বর্তমানে বৈশ্বিক তৈরি পোশাক রপ্তানির ৫০ শতাংশ হচ্ছে কৃত্রিম তন্তু বা ম্যান মেড ফাইবারের (এমএমএফ) তৈরি পণ্য। ২০৩০ সালে এমএমএফ পণ্য রপ্তানি মোট রপ্তানির ৬০ শতাংশ ছাড়াবে। তবে বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিতে এমএমএফের হিস্যা এখনো অনেক কম; ৩০ শতাংশের নিচে। অর্থাৎ বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় অনেকটাই পিছিয়ে রয়েছে।
বৈশ্বিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠান প্রাইস ওয়াটার হাউস কুপারসের (পিডব্লিউসি) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। করোনা-পরবর্তী সময়ে ও ২০৩০ সাল নাগাদ বাংলাদেশ থেকে ১০০ বিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি লক্ষ্যের রোডম্যাপ তৈরির অংশ হিসেবে ‘ফ্রম শার্টস টু শোরস : আ ব্লুপ্রিন্ট ফর বাংলাদেশ আরএমজি ইন্ডাস্ট্রি’ শীর্ষক গবেষণাটি করে পিডব্লিউসি।
গতকাল বৃহস্পতিবার উত্তরায় বিজিএমইএ কার্যালয়ে গবেষণা প্রতিবেদনের খসড়া প্রকাশ করা হয়। এতে পিডব্লিউসি বলেছে, বাংলাদেশের প্রতিযোগী দেশগুলোর ক্ষেত্রে কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পণ্য রপ্তানির হার বর্তমানে ৪৪ থেকে ৬২ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। তাই বৈশ্বিক রপ্তানি চাহিদা ধরে রাখতে হলে বাংলাদেশকেও কৃত্রিম তন্তুনির্ভর পোশাক তৈরিতে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।
প্রতিবেদন অনুসারে, ২০১৩ সালে তৈরি পোশাকের বৈশ্বিক রপ্তানি ছিল প্রায় ৭৯৪ বিলিয়ন বা ৭৯ হাজার ৪০০ কোটি ডলার। এর মধ্যে কৃত্রিম তন্তু দিয়ে তৈরি পণ্যের হিস্যা ছিল ৪৬ শতাংশ। ২০২২ সালে বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানি বেড়ে হয় ৯৫৩ বিলিয়ন বা ৯৫ হাজার ৩০০ কোটি ডলার; যেখানে এমএমএফের হিস্যা ছিল ৫০ শতাংশ।
পিডব্লিউসি বলছে, ২০৩০ সালের মধ্যে বৈশ্বিক পোশাক রপ্তানি ১ হাজার ১২১ বিলিয়ন বা ১ লাখ ১২ হাজার ১০০ কোটি ডলার ছাড়াবে। সেখানে কৃত্রিম তন্তুর তৈরি পণ্যের হিস্যা হবে ৬০ শতাংশ।
প্রতিযোগী দেশগুলোর মধ্যে বর্তমানে (২০২২ সালের হিসাব) চীন, ভিয়েতনাম, তুরস্ক ও ইতালি কৃত্রিম তন্তুর পোশাক রপ্তানিতে বাংলাদেশের তুলনায় এগিয়ে রয়েছে। এর মধ্যে মোট পোশাক রপ্তানির বিপরীতে এমএমএফে চীনের হিস্যা ৬২ শতাংশ, ভিয়েতনামের ৫৬ শতাংশ, তুরস্কের ৪৮ শতাংশ ও ইতালির ৪৪ শতাংশ। অন্যদিকে বাংলাদেশের মোট তৈরি পোশাক রপ্তানির ২৭ শতাংশ হচ্ছে কৃত্রিম তন্তুর তৈরি পণ্য।
গতকাল বিজিএমইএ কার্যালয়ে ‘রোডম্যাপ টু রিকভারি’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন উন্মোচন অনুষ্ঠানে সংগঠনটির সভাপতি ফারুক হাসান বলেন, চলমান ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে বৈশ্বিক অর্থনীতি একটি সংকটময় মুহূর্ত অতিক্রম করছে। তবে সম্প্রতি বিশ্বব্যাপী মূল্যস্ফীতি কমে আসায় এবং পোশাকের খুচরা বিক্রিতে কিছুটা গতি সঞ্চার হওয়ায় চলতি জানুয়ারি-মার্চ সময়ে আমাদের রপ্তানিতে ইতিবাচক প্রবৃদ্ধি ফিরে এসেছে। বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকায় রপ্তানি ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। আশার বিষয় হচ্ছে, শিল্পে আমরা নতুন নতুন উদ্যোক্তাদের পদচারণা দেখতে পাচ্ছি।
তিনি বলেন, বিগত বছরগুলোতে বিভিন্ন সময় বিভিন্ন সংকটে আমাদের অনেক কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। তবে একই সময় বেশ কিছু নতুন কারখানা ও নতুন বিনিয়োগ এসেছে। আমরা বিজিএমইএর দায়িত্ব নেওয়ার পর দিন থেকে অর্থাৎ ১৩ এপ্রিল ২০২১ থেকে আজ পর্যন্ত ৩৯৩টি নতুন কারখানা বিজিএমইএর সদস্যপদ গ্রহণ করেছে। শতপ্রতিকূলতার মধ্যে এটি নিঃসন্দেহে একটি বড় অনুপ্রেরণা। রপ্তানি খাতে ভালনারিবিলিটি কাটিয়ে ওঠার জন্য বরাবরই বাজার সম্প্রসারণ ও নতুন বাজার তৈরির ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে আসছি। নতুন বাজারগুলোতে আমাদের রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে, যা বিগত ১৪ বছরে দশগুণ বেড়েছে, অর্থাৎ ৮৪৯ মিলিয়ন ডলার থেকে বেড়ে ৮ দশমিক ৩৭ বিলিয়ন ডলার হয়েছে। চলতি অর্থবছরের আট মাসে নতুন বাজারগুলোতে আমাদের পোশাক রপ্তানি ১০ দশমিক ৮৩ শতাংশ বেড়েছে। বিশেষ করে তুরস্ক, সৌদি আরব, চীন, সংযুক্ত আরব আমিরাত, রাশিয়া, অস্ট্রেলিয়া ও দক্ষিণ কোরিয়ায় ১৭ থেকে ৬৩ শতাংশ পর্যন্ত প্রবৃদ্ধি এসেছে।
বিজিএমইএ সভাপতি আরও বলেন, বর্তমান সংকটময় সময়ে নতুন বাজারে প্রবৃদ্ধি আমাদের রপ্তানিতে কিছুটা হলেও স্বস্তি এনেছে। গত তিনটি বছর আমরা বাজার সম্প্রসারণে বাংলাদেশ অ্যাপারেল সামিট আয়োজনসহ নানা পদক্ষেপ নিয়েছি। এর পাশাপাশি কৌশলগত কারণে ভার্চুয়াল মার্কেটে আমাদের উপস্থিতি বাড়াতে আমরা একটি গবেষণা কাজ সম্পন্ন করেছি।