রূপকথা ম্লান আলোনসোর আলোয়

সৈয়দ মুজতবা আলীর গল্পটা প্রায় সবারই জানা। এক জার্মান বৃদ্ধাকে উনি গেছেন ছেলের মৃত্যুসংবাদ জানাতে। খবরটা জেনে বৃদ্ধার চোখের এক কোণে পানি চলে এলো। অথচ কী আশ্চর্য, উনি তাড়াতাড়ি চোখ মুছে বললেন, ওনার চোখের গ্ল্যান্ডে জানি কী সমস্যা হয়েছে হুটহাট পানি চলে আসে। মুজতবা বুঝলেন, এ হলো জর্মন জাত! পুত্রশোকে কান্নাকেও বিজ্ঞান দিয়ে ব্যাখ্যা দেবে।

গতকাল ফুটবল মাঠের এক অভাবনীয় দৃশ্য দেখে এহেন ‘যান্ত্রিক’ জার্মানদের সমন্ধে না জানি কী ভাবতেন বাংলা সাহিত্যের দিকপাল! নর্থ রাইন ওয়েস্টেফেলিয়ার লেভারকুসেন শহরের বে অ্যারেনার মাঠটা লাল আনন্দে বুঁদ হয়ে গেল। একটা ফুটবল খেলার শেষ বাঁশি বাজতে না বাজতেই ৩০ হাজার লোক পাগলের মতো মাঠে ঢুকে উদ্দাম আনন্দে মেতে উঠল। আনন্দ অশ্রুতে এক অকল্পনীয় দৃশ্যকল্পের জন্ম হলো। 
মুজতবা হয়তো ওনার গুরু রবীন্দ্রনাথের মতো এদের পাগলপারা আনন্দে দেখে নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের মতো আউড়াতেন-

না জানি কেন রে এত দিন পরে জাগিয়া উঠিল প্রাণ।
জাগিয়া উঠেছে প্রাণ,
ওরে    উথলি উঠেছে বারি,
ওরে    প্রাণের বাসনা প্রাণের আবেগ রুধিয়া রাখিতে নারি।

এই থরো থরো আবেগ যে প্রায় ১২০ বছর চেপে রাখা অপ্রাপ্তির! সেই কারণে ফ্লোরিয়ান উইর্টজ যখন নিজের হ্যাটট্রিক পূরণ করে ৯০ মিনিটে ভের্ডার ব্রেমেনের সঙ্গে ৫-০ করে ফেললেন, দর্শকরা আর স্থির বসে থাকতে পারেনি। ক্লাবের পতাকা, টিফো, ব্যানার আর অগণিত লাল স্প্রে নিয়ে মাঠে নেমে গেল। 

বায়ার এজি নামের এক বহুজাতিক ফার্মাসিউটিক্যাল কোম্পানি বায়ার লেভারকুসেন ক্লাবটি গড়ে তুলেছিল সেই ১৯০৭ সালে। আর ২০২৪ সালে বাংলা নববর্ষের দিন এসে ক্লাবটি প্রথমবারের মতো জিতল জার্মানির শীর্ষ লিগ বুন্দেসলিগার শিরোপা। 

১২০ বছরের অপেক্ষা ফুরোবার পর লেভারকুসেন ভক্তদের উল্লাস

শিরোপা না জেতার কারণে যাদের নামই হয়ে গিয়েছিল নেভারকুসেন। সেই ২০০২ সালে একবার সব জয়ের দ্বারপ্রান্তে চলে গিয়েছিল ক্লাবটা। অথচ ইউসিএলের ফাইনালে হারল রিয়াল মাদ্রিদের কাছে, লিগ কাপের ফাইনালে শালকে ০-৪-এর বিপক্ষে আর লিগের শেষ তিন ম্যাচের দুটিতেই হেরে পাঁচ পয়েন্টের লিড খুইয়ে শিরোপা বিসর্জন দিল ডর্টমুন্ডকে। এর দুই বছর আগে লিগের শেষ ম্যাচে যেখানে ড্র করলেই চলত, সেখানে ২-০ গোলে হারে আর শিরোপা জিতে নেয় বায়ার্ন মিউনিখ।

