মেরূকরণের চেনা পথে বিজেপি

ভারতের লোকসভা নির্বাচন সামনে রেখে ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) শীর্ষ স্তরের নেতাদের কণ্ঠে যেসব বক্তব্য-বিবৃতি শোনা যাচ্ছে, তাতে বিভাজনের পুরনো কৌশলের ছায়া ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে জম্মু-কাশ্মীর ইস্যু, ইশতেহার কিংবা বিরোধী জোটের ভোটকৌশল নিয়ে বিজেপি নেতাদের কথাবার্তায় হিন্দু-মুসলিম বিভাজনের আওয়াজ শাণিত হচ্ছে। খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি তো কংগ্রেসের নির্বাচনী ইশতেহারে মুসলিম লিগের ‘ছাপ’ দেখতে পেলেন। আবার কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের কথাকে ‘টুকরে টুকরে গ্যাংয়ের (ভারত ভাঙার চক্রান্তকারীদের বোঝাতে বিজেপি ও সমমনারা এই শব্দ ব্যবহার করে)’ অবস্থানের সঙ্গে তুলনা করলেন।

প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির মতে, ‘স্বাধীনতা আন্দোলনের সময় যে কংগ্রেস ছিল, তা এক দশক আগেই খতম হয়ে গেছে।’ গত শনিবার উত্তর প্রদেশের সাহারানপুরে একটি নির্বাচনী জনসভায় প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, ‘কংগ্রেসের সঙ্গে অনেক বড় ব্যক্তিত্ব যুক্ত ছিলেন। মহাত্মা গান্ধীর নাম কংগ্রেসের সঙ্গে যুক্ত ছিল। আজ কংগ্রেসের সঙ্গে যাঁরা যুক্ত, তাদের না দেশের স্বার্থে নীতি আছে, না দেশের উন্নয়নের জন্য দৃষ্টিভঙ্গি।’

সম্প্রতি প্রকাশ করা হয়েছে কংগ্রেসের ইশতেহার। এ নিয়ে মোদির অভিযোগ, ‘স্বাধীনতা আন্দোলনের সময়ে মুসলিম লিগ যেসব দাবিদাওয়া তুলেছিল, এই ইশতেহারে তেমন সুরই শুনতে পাওয়া যাচ্ছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কংগ্রেসের ইশতেহারে কমিউনিস্ট এবং বামপন্থিদের চিন্তাধারার প্রতিফলনও ঘটেছে।’

এদিকে ভারতের উত্তর-পূর্বে বিজেপির সবচেয়ে প্রভাবশালী নেতা হিমন্ত বিশ^শর্মা তো কংগ্রেসের ইশতেহার নিয়ে একধাপ আগ্রাসী মন্তব্য করেছেন। আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা বলেন, ‘ভারত নয়, পাকিস্তানের জন্য ইশতেহার বানিয়েছে কংগ্রেস।’

কংগ্রেসের ইশতেহারে তিন তালাক প্রথা ফিরিয়ে অঙ্গীকারকে কটাক্ষ করে গত শনিবার হিমন্ত আরও বলেন, ‘এটা তোষণের রাজনীতি।’

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদি রাজস্থানে একটি নির্বাচনী সমাবেশে গিয়ে জম্মু ও কাশ্মীরের বিশেষ মর্যাদার ৩৭০ অনুচ্ছেদ বাতিলের বিষয়ে বক্তব্য দেন। এ নিয়ে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে প্রশ্ন তোলেন, ‘রাজস্থানে এসে জম্মু ও কাশ্মীরের বিষয়ে কথা বলার কী প্রাসঙ্গিকতা রয়েছে।’

ওই প্রশ্ন লুফে নিয়ে লাগাতার আক্রমণ করে যাচ্ছে বিজেপি। ধর্মীয় মেরূকরণের সঙ্গে জাতীয়তাবাদী ভাবাবেগের মিশেলে আগ্রাসী জবাব দিচ্ছে বিজেপি। প্রধানমন্ত্রী মোদিও এর জবাব দিতে গিয়ে খাড়গেকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। বিহারের নয়াডায় একটি নির্বাচনী সভায় গতকাল মোদি বলেন, ‘আমি এ কথা শুনে লজ্জিত হয়েছি। জম্মু ও কাশ্মীর কি ভারতের অংশ নয় তাহলে?’ এর পরই তিনি আরও কড়া ভাষায় খাড়গের বক্তব্য টুকরে টুকরে গ্যাংয়ের ভাষা বলে আখ্যা দেন।

উল্লেখ্য, ‘টুকরে টুকরে গ্যাং’ দ্বারা বিজেপি ভারত ভাঙার ষড়যন্ত্রকারীদের বুঝিয়ে থাকে। ভারতের যেকোনো গণতান্ত্রিক আন্দোলনে বাম-প্রগতিশীল শক্তিকে বিজেপি নিজেদের স্বার্থবিরোধী মনে করলে এই শব্দবন্ধ দ্বারাই আক্রমণ করে থাকে।

১৯ এপ্রিল লোকসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। এর ঠিক দুদিন আগে ১৭ এপ্রিল রামনবমী। একে সামনে রেখে মেরূকরণের চূড়ান্ত রাস্তায় হাঁটতে চলেছে বিজেপি। দেশজুড়ে রামমন্দির ঘিরে আবেগ আবারও উসকে দিতে চাইছে বিজেপি। নির্বাচনী জনসভায় কংগ্রেসকে অযোধ্যায় রামমন্দির উদ্বোধনের দিনে উপস্থিত না থাকার জন্য বিঁধছেন প্রধানমন্ত্রী। একটি জনসভায় তিনি কংগ্রেসকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে বলেছেন, ‘রামনবমী আসছে। গোটা দেশের মানুষ উদযাপন করবে। দেখব আপনারা কত বিরোধিতা করতে পারেন?’

বিজেপি সূত্র বলছে, রামনবমীকে ঘিরে রামমন্দির উদ্বোধনের স্মৃতি টেনে আনা হবে। অযোধ্যায় এই প্রথম রামমন্দিরে ভক্তরা রামলালার মূর্তি দর্শন করবেন।  বিজেপি নেতৃত্ব গোটা দেশে রামনবমীকে ঘিরে উৎসবে যোগ দেবেন।