নদীর পানির স্বাভাবিক গতি এবং গন্তব্য কী, তা আমরা সবাই জানি। কিন্তু মানি কী? বাংলাদেশের শুকিয়ে যাওয়া নদী দেখে এই প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। পানি ওপর থেকে নিচে প্রবাহিত হয় এবং নদী সৃষ্টির মাধ্যমে সাগরে গিয়ে মেশে। এর কোনো সীমানা নেই, দেশের নাম পাল্টায়, সীমানা পাল্টায় কিন্তু পানি বয়ে চলে সেই প্রাকৃতিক নিয়মেই। নদী বয়ে চলে উজান থেকে ভাটির দিকে। এই যে বিষয়টি এত স্বাভাবিক সেই ব্যাপারটা নিয়ে বাংলাদেশের জন্য অস্বাভাবিক জটিলতা তৈরি হয়েছে। একটু খোলাসা করে বলা যাক! ভারত বাংলাদেশের উজানে, সেখান থেকে পানি গড়িয়ে যাবে সমুদ্রে, মাঝখানে পড়েছে বাংলাদেশের ভূখণ্ড। বাংলাদেশের উজানের ১৫ গুণ বেশি অঞ্চল জুড়ে যে বৃষ্টিপাত হয় এবং হিমালয় থেকে বরফ গলে যে পানি আসে তা বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে বয়ে যায় সমুদ্রের পানে।
প্রাকৃতিক এই নিয়মকে রাজনৈতিকভাবে বাধাগ্রস্ত করে চলেছে বাংলাদেশের উজানের দেশ ভারত। শুধু নৈতিকভাবে নয়, আন্তর্জাতিক সব বিধিবিধানকেও তোয়াক্কা করছে না তারা। একাধিক দেশের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত নদীকে আন্তর্জাতিক নদী বলা হয়ে থাকে। সেই বিবেচনায় ভারত থেকে বয়ে আসা ৫৪টি নদীই আন্তর্জাতিক নদী। কিন্তু ভারত সেগুলোর ওপর এক বা একাধিক বাঁধ দিয়ে পানির প্রবাহকে বাধাগ্রস্ত করেছে। সহজভাবে কঠিন কথাটা হলো, ভারত বাংলাদেশকে পানির ন্যায্য প্রাপ্যতা থেকে বঞ্চিত করছে এবং করেই চলেছে।
তিস্তার উজানে ভারত গজলডোবা বাঁধ নির্মাণ করেছে। এর মূল উদ্দেশ্য হলো, ভারতীয় অংশে সেচের সম্প্রসারণ। এই বাঁধ দিয়ে প্রথম পর্যায়েই প্রায় ১০ লাখ হেক্টর, অর্থাৎ ১০ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকায় সেচ দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। সে জন্য ২১০ কিলোমিটার দীর্ঘ খাল করা হয়েছে। এসব খাল একদিকে পশ্চিম-দক্ষিণে অগ্রসর পশ্চিমবঙ্গের মালদহ এবং মুর্শিদাবাদ জেলা পর্যন্ত পৌঁছেছে, অন্যদিকে পূর্