সেই বায়ার্ন, যারা গত ১১ বছর বুন্দেসলিগাকে নিজের সম্পদ বানিয়ে ফেলেছিল। কতবার কতজন কাছে এলো কিন্তু শেষতক জিত হয় বায়ার্নেরই। নেভারকুসেন যতই ভালো খেলুক তারা যে পারবে না- এটাই প্রায় সবাই ধরে নিয়েছিল। আর সেই সব বাধা লিগের পাঁচ ম্যাচ হাতে রেখে অতিক্রম করে জেতায় পাগল করে তুলেছে জার্মানির অন্যতম পারিবারিক ক্লাব বেয়ার লেভারকুসেনকে। অন্য ক্লাবের মতো শ্রমিক শ্রেণিভিত্তিক সমর্থন কম বলে যাদের প্রায়ই ‘প্লাস্টিক’ (ফার্মাসিউটিক্যালদের ক্লাব বলেও) টিপ্পনী শুনতে হয় তারাই গোটা দুনিয়াকে দেখাল আবেগের ফল্গুধারা কী জিনিস! কীভাবে এই আধুনিক যুগে এসেও টেলিভিশন-সর্বস্ব ফুটবলের আমলেও একসঙ্গে নেচে-গেয়ে, কান্না করে উৎসব করতে হয় আবেগের সর্বোচ্চ ঢেউয়ের চাপে।

আর এই দুরন্ত যাত্রার কাণ্ডারি একজন লিকলিকে কাপ্তান জাবি আলোনসো। খেলোয়াড়ি জীবনে প্রায় সব জেতা, দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত এই খেলোয়াড় অল্পদিন কোচিং করিয়েই প্রমাণ রাখছেন তিনি খেলাটার একজন গ্র্যান্ডমাস্টার।

বে অ্যারেনা- লেভারকুসেনের মাঠ

 

আলোনসোর কৌশল 

নিজে মিডফিল্ডার ছিলেন বলেই কিনা, তার দর্শনের কেন্দ্র হচ্ছে, যদি তুমি মিডফিল্ড দখলে রাখতে পারো, তবেই তোমার খেলায় জেতার সুযোগ বেড়ে যাবে। তবে, এই দর্শনের প্রয়োগটাতে তিনি দেখালেন দুর্দান্ত চমক। তার পছন্দের ফরম্যাট ৩-৪-২-১। তিনজন ডিফেন্ডারের সামনে দুজন ডিফেন্সিভ মিড আর ডাবল পিভোট। 

কিন্তু সবচেয়ে বড় চমক হচ্ছে উইং ব্যাকদের অপ্রতিসম ব্যবহার। একটা সরলরেখায় রাখার বদলে একজনকে পেছনে, আরেকজনকে বেশি সামনে রাখেন। মাঠের মধ্যে অপ্রতিসম হয়ে পড়ায় বিপক্ষ দলও একদিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে। ফলে অপর অংশটা হয়ে পড়ে ফাঁকা। আর সেই সুযোগটা কাজে লাগান ফ্রিমপংয়ের মতো গতিশীল খেলোয়াড়রা।

শুধু কি তা-ই? আলোনসোর খেলোয়াড়রা মাঝমাঠে প্রায়ই ৩-২-এর একটা বাক্স তৈরি করেন। প্রতিপক্ষের জন্য সেই আঁটসাঁট বাক্স ভাঙা তো কঠিন হয়ই, উপরন্তু একজন-দুজন খেলোয়াড় প্রায়ই হুট করে পাল্টা আক্রমণে চলে যান। কী দারুণ চমক! 

ফিমপংয়ের মতো আরেকজন গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় ফ্লোরিয়ান উইর্টজ। জাবির ঠাসা মিডফিল্ড প্রতিপক্ষের ফুলব্যাক আর সেন্টারব্যাকদের পাহারায় রেখে হাফস্পেস বরাবর যে জায়গা তৈরি করেন, তার সদ্ব্যবহার করেন এই নম্বর টেন। 

জাবির দল ছোট ছোট পাসে খেলে কিন্তু খেলার গতি কমায় না। ফরম্যাশনের একেবারে ওপরের লোনলি স্ট্রাইকারের জায়গাটায় সাধারণত খেলেন ভিক্টর বোনিফেস। নাইজেরিয়ান এই খেলোয়াড় আলোনসোর দলের আরেক প্রাণভোমরা। গতি, স্কিল আর প্রচণ্ড পরিশ্রম করার ক্ষমতার কারণে তিনি লিংক প্লে, ওপর-নিচে ওঠানামা করে প্রতিপক্ষকে নাস্তানাবুদ করে দেন। লেভারকুসেনের আক্রমণ দেখতে পাওয়া তাই এক মোহনীয় ব্যাপার। তীব্র গতি আর বুদ্ধিমত্তার কয়েকজন ফুটবলার যেন পরস্পরের মন পড়ে পড়ে বলকে দিয়ে কথা বলায়। বল চলে যায় অভীষ্ট লক্ষ্যে। 

গতকাল যারা খেলা দেখেছেন, তারা এত কিছুর পরেও দেখেছেন বক্সের বাইরে থেকে গোলার মতো শট দিয়ে গোল করার ক্ষমতা। বড় স্ক্রিনে টর! টর! (জার্মান ভাষায় গোল) লেখাগুলো থরথর করে শিহরণ জাগাচ্ছিল নিশ্চিতভাবেই। তেমনি একটি গোল দেন জাবির সেনাপতি গ্রানিট শাকা!

