ছাত্র সংসদ ফিরে আসুক

আবারও উত্তপ্ত দেশের অন্যতম শীর্ষ বিদ্যাপীঠ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়। প্রতিষ্ঠানটির জন্ম পাকিস্তান সৃষ্টির আগে। শুরুতে নাম ছিল আহসানুল্লাহ ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। পরবর্তী সময়ে আজকের বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়-বুয়েট। এখান থেকে ডিগ্রি লাভ করা মানুষরা ছড়িয়ে পড়েছে বিশ্বের নানা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এই বিশ্ববিদ্যালয়টিতেই বারবার গড়ে উঠছে ছাত্ররাজনীতিবিরোধী আন্দোলন। বিশেষ করে বর্তমান সরকারের আমলে ছাত্রলীগের একচ্ছত্র দখলদারিত্ব এবং রাজনীতি করার অধিকারের ফলে এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আবরার হত্যাকাণ্ডের কথা নিশ্চয়ই মনে আছে।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ নেতারা অনেকটা ‘মজার ছলে’ সারা রাত ধরে পিটিয়ে পিটিয়ে মেধাবী আবরারকে হত্যা করেছিল। কেঁপে উঠেছিল গোটা দেশ। কেবল বুয়েট নয়, দখলদারিত্বের রাজনীতির ভয়াবহ চিত্র সব বিশ্ববিদ্যালয়ে। আবরার হত্যায় অভিযুক্তরা গ্রেপ্তার হয়েছেন। অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে। বিচারের প্রাথমিক পর্ব সমাপ্তও হয়েছে। অভিযুক্ত সবাই ছাত্রলীগের নেতৃস্থানীয়। বিচারিক আদালত কর্র্তৃক সর্বোচ্চ দণ্ডপ্রাপ্ত।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্রদের ইউনিয়ন করার অধিকার সারা পৃথিবীতেই স্বীকৃত। বিশ্বের বিখ্যাত বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র সংসদ রয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্র্তৃপক্ষ ও শিক্ষার্থীরা ছাত্র সংসদ গঠনের ব্যাপারে আন্তরিক। তবে তা কখনোই সরাসরি আমাদের দেশের মতো রাজনৈতিক দলের অঙ্গসংগঠন নয়। শিক্ষার্থীরা নিয়মিতভাবে তাদের সংরক্ষিত অধিকার বাস্তবায়ন করে। আমাদের এই ভূখণ্ডের ছাত্রদের দ্বারা সংঘটিত আন্দোলনের ইতিহাস বলে শেষ করা যাবে না। মোটা দাগে শুরুটা ভাষা আন্দোলন থেকে। বঙ্গবন্ধুর নাম উঠে আসে সেই আন্দোলনের সক্রিয় অংশগ্রহণকারী হিসেবে।

ছাত্র আন্দোলন ও রাজনীতির সব গৌরব ও ঐতিহ্য মøান করে দিয়ে গত তিন দশক ধরে বাংলাদেশের ছাত্ররাজনীতিতে একটি ধারাই স্বীকৃতি লাভ করেছে। সেটা হচ্ছে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের একচ্ছত্র দখলদারিত্ব। যদিও এই ধারার শুরু হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনের পতনের পরপরই। সামরিক শাসক এরশাদ তার সময়কালে নানা ধরনের নিয়ন্ত্রিত গণতন্ত্রের চেষ্টা করেছিলেন। তার আমলে জাতীয় সংসদের দুটি নির্বাচন হয়েছিল। একটি ১৯৮৬ সালে অপরটি ১৯৮৮ সালে।

