লেট দেয়ার বি লাইট যেমন আছে, তেমনই থাকতে হবে

মুক্তিযুদ্ধের দু’বছর পর ঋত্বিক ঘটক যখন তিতাস একটি নদীর নাম শুটিং করতে ঢাকা এলেন তখন তাকে প্রস্তাব দেওয়া হলো, জহির রায়হানের অসমাপ্ত ছবি লেট দেয়ার বি লাইট শেষ করার জন্য। সৈয়দ হাসান ইমাম তার আত্মজীবনী আকাশ আমায় ভরলো আলোয় বইতে লিখেছেন, শুটিংয়ের কিছু রাশও তারা ঋত্বিক দা-কে দেখিয়েছিলেন। ঋত্বিক দা রাশ দেখে আমাকে টেলিফোন করেন। তিনি তখন ঢাকার গ্রিন হোটেলে থাকতেন। আমাকে ডেকে পাঠালেন সেখানে। যাওয়ার পর তিনি আমাকে বলেছিলেন-আমি গতকাল লেট দেয়ার বি লাইট-এর রাশ দেখেছি। তাদের আমি অনুরোধ করেছি, এটাকে এভাবেই রেখে দিতে। আমি যদি এটাকে নিয়ে কাজ করি, তাহলে এটি আমার ছবি হবে, জহিরের ছবি হবে না। 

হাসান ইমাম নিজের মতটাও বলছেন, 'ঋত্বিক দা’র সেদিনের সেই কথাগুলো অত্যন্ত যৌক্তিক। কেননা, জহির কীভাবে ছবিটি নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন, কীভাবে তাঁর ভাবনা সাজিয়েছিলেন, সম্পাদনার কী ধরনের চিন্তা তাঁর ছিল- এসব কিছুই তো আমরা জানতাম না। আর জানলেও সৃষ্টিশীল চিন্তার কোনো হস্তান্তর যেমন সম্ভব নয়, তেমনি পুনর্জন্মও সম্ভব নয়।'

পক্ষকাল আগে একটি জাতীয় দৈনিকে মকফুল হোসেন লেট দেয়ার বি লাইট নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছেন যার সার কথা হলো, ছবিটি শেষ করা দরকার। প্রতিবেদনে জহির রায়হানের দ্বিতীয় স্ত্রী কোহিনূর সুচন্দা ও লেট দেয়ার বি লাইটের মুখ্য নারী চরিত্রে অভিনয় করা ববিতার সাক্ষাৎকারও আছে। দুজনই জানিয়েছেন, এ ছবির কোন লিখিত চিত্রনাট্য ছিল না। এ তথ্য নতুন না। হাসান ইমামের মত এদেশের চলচ্চিত্র অনুরাগী সবাই এ কথা জানেন। জহির রায়হানের একটি উপন্যাসিকা হলো আর কত দিন। লেট দেয়ার বি লাইটের ভাবনার ভিত্তি হলো এই আর কত দিন। এটি একটি রাজনৈতিক লেখা। 

লেট দেয়ার বি লাইটও ছিল একটি সম্পূর্ণ রাজনৈতিক চলচ্চিত্র। জহির রায়হানের স্বপ্নের চলচ্চিত্র। জহির রায়হানের রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে সাধারণত আলোচনা হয় না। খেয়াল করতে হবে, মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্মিত ছবি স্টপ জেনোসাইডের সাউন্ড ট্রেকে তিনি ব্যবহার করেছিলেন কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের সংগীত। তিনি যে মার্কস ইজম এবং লেনিনের মতাদর্শে আস্থা রাখতেন তা তাঁর সমকালের সবাই জানতেন। স্টপ জেনোসাইডে কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনাল ব্যবহারের মধ্য দিয়ে তিনি কী তাঁর রাজনৈতিক মত তুলে ধরলেন না? অর্থাৎ স্বাধীন বাংলাদেশ হবে শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজতান্ত্রিক দেশ। স্টপ জেনোসাইডের বছর দেড়েক আগে তোলা হয়েছিল লেট দেয়ার বি লাইট এবং এ ছবিতে যে তিনি তাঁর রাজনৈতিক মতকে সরাসরি উন্মোচন করতে চেয়েছিলেন এতে আমার কোন সন্দেহ নেই। এখন যিনি ছবিটি শেষ করবেন তার রাজনৈতিক মতাদর্শ কি জহির রায়হানীয়? 

