তিস্তা একটি মানবিক সমস্যা

তিস্তা নদী ভারত ও বাংলাদেশের কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়। নতুন তিস্তা জলবণ্টন চুক্তি ভারত ও বাংলাদেশের ২৫ কোটি মানুষের কাছে আশার আলো জাগিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু ভূ-রাজনৈতিক কারণে আজও তা কার্যকর হয়নি। 

তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী, যা বাংলাদেশ এবং ভারত দুটি দেশেরই অংশ। এটি ভারতের সিকিম থেকে উৎপন্ন হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে রংপুর দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে ব্রহ্মপুত্র নদীর সঙ্গে মিলিত হয়। পরে তা পদ্মা ও মেঘনা নদীর সঙ্গে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরে পতিত হয়। তিস্তার অববাহিকা আনুমানিক ১২ হাজার ১৫৯ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত। এ নদীটি বাংলাদেশ ও ভারতের তিন কোটির বেশি মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে দুই কোটির বেশি লোক বাংলাদেশের ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে তিস্তার অববাহিকায় বসবাস করে। ৪০ লাখ লোক ভারতের পশ্চিমবঙ্গ এবং প্রায় ৫০ লাখ লোক সিকিমের অববাহিকায় বসবাস করে। অর্থাৎ তিস্তার ওপর নির্ভরশীল ৭০ ভাগ লোক বাংলাদেশে তিস্তার অববাহিকায় বসবাস করে। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের রংপুর বিভাগের মধ্য দিয়ে ভারত থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করা তিস্তা বাংলাদেশের চতুর্থ বৃহত্তম নদী। তিস্তার প্লাবনভূমি ২ হাজার ৭৫০ বর্গকিলোমিটার জুড়ে বিস্তীর্ণ। এটি বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় ফসল বোরো ধান চাষের জন্য পানির প্রাথমিক উৎস এবং মোট ফসলি জমির প্রায় ১৪ শতাংশ সেচ প্রদান করে।

তিস্তা ব্যারাজ প্রজেক্ট বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সেচ প্রকল্প। এটাও তিস্তার পানির ওপর নির্ভরশীল। এই প্রকল্পটির অন্তর্ভুক্ত উত্তরবঙ্গের ছয়টি জেলা যথা নীলফামারী, রংপুর, দিনাজপুর, বগুড়া, গাইবান্ধা ও জয়পুরহাট এবং এর আওতাভুক্ত এলাকা ৭ লাখ ৫০ হাজার হেক্টর বিস্তৃত। তিস্তার সঙ্গে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের মানুষের জীবন-জীবিকা ও অর্থনীতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিস্তা নদীতে ভারতের উজানে পশ্চিমবঙ্গ এবং সিকিমে বাঁধ, ব্যারাজ, জলবিদ্যুৎসহ বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে। এ কারণে বাংলাদেশে তিস্তা নদীর পানির প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়েছে। শুষ্ক মৌসুমে তিস্তা নদীতে পানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় তা সেচের ক্ষেত্রে এবং কৃষি ফলনে বিরূপ প্রভাব ফেলেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফসলগুলোর একটি বোরো ধান উৎপাদনে এর প্রভাব ব্যাপক। ইন্টারন্যাশনাল ফুড পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের এক গবেষণায় দেখা যায়, তিস্তার পানির ঘাটতির কারণে প্রতি বছর প্রায় ১৫ লাখ টন বোরো ধান উৎপাদনের ক্ষতি হয়েছে। গবেষণায় আরও ভবিষ্যদ্বাণী করা হয়েছে, যদি পানি সমস্যার সমাধান করা না হয়, তাহলে তিস্তায় পানির ঘাটতির কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের চাল উৎপাদন প্রায় ৮ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে প্রায় ১৪ শতাংশ হ্রাস পেতে পারে। সবচেয়ে আশঙ্কার বিষয় হচ্ছে যে উত্তরবঙ্গের খাল-বিল, পুকুর, জলাশয় শুকিয়ে যাচ্ছে। বিজ্ঞানীরা ধারণা করছেন, এর সঙ্গে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি না থাকার সম্পর্ক রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এই অবস্থা চলতে থাকলে তা ভবিষ্যতে পুড়ো উত্তরবঙ্গের পরিবেশের ভারসাম্য নষ্ট হতে পারে।

তিস্তার পানি চুক্তি স্বাক্ষর নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে। তিস্তার পানি ভাগাভাগি নিয়ে দুই রাষ্ট্রের মধ্যে দীর্ঘ সময় ধরে আলাপ-আলোচনার পর স্বাক্ষরের জন্য চুক্তির একটি খসড়া চূড়ান্ত করা হয়। এই চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার পানির ৩৭ দশমিক ৫ ভাগ বাংলাদেশের এবং ৪২ দশমিক ৫ ভাগ ভারতের পাওয়ার কথা ছিল। বাকি ২০ ভাগ থাকবে নদীর পরিবেশ রক্ষার উদ্দেশ্যে। ২০১১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিংয়ের বাংলাদেশ সফরের সময় তিস্তার পানি নিয়ে চুক্তি স্বাক্ষরের কথা ছিল। কিন্তু ভারতের পশ্চিমবঙ্গ সরকারের বিরোধিতার কারণে শেষ মুহূর্তে চুক্তিটি স্বাক্ষরিত হয়নি কেউ কেউ এমন দাবি করেছেন। এর পর থেকে তিস্তা পানি চুক্তি নিয়ে দুই দেশের মধ্যে একটি অচলাবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। নরেন্দ্র মোদির সরকার তিস্তার পানি চুক্তি স্বাক্ষরের ব্যাপারে একাধিকবার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ক্রমাগত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও সমস্যাটি এক দশকের বেশি সময় ধরে অমীমাংসিত রয়ে গেছে।

পানি সমস্যার দীর্ঘমেয়াদি এবং স্থায়ী সমাধানের জন্য তিস্তা নদীর পানির যৌথ ব্যবস্থাপনা এবং উন্নয়ন প্রয়োজন। তিস্তার পানি সমস্যা একটি মানবিক সমস্যা। এর সমাধান হলে কেবল পানি সমস্যার সমাধানই যে হবে তা নয়, এটি দুই দেশের জনগণের মধ্যে বিশ্বাস, আস্থা, সম্প্রীতি ও সৌহার্দ্য বৃদ্ধির সহায়ক হবে। তিস্তার পানি সমস্যার শান্তিপূর্ণ সমাধান ভবিষ্যতে দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্রকে আরও প্রসারিত ও গভীরতর করতে পারে। তাই আন্তর্জাতিক পানি-সম্পর্কিত নীতিমালা অনুসরণ করে ভারত এবং বাংলাদেশকে তিস্তা পানি চুক্তি সম্পাদনে জরুরি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। ভারত-বাংলাদেশ অভিন্ন নদীর আলোচনা হয় কেবলই পানি ভাগাভাগির, সেও ভারতীয় ছকে। এই ছকে দুই দেশের আলোচনা হয় বাংলাদেশ ও ভারতের একটি অঙ্গরাজ্যের চাহিদার সমন্বয়ের। অথচ যেকোনো আন্তর্জাতিক আইন ও নীতি অনুসারে এটি হতে হবে বাংলাদেশ ও ভারত রাষ্ট্রের চাহিদার সমন্বয়। নদী শুধু পানির আধার নয়,এটি বিশাল এক ইকোসিস্টেম প্রাণবৈচিত্র্যের আবাসস্থল এবং আশপাশের এলাকার পরিবেশের নিয়ন্ত্রক। নদী তাই পানি ভাগাভাগির বিষয় নয়, এটি সমন্বিতভাবে ব্যবহার ও ব্যবস্থাপনার বিষয়।

লেখক : গবেষক ও কলাম লেখক

raihan567@yahoo.com