১৯৮৮ সালের সেই নির্বাচন বর্জিত হয়েছিল দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল কর্র্তৃক। এরপরই ১৯৮৯ সাল থেকে শুরু হয়েছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কেন্দ্রিক রাজনীতির। কেন্দ্রীয় সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের এরশাদবিরোধী আন্দোলনের সেই ঐতিহাসিক ঘটনার কথা হয়তো এখন ফিকে হয়ে এসেছে। কিন্তু ইতিহাসের ওই ঘটনাকে আমরা বলে থাকি বাংলাদেশের এই ভূখণ্ডের দ্বিতীয় গণঅভ্যুত্থান। যার নেতৃত্ব দিয়েছিলেন সেই সময়কার ছাত্র সংগঠনের নেতৃবৃন্দ। যাদের অনেকেই আজ দেশের রাজনৈতিক দলের অন্যতম নেতা। যতদূর মনে পড়ে এরশাদ পতনের আগেই সর্বশেষ ছাত্র সংসদ নির্বাচিত হয়েছিল রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে। এরপর থেকেই অদৃশ্য কারণে বিশ্ববিদ্যালয়সহ সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদ নির্বাচন স্থগিত হয়ে যায়। যদিও অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে, নানান আলোচনা-সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের নির্দেশে ২০১৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) নির্বাচন হলেও সার্বিক পরিস্থিতি ও ওই নির্বাচনের পূর্বাপর বিবেচনায় নিয়ে সেটিকে ধর্তব্যে আনছি না। ওই নির্বাচনের পর ডাকসুর মেয়াদ শেষ হলেও আর নির্বাচন নিয়ে আলোচনাও নেই, হওয়ার সম্ভাবনাও নেই। ফলে ২০১৯-এর ডাকসু নির্বাচনটিকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা বলে ধরে নিতে হচ্ছে।

রাজনৈতিক দলের জীবিত নেতৃবৃন্দ অনেকেই তাদের অতীত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ঐতিহ্য তুলে ধরেন নানাভাবে, কখনো কখনো জাতীয় সংসদেও তারা এ নিয়ে গর্বভরে বক্তব্য রাখেন ভাষা আন্দোলন কিংবা ১৯৬২ শিক্ষা আন্দোলন কিংবা ১৯৬৯-এর গণআন্দোলনের গল্প কথার মাধ্যমে। আজকের দিনে সবাই না হলেও অনেকেই হয়তো ভুলে গেছেন যে, এ দেশের স্বাধীনতা আন্দোলন সূচিত হয়েছিল সেই ’৬৯-এর গণআন্দোলনের মাধ্যমে, যার নায়ক ছিল এ দেশের ছাত্রসমাজ। আজ জীবিত যে কয়েকজন নেতার নাম আমরা করতে পারি তাদের মধ্যে অন্যতম তোফায়েল আহমেদ। যিনি সেই সময়ে ডাকসু নেতা ছিলেন। তার পরবর্তী অনুসারী ছিলেন আ স ম আব্দুর রব। আমরা কখনো দেখিনি এই বিশিষ্টজনরা কখনো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচনের পক্ষে কোনো জোড়ালো মত দিয়েছেন। অসংখ্যবার, প্রায় প্রতি সংসদে তারা শিক্ষাসংক্রান্ত নানান বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, কিন্তু কখনোই বিশ্ববিদ্যালয়ের কিংবা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ছাত্র সংসদের নির্বাচনের বিষয়ে কোনো মত প্রদান করেননি বলেই জানা যায়। কেন সেই ১৯৯১ সাল থেকে ছাত্র সংসদের নির্বাচন অঘোষিতভাবে নিষিদ্ধ হলো তা আজও আমরা জানি না। ছাত্র সংসদ নির্বাচনে ছিল সুস্থ রাজনৈতিক বিকাশের প্রথম সোপান। এরশাদের পতনের পরে সরকার কেন বন্ধ করেছিল সেই ছাত্র সংসদ নির্বাচন কিংবা তার পরবর্তীকালের কোনো বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন নিয়ে ভেবেছে বলে জানা যায়নি। ফলে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠন দখলদারিত্বের মাধ্যমে একছত্র ক্ষমতা লাভ করে। যার পরিণতি হচ্ছে বুয়েটের ছাত্র আবরার হত্যাকাণ্ড।

