসেনি। আমরা তাদের রাস্তা করতে দেব না। আমাদের গ্রিনজোন আমাদের থাকবে।