সেনাপতি শাকা

আর্সেনাল থেকে অনেকটাই বিতাড়িত হয়েছিলেন এই সুইস জেনারেল। জাবির মতোই ডিফেন্সিভ মিডফিল্ডে খেলেন তিনি। আর গোটা দলকে এক সুতায় বেঁধে রাখেন মাঠে ও মাঠের বাইরে। আক্রমণের কথা তো বলাই হলো। রক্ষণটাকে আগলে রাখার মূল দায়িত্ব ডের কাপ্তানের।

প্রতিপক্ষ যখন আক্রমণে যায়, তখন জাবির দল প্রধানত দুইভাবে সাড়া দেয়। একটা হচ্ছে ৫-২-২-১ ফরম্যাশনে চলে যাওয়া। হাই ব্যাকলাইন এবং মাঝখানটায় ভিড় করে প্রতিপক্ষকে বাধ্য করে উইং দিয়ে আক্রমণ করার। আর দ্বিতীয় কাজটা তারা করেন, হাইলাইন রেখে প্রেস করার মাধ্যমে। এই দুটি কৌশলেই কনসার্টের কন্ডাক্টরের মতো নেতৃত্ব দেন শাকা।

এই যুদ্ধের সেনাপতি শাকার সঙ্গে জাবি আলোনসো

আধুনিক ফুটবলের তত্ত¡ মেনে, প্রতিপক্ষের আক্রমণের ফায়দা নিয়ে দ্রুত প্রতি আক্রমণ করা লেভারকুসেনের বড় শক্তি। যেহেতু, মাঝ বরাবর খেলোয়াড় ভর্তি থাকে তাদেরই কেউ একজন প্রতিপক্ষের ওভারল্যাপ করা সেন্ট্রাল ডিফেন্ডার আর ফুলব্যাকদের ছেড়ে আসা স্পেস দিয়ে আক্রমণ শানান। তবে আধুনিক কোচদের মতো জাবির গোলকিপারকে সুইপারের কাজ করতে তেমন একটা দেখা যায় না; বরং উইং দিয়ে আসা আক্রমণ থামাতে ব্যাকলাইনের তিনজনের অন্তত একজন এবং গোলকিপার শক্তভাবে পজিশন ধরে রাখেন। বলা যেতে পারে জাবির প্রচণ্ড ফ্লুইড ফরম্যাশনের কাউন্টারব্যালেন্স বা ভারসাম্য রক্ষা। 

ম্যান ম্যানেজার জাবি 

শুধু কৌশলেই যে দারুণ বুদ্ধিদীপ্ত তা-ই নয়, জাবির দলের সাফল্যে সবচেয়ে জরুরি সতীর্থদের সম্পূর্ণভাবে পড়তে পারা, একাত্ম হতে পারার ক্ষমতা। শান্তশিষ্ট জাবি এই কাজটা করেন কিংবদন্তিম্যান ম্যানেজারদের মতো। লেভারকুসেনের সিজন শুরুর বেশ আগে তিনি তার খেলোয়াড়দের নিয়ে চলে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার আল্পস পর্বতমালার কাছে। পাহাড়ের পাদদেশে তিনি খেলোয়াড়দের তৈরি করেন প্রচÐ পরিশ্রম ও প্রতিকূল পরিবেশের বিরুদ্ধে একতাবদ্ধ হয়ে জয় করার। 

জাবির এই ব্যাপারটার সঙ্গে কিংবদন্তি ম্যান ম্যানেজার ব্রায়ান ক্লফের মিল পাওয়া যায়। ক্লফ খুঁজে খুঁজে বের করতেন ‘প্রবলেমেটিক অথচ ট্যালেন্টেড’ খেলোয়াড়দের। যাদের নিয়ে অন্যরা কাজ করতে ভয় পেত, তাদের ধিকি ধিকি আগুনটা তিনি বের করে আনতেন। শাকা তেমনি একজন। এই সুইসের অভিজ্ঞতা আর জেদকে তিনি কাজে লাগালেন। ‘আমরা যখন জানলাম গ্রানিতকে আর্সেনাল রাখতে চাইছে না, আমরা ওর পরিসংখ্যান, ভিডিও, স্কাউট রিপোর্ট- এগুলা কিচ্ছু দেখিনি, জাবি জানতেন ওনার কী দরকার।’ শাকাকে দলে ভেড়ানোর ব্যাপারে বলেন জাবির এক সহকারী। 

এরপর নিজের পছন্দের খেলোয়াড়দের টার্গেট করতে শুরু করেন জাবি। তরুণ জেরেমি ফ্রিমপং এর আগের তিন বছর ক্লাবের হয়ে তেমন কিছু করতে না পারলেও জাবি বুঝতে পেরেছিলেন ২২ বছরে পা দিতে যাওয়া খেলোয়াড়টি এক দারুণ সম্পদ। তেমনি আরেকজন মরক্কোর তরুণ আমিনে আদিল, বুরকিনা ফাসোর ডিফেন্ডার এডমুন্ড তাপসোবা আর এদের চেয়ে একটু বয়স্ক প্যাট্রিক শিক। নিয়ে এলেন নিজ দেশের প্রতিভাবান কিন্তু সর্বোচ্চ পর্যায়ে সুযোগ না পাওয়া অ্যালেক্স গ্রিমালডিকে, ইংল্যান্ডে তেমন জুত করতে না পারা নাথান টেলাকে।

হার না মানার জেদ 

আল্পসের ওই কঠোর প্রশিক্ষণ আর দল হয়ে ওঠার ফলটা হাতেনাতে পাওয়া গেল। প্রথম তিন ম্যাচেই জয়। কিন্তু চতুর্থ ম্যাচটা সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ- বায়ার্নের মাঠে। আর সেখানেই টের পাওয়া গেল জাবি আলোনসোর ছেলেদের সবচেয়ে বড় শক্তির জায়গাটা- হার না মানার সংকল্প। হ্যারি কেনের গোলে পিছিয়ে পড়ার পরেও চোখধাঁধানো বেগে খেলে সমতা আনল আধিপত্য বিস্তার করে। কিন্তু ধারার বিপরীতে খেলা শেষের চার মিনিট আগে স্বাগতিকদের এগিয়ে নিল লিওন গোরেটজকা। জাবির দল তেড়েফুঁড়ে খেলে একটা পেনাল্টি আদায় করে নিল আর ৯৪ মিনিটের গোলে খেলা শেষ হলো ২-২ গোলে। সেদিন বায়ার্নের মাঠে লেভারকুসেনের খেলোয়াড়দের উল্লাস আর আলিঙ্গন দেখে কেউই হয়তো আঁচ করতে পারেনি এ এক নতুন যুগের শুরুর সন্ধিক্ষণ। 

জাবিকে ‘বিয়ার স্নান’ করিয়ে দিচ্ছেন খেলোয়াড়রা

এরপর যা হলো তা ইতিহাস! পুরো মৌসুমে এযাবৎ আর একটা ম্যাচও হারেনি দলটা। অনেকবার পিছিয়ে থেকে জিতেছে, শেষ মুহূর্তের প্রয়োজনীয় গোল পাওয়া বানিয়ে ফেলেছে অভ্যাসে। কখনো এক গোল, কখনো দুই গোলে পিছিয়ে থাকাটাও তাদের দমিয়ে রাখতে পারেনি।

ফুটবল খেলাটার মাহাত্ম্য এখানেই যে, এই খেলাটা মাঠের কৌশল, দক্ষতা, জেদ আর দৃঢ়তা ছাপিয়ে মানুষের আবেগ-অনুভ‚তির এক বাঙময় কাব্য হয়ে ওঠে। অনেক ক্রীড়া তাত্তি¡ক বলেন, মানুষ মূলত লাখ লাখ বছর ধরে শিকার করত। একসঙ্গে মিলে পরিকল্পনা করে শক্তিশালী প্রতিপক্ষকে বধ করার যে আনন্দ তা কেবল খাবারের জন্য নয়; বরং তার আবেগকে পূর্ণ করার এক মাধ্যম। আধুনিক যুগে ফুটবল আমাদের সেই অনুভ‚তি দেয়। তীব্র কঠিন জীবনটাকে সহজ করে। আমাদের অপ্রাপ্তি, বেদনা আর ক্লান্তি আমরা ভুলতে চাই ফুটবলের আনন্দে।

একজন জাবি আলোনসো যেন প্রাচীন যুগের এক শিকারি নেতা। যার বলিষ্ঠ অথচ আবেগি নেতৃত্ব অতি সুখে কাঁদায় এক ‘যান্ত্রিক’ দেশের গোটা ‘কেমিক্যাল’ শহরের মানুষকে। সেই কান্না আবেগাপ্লুত করে সমগ্র ফুটবল দুনিয়াকে। 

অন্য মানুষের খুশির কান্নার চেয়ে আনন্দময় আর কী হতে পারে!