অন্যদিকে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যৌন হয়রানির খবর নিয়ে আলোচনায় আসছে নিয়মিত বিরতিতে। ছাত্র-শিক্ষক মিলিতভাবে নারী ছাত্রীদের ওপর যৌন হয়রানি চালাচ্ছেন তার প্রমাণ উঠে এসেছে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। গণতন্ত্রের বিকাশ ও সুস্থ রাজনীতির বিকাশের স্বার্থেই ছাত্র সংসদ নির্বাচন ফিরিয়ে আনা দরকার। যে ছাত্ররাজনীতি আমরা এখন দেখছি অর্থাৎ দলীয় আনুগত্যের ছাত্ররাজনীতি তা অতীতেও ছিল, তবে এতটা ভয়ংকর রূপে নয়। আমরা মনে করতে পারি সেই মোনেম খান বিরোধী আন্দোলনের সময় এনএসএফ নামক একটি ছাত্র সংগঠন প্রকাশ্যেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ সারা দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভিন্ন মতের ছাত্র সংগঠনের সদস্যদের ওপর আক্রমণ করত। যা এখন হলের সিট থেকে শুরু করে ভর্তি পরীক্ষা হলের কক্ষ বরাদ্দ পর্যন্ত সর্বত্র। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রেও দলীয় আনুগত্যকেই প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে। আমরা একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবাদ জানি, যেখানে একাডেমিক সাফল্যের জন্য স্বর্ণপদক অর্জন করেও একজন সেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হতে পারেননি, কেবলমাত্র দলীয় পরিচয় না থাকায়। দলীয় সমর্থক হিসেবে শিক্ষক হওয়ার সর্বশেষ নিদর্শন হয়েছে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় একজন শিক্ষককে পাঁচ বছরের জন্য বরখাস্ত করা হয়েছে। যিনি কিনা ক্লাসের সব ছাত্রীদের হিজাব খুলতে বাধ্য করেছিলেন। আবার এর পাশাপাশি দেখি মুখমণ্ডল আচ্ছাদন করে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নেওয়া কিংবা বিভাগীয় পরীক্ষায় অংশ নেওয়াও একটি সংকট সৃষ্টি করেছে।

সবকিছুই হচ্ছে সুষ্ঠু ছাত্ররাজনীতির অভাবে। সুস্থ ছাত্ররাজনীতি অথবা ছাত্র সংসদ অব্যাহত থাকলে এ ধরনের ঘটনার আমরা শিকার হতাম না। এবারকার জাতীয় সংসদের নির্বাচনে বলা চলে, এক দলেরই অনুগামীরা নির্বাচিত হয়েছেন। আমাদের এই জাতীয় সংসদের সদস্যদের কেউ স্বতন্ত্র হিসেবে কেউ দলীয় প্রতীকে নির্বাচিত হলেও, তারা আসলে একই রাজনৈতিক দলের। এই জাতীয় সংসদ সুশাসন কিংবা স্থায়ী উন্নয়নের স্বার্থে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে তা বোঝা কঠিন। অলিখিতভাবে একদলীয় শাসন কায়েম হয়েছে বর্তমান সংসদের নির্বাচনে। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের শাসনের বিরুদ্ধে যে গণতান্ত্রিক আন্দোলন সূচিত হয়েছিল তারই পরিণাম আজকের বাংলাদেশ। বাংলাদেশের জন্মের ভেতর থেকেই অবিসংবাদিত নেতা হিসেবে বঙ্গবন্ধু স্বীকৃতি পেয়েছেন। কিন্তু সেই দেশের আজ একি পরিণাম!

বুয়েটের সংকট চলাকালেই জানতে পারা গেল ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের সহযোগী ছাত্র সংগঠন আদালতের দ্বারস্থ হয়েছে ছাত্ররাজনীতির বৈধতা চেয়ে। অতি সম্প্রতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ছুটির বিষয়ে আদালতের নির্দেশনা আমরা দেখেছি। এ ক্ষেত্রেও আদালত জানিয়েছেন সেখানে ছাত্ররাজনীতির বিষয়ে কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই। হয়তো উচ্চ আদালতের এই পদক্ষেপে সেখানে শিক্ষার্থীদের বৃহৎ অংশের চাওয়া উপেক্ষিত হবে। তারা সেখানে ছাত্ররাজনীতি চায় না। তবে আদালতের এই নির্দেশনাটি যদি এমন হয় যে, দেশের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সব কটি ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান করা হোক তাহলে অবশ্যই আদালতের প্রতি আমাদের কৃতজ্ঞতা বৃদ্ধি পাবে।

লেখক: রাজনীতি বিশ্লেষক, কলামিস্ট