সেলিমের ধ্রুপদি রূপকথা

১৯২৩ সালে ড. দীনেশচন্দ্র সেন প্রকাশ করেন ‘মৈমনসিংহ-গীতিকা’। গত বছর এই ঘটনার শত বছর পূর্তি হলো। চলতি বছরের ১১ এপ্রিল, ঈদুল ফিতরে মুক্তি পেল ময়মনসিংহ গীতিকার অন্যতম জনপ্রিয় পালা ‘কাজলরেখা’ অবলম্বনে চলচ্চিত্র ‘কাজলরেখা’। এবারই প্রথম নয়, ‘কাজলরেখা’ এর আগেও সেলুলয়েডে এসেছে। টেলিভিশনেও এসেছে, এসেছে মঞ্চেও। কাজলরেখাকে ভেঙে কত নাটক, সিনেমা হয়েছে তার আর লেখাজোকা নেই। এতবার, এতভাবে আসার পরও আবার কেন বড় পর্দায় কাজলরেখা? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে গিয়াসউদ্দিন সেলিমের চিত্রনাট্য, সংলাপ ও পরিচালনায় নির্মিত ‘কাজলরেখা’র কাহিনির কিছুটা জেনে নিই। ‘কাজলরেখা’র গল্প যুগ যুগ ধরে প্রবাহিত হচ্ছে প্রজন্মে থেকে প্রজন্মে। তবুও যদি প্রিয় পাঠক ভুলে গিয়ে থাকেন গল্পটি, তাদের কিছুটা আভাস দেওয়া যাক। ভাটির দেশের সওদাগর সাধু ধনেশ্বর জুয়া খেলে সর্বস্বান্ত হন। আর্থিক অবস্থা পরিবর্তনের জন্য শরণ নেন ধর্মমতী শুকপাখির। শুকপাখির পরামর্শে ধনেশ^র হীরার আংটি বিক্রি করে বাণিজ্যে যান। ভাগ্যলক্ষ্মী তার মুখ চেয়ে তাকান। এরপর কন্যাদায়গ্রস্ত ধনেশ্বর তার বিবাহযোগ্যা কন্যা কাজলরেখার বিয়ের জন্য পরামর্শ চান শুকপাখির কাছে। শুক জানায়, কাজলরেখার বিয়ে হয়ে গেছে সুচরাজার সঙ্গে। শুকের কথায় কাজলরেখাকে সুচরাজার কাছে বনবাসে রেখে আসেন সাধু। কাজলরেখা জীবন্মৃত সুচরাজার সর্বাঙ্গ থেকে একে একে সব সুচ তুলে নেন। শুধু দুই চোখের দুটো সুচ বাকি রয়ে যায়। এই দুটো সুচ তুলে একটি বিশেষ পাতার রস লাগালেই সুচরাজা বেঁচে উঠবেন, ফিরে পাবেন চোখের দৃষ্টি। কাজলরেখা চোখের সুচ না তুলেই স্নান করতে যান। স্নানের আগে এক দাস ব্যবসায়ী একজন দাসী নিয়ে হাজির হন তার কাছে। কাজলরেখা তার হাতের কঙ্কনের বিনিময়ে দাসীটিকে ক্রয় করেন, ক্রীতদাসীর নতুন নাম রাখেন কঙ্কনদাসী। কাজলরেখা দাসীকে সুচরাজার বিবরণ জানিয়ে স্নান করতে যান। এর মধ্যে ধূর্ত কঙ্কনদাসী সুচরাজাকে সারিয়ে তোলে। সুচরাজা তখন তার প্রাণদায়িনী কঙ্কনদাসীর ইচ্ছা মতো তাকে বিয়ে করেন। স্নান শেষে মন্দিরে ফিরে কাজলরেখা দেখেন তার সর্বনাশ হয়ে গেছে। কঙ্কনদাসী সুচরাজার কাছে কাজলরেখাকে কঙ্কনদাসী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়। কাজলরেখা সত্যি বলতে গিয়েও থেমে যান। কারণ সন্ন্যাসী তাকে বলেছিলেন, তার আত্মপরিচয় দেবে শুকপাখি। সত্যি বললে বিধবা হবে কাজলরেখা। তাই তিনি নিশ্চুপ থাকেন। সুচরাজা স্ত্রী ও দাসী নিয়ে দেশে ফিরে আসেন। এখানেই ছবির ‘ইন্টারভ্যাল’। বাকি গল্পে দেখা যায়, কীভাবে কাজলরেখা বছরের পর বছর লাঞ্ছনা, যন্ত্রণা, অবজ্ঞা, অপমান সয়ে সয়ে এক সময় সুচরাজাকে স্বামী হিসেবে পায়।

গিয়াউদ্দিন সেলিম ময়মনসিংহ গীতিকাকে প্রায় অক্ষরে-অক্ষরে অনুসরণ করেছেন। ভিজুয়াল মাধ্যমের সুযোগ নিয়ে বাড়াবাড়ি করেননি। আবার যেখানে একান্ত প্রয়োজন, সেখানে নিজে কলম ধরতে দ্বিধা করেননি। পালায় যেখানে সংলাপ ছিল ছন্দে, সেখানে সংলাপকে গদ্যে রূপান্তর করেছেন পরিচালক। কিছু নতুন সংলাপ তাকে ছবির স্বার্থেই লিখতে হয়েছে। একইভাবে ‘কাজলরেখা’ পালার অনেক গান জুড়ে গেছে ‘কাজলরেখা’ ছবির নতুন গানগুলোর সঙ্গে। যারা ‘কাজলরেখা’ পড়েননি, তারা এই বিষয়টি ধরতে পারবেন না। ‘কাজলরেখা’ ছবিতে অনেক গান, কোনোটা পূর্ণ, কোনোটা অপূর্ণ। গল্পকে এগিয়ে নিতে কিংবা চরিত্রের মনের অবস্থা দর্শকদের বোঝাতে গানগুলোর আশ্রয় নিয়েছেন পরিচালক। কিন্তু এত গান থাকার পরও ছবিটি কোথাও বাধা পায় না, চরায় আটকায় না গল্পের নৌকা। বরং সুরে সুরে এগিয়ে চলে নদীর ছন্দে।

মিউজিক, সাউন্ড আর ক্যামেরা এই তিনের ইতিবাচক যোগসাজশে প্রাণপ্রতিষ্ঠা হয়েছে ‘কাজলরেখা’র। কখনো বনের ভেতর পাখির ডাক, কখনো নদীর ছলছল ধ্বনি, কখনো পাতা ঝরার আওয়াজ; আবার  উল্টোটাও যেখানে পরিবেশ শব্দহীন, সেখানে চরিত্রগুলোর অন্তর্গত হাহাকার কিংবা ঘটনার বিহ্বলতা প্রকাশ পেয়েছে আবহ সংগীতের ভেতর দিয়ে। অত্যন্ত সযত্নে তোলা হয়েছে ‘কাজলরেখা’র প্রত্যেকটা ফ্রেম। ছবির অগণিত ফ্রেম কথা বলেছে শব্দ আর সংগীতের সাহায্য নিয়ে। কখনো আবার শব্দহীন, সংগীতহীন ফ্রেম সাহায্য নিয়েছে বিস্ময়কর, রহস্যময় প্রকৃতির। কখনো আবার অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভিব্যক্তির গুণে ফ্রেম হয়ে উঠেছে অপার্থিব। ‘কাজলরেখা’ পালার শক্তি এর গল্প; কিন্তু চলচ্চিত্র ‘কাজলরেখা’য় বেশি উপভোগ্য এর শরীর জুড়ে ছড়িয়ে থাকা রহস্যময়তা। এই রহস্যময়তা তৈরি হয়েছে কখনো ক্যামেরার কারসাজিতে, কখনো বা আলোর ব্যবহারে; এর অনেকটাই ঘটেছে প্রকৃতির পৃষ্ঠপোষকতায়। এত সুন্দর, সবুজ, সজল বাংলা খুব কম ছবিতেই দেখা যায়। বন-জঙ্গল হোক, আর হাওড়-বিল হোক, এ ছবিতে

প্রকৃতি যেন করুণ অথচ রহস্যময় সুরে বেজে চলেছে সারাক্ষণ। ছবির চরিত্রগুলোও রহস্যময়, যদিও তারা আমাদের যুগ-যুগের চেনা। পরিচালকের উদ্ভাবনী ক্ষমতার গুণে অনেকগুলো চরিত্র রূপায়ণ করেন একজন অভিনয়শিল্পী আজাদ আবুল কালাম। কখনো তিনি জুয়াড়ি, কখনো সন্ন্যাসী, কখনো জেলে। তিনি যখনই পর্দায় আসেন, দর্শকের শরীর কাঁটা দিয়ে ওঠে। দর্শক মনে প্রশ্ন জাগে, তিনিই কি পাশার চালে জগৎ নাচাচ্ছেন? কাজলরেখা, সুচরাজা, সাধু ধনেশ্বর সবাই কি তার খেলার পুতুল?

এবার আসি সেই প্রশ্নের উত্তরে, ‘কাজলরেখা’ কেন বারবার নির্মিত হওয়ার মতো আখ্যান। কাজলরেখার মতো শক্তিশালী নারী চরিত্র বাংলাসাহিত্যে দুষ্প্রাপ্য। তার সহিষ্ণুতা, কর্তব্যজ্ঞান, গুণপনা, সৌন্দর্য ইত্যাদি মিলিয়ে কাজলরেখা এক অসাধারণ চরিত্র। তার বিপরীত চরিত্র কঙ্কনদাসী আবার লোভী, প্রতারক, কূটকৌশলের আশ্রয় নেওয়া এক অনৈতিক চরিত্র। কঙ্কনদাসী আমাদের আয়না হয়ে আমাদেরই ভয় পাইয়ে দেয়। সাধু ধনেশ্বরও রিপুর কাছে পরাস্ত এক শক্তিশালী চরিত্র। তার লোভের বলি হয় নিষ্পাপ কাজলরেখা। সুচরাজা গল্পের নায়ক হলেও বিচক্ষণতা ও প্রজ্ঞার অভাবে কাজলরেখার চেয়ে নিষ্প্রভ। ফলে কাজলরেখাই এই গল্পের ‘নায়ক’। ‘কাজলরেখা’র চরিত্ররাও তাদের পরিণতি চিরকালই আমাদের চেতনায় সুতীক্ষ আঘাত করতে সক্ষম বলেই এই গল্প ফিরে ফিরে আসে।

এবার আসি চিরন্তন এই গল্পটির চরিত্রগুলোর প্রতি কতটা সুবিচার করতে পারলেন অভিনয়শিল্পীরা সেই আলাপচারিতায়। বারো বছরের কাজলরেখা সাদিয়া আয়মানের পর্দা উপস্থিতি ছিল ‘বিরতি’ পর্যন্ত। তাকে নিষ্পাপ লেগেছে, লেগেছে চরিত্র অনুযায়ী ঠিকঠাক। বেগরবাই করেছেন প্রাপ্তবয়স্ক কাজলরেখা মন্দিরা চক্রবর্তী। সহোদর ভাই রত্নেশ্বর তার পাণিপ্রার্থী, ধনবান সোনাধর তার রূপে মুগ্ধ, সুচরাজা তার পরিচয় জানতে মরিয়া, কঙ্কনদাসী বিষিয়ে দিচ্ছে তার জীবন  এমন দুঃখ-দুর্দশায় ডুবন্ত দ্বন্দ্বমুখর কাজলরেখা চরিত্রটিকে প্রাণ দিতে যতটুকু অভিনয় দক্ষতার দরকার ছিল মন্দিরার মধ্যে তার অভাব ছিল। সুচরাজার কথা অনুযায়ী পানপাতার মতো মুখ কাজলরেখার। সাদিয়া আয়মান এই বর্ণনার সঙ্গে মিললেও মন্দিরার মুখ কি আদৌ পান পাতার মতো? কঙ্কনদাসী চরিত্রে অভিনয় করেছেন মিথিলা। সাপের মতো সর্পিল তার চলন, কাকের মতো কর্কশ তার কণ্ঠ, বিষের আধার তার অন্তর। কঙ্কনদাসী চরিত্রে মুখরক্ষা করতে পেরেছেন মিথিলা। কাজলরেখার পরিচয় জানার জন্য সুচরাজার যে উদ্বেলতা, প্রণয়ীর জন্য তার ভেতরে যে ক্ষয়, সেসব ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা যথাযথ চেষ্টা করেছেন শরীফুল রাজ। ছবির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র, সাধু ধনেশ্বর; এই চরিত্রের টানাপোড়েন ভালোভাবেই অনূদিত হয়েছে ইরেশ যাকেরের মুখে। বাকি চরিত্রগুলো খুব বেশি আলো পেয়ে উজ্জ্বল হয়ে উঠতে পারেনি। শেষে বলতে হয় আজাদ আবুল কালামের কথা। হল থেকে বেরিয়েও তার চেহারা মনে এলে শীতল স্রোত বয়েছে দর্শকের শিড়দাঁড়ায়। পর্দায় এমনই বলিষ্ঠ হাজিরানা তার।

চরিত্রচিত্রণের ক্ষেত্রে পরিচালক মূল পালার অনুসরণ করলেও সামান্য পরিবর্তন এনেছেন গল্পের শেষ দৃশ্যে। পালায় কঙ্কনদাসীকে মাটিচাপা দেওয়া হয়। কিন্তু ছবিতে নাকে খত দিয়ে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। এতে একদিকে নারীর প্রতি নিষ্ঠুরতাকে নিরুৎসাহিত করা হলো, উল্টোদিকে কাজলরেখার চরিত্রে মহত্ত্ব আরোপ করা গেল। যদিও এতে দর্শকের আত্মতৃপ্তি ব্যাহত হয়, কেননা খলনায়িকার বীভৎস পরিণামই ছিল তাদের কাক্সিক্ষত।

‘কাজলরেখা’ ছবিতে পরিচালক নানাভাবে বিনোদনপিপাসু দর্শকের আকাক্সক্ষাকে মাটিচাপা দিয়েছেন। কাহিনির সরল বর্ণনার কারণে দর্শক কখনোই ‘কী হয় কী হয়’ ভেবে উত্তেজনায় ফেটে পড়তে পারেনি। রাজদরবারের জৌলুস, হাতিশাল, ঝাড়বাতি ও নর্তকীর বদলে ছবিতে দেখা যায় বাঁশ-কাঠ-চাটাইয়ের রাজপ্রাসাদ। ফলে দর্শক আহত হয়, মনোবেদনায় ভোগে। এসব জায়গায় পরিচালক ছিলেন নির্বিকার, তার পরিমিতিবোধ ছবিটিকে বিনোদনসর্বস্ব হতে দেয়নি।

কাজলরেখা

চিত্রনাট্য, সংলাপ, পরিচালনা : গিয়াসউদ্দিন সেলিম

অভিনয়ে : মন্দিরা চক্রবর্তী, সাদিয়া আয়মান, শরীফুল রাজ, রাফিয়াত রশিদ মিথিলা, ইরেশ যাকের, খায়রুল বাশার, ঝুনা চৌধুরী, সাহানা সুমী, আজাদ আবুল কালাম প্রমুখ

চিত্রগ্রহণ : কামরুল হাসান খসরু, সংগীত : ইমন চৌধুরী

প্রযোজনা: গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার, মুক্তি : ১১ এপ্রিল, ২০২৪

‘কাজলরেখা’ ছবিতে পরিচালক নানাভাবে বিনোদনপিপাসু দর্শকের আকাক্সক্ষাকে মাটিচাপা দিয়েছেন। তার পরিমিতিবোধ ছবিটিকে বিনোদনসর্বস্ব হতে দেয়নি।