জহির রায়হানের রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে স্বাধীন চলচ্চিত্র হতে পারে। কিন্তু তাঁরই শিল্পকর্মের ওপর কারিকুরির ভাবনা কেন? অর্ধশত বছর আগে তোলা লেট দেয়ার বি লাইটের সময়ের সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন নেই। কিউবা ছাড়া লাতিন আমেরিকার কোথাও সমাজতন্ত্র নেই। ভিয়েতনাম এখন একটি উন্নত পুঁজিবাদী রাষ্ট্রের মডেল। ঔপনিবেশিক সাম্রাজ্যবাদের চেহারা বদলে গেছে। সমাজতান্ত্রিক চীন এখন নিজেই একটি পুঁজিবাদী রাষ্ট্র। 
লেনিন-মার্কস এখনো শতভাগ প্রাসঙ্গিক কিন্তু গত শতকের ষাটের দশকের মত করে কি ? জহির রায়হান আজ বেঁচে থাকলে কি লেট দেয়ার বি লাইটে একই চলচ্চিত্র ভাষা ব্যবহার করতেন? নাকি ছবিটা বানাতেনই না?
নাকি ছবিটা শেষ করা হবে সে সময়ের আলোকেই! ৫৫ বছর আগে নির্মিত একটি অসমাপ্ত রাজনৈতিক ছবি কি সে সময়ের আলোকে শেষ করা যায় যখন বিশ্ব বদলে গেছে, ইতিহাসের নতুন দৃষ্টিভঙ্গি এসেছে? আজকের পৃথিবীর যিনিই এ ছবি শেষ করতে যাবেন, ঋত্বিক ঘটকের কথায় তা হয়ে উঠবে তার নিজের ছবি, জহির রায়হানের লেট দেয়ার বি লাইট আর অক্ষুণ্ন থাকবে না। মনে রাখতে হবে লেট দেয়ার বি লাইট কাচের দেয়াল বা জীবন থেকে নেওয়ার মত গল্পবলা ফরম্যাটের ছবি নয়। এর নিজস্ব আঙ্গিক রয়েছে। এই আঙ্গিক বা চলচ্চিত্রভাষা সম্পূর্ণ জহির রায়হানের একক মস্তিষ্কের আয়োজন। এ ছবির লিখিত চিত্রনাট্য থাকলেও এই অসমাপ্ত মাস্টারপিসে আর কারও হাত দেওয়ার পক্ষে আমি নই। 

তাহলে কি এমন একটি শিল্পকর্ম সাধারণ মানুষের জন্য প্রদর্শিত হবে না? অবশ্যই হবে। এবং হয়েছেও। ছবির রাশ প্রিন্ট যেভাবে আছে সেভাবেই প্রদর্শিত হতে হবে। গত শতকের নব্বইয়ের দশকেই তৎকালীন ফিল্ম সোসাইটিগুলোর কল্যাণে আমি ছবিটির রাশ প্রিন্ট দেখেছি। সে সময়ের অনেক দর্শকও দেখেছেন। বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ কয়েক বছর আগে জহির রায়হানের পরিবারের কোন মতামত না নিয়ে লেট দেয়ার বি লাইটের রাশ প্রিন্টের একটি লাইনআপ করে। 

হাসান ইমাম যেমন লিখেছেন, ‘আমাদের ফিল্ম আর্কাইভ এই ছবিটির একটি সংস্করণ করেছে, যেটা আমার একেবারেই ভালো লাগেনি। যে কাজটি ঋত্বিক দা করলেন না, কেন করলেন না-সেটাও বুঝিয়ে দিলেন; সেটাই আর্কাইভ করল। ফলে ছবিটি আর জহিরের রইল না। যিনি কাজটি করেছেন , এটি তার ছবি হয়ে গেল”- এডিট করা লাইনআপ দেখে আমারও একই বিবমিষা হয়েছে। জহির রায়হানের মত সৃজনশীল একজন পরিচালকের এমন একটি মাস্টারপিসের এনজি বা বাতিল শট কি টেক নম্বর দিয়ে নির্ধারণ করা যায়?  দৈনিকটির প্রতিবেদনে ছবিটির ডাবিং এবং এডিটিং করে প্রদর্শন করার প্রস্তাবও এসেছে। অদ্ভুত প্রস্তাব! লিখিত সংলাপ কোথায় যে ডাবিং হবে? আমি এর সঙ্গেও একদম একমত নই। চরিত্রেরা কি টোনে কথা বলবেন, শটের কোন জায়গায় কেটে পরের শটে যাওয়া হবে- এসবই গোটা ফিল্মটার নন্দনতত্ত্বের অংশ। আর এই শিল্পভাবনা একমাত্র জহির রায়হানের মস্তিষ্কেই ছিল। লেট দেয়ার বি লাইটের আংশিক কিংবা সম্পূর্ণ সমাপ্ত করার উদ্যোগ নেওয়ার অর্থ হলো এমন একজন মেধাবী বাঙালি চলচ্চিত্রকারের অসামান্য কাজটির ঐতিহাসিক মূল্য বিনষ্ট করার প্রয়াস। 

ছবিটির রাশ প্রিন্ট যেভাবে আছে সেভাবেই রেখে দেওয়া হোক। বাতিল শটসহ এই রাশ প্রিন্ট চলচ্চিত্র গবেষক ও আগামীর ছাত্রছাত্রীদের জন্য মহা মূল্যবান বিষয় হবে। সাধারণ দর্শকের সামনে প্রদর্শনের জন্য এর একটি সংস্করণ হতে পারে। তবে এ ক্ষেত্রে আর্কাইভের কর্ম প্রক্রিয়া বদলাতে হবে। জহির রায়হানের পরিবারসহ, জহির রায়হানের রাজনৈতিক আদর্শে আস্থা রাখেন এমন চলচ্চিত্র কুশীলবদের সমন্বয়ে এর একটি সম্পাদিত সংস্করণ করা যেতে পারে। তবে মনে রাখতে হবে, এটাও  রাশ প্রিন্টই হবে। অন্য পরিচালক বা পরিচালক কমিটির হস্তে নয়া লেট দেয়ার বি লাইট নয়।

লেখক: শহীদ চলচ্চিত্রকার ও সাহিত্যিক জহির রায়হানের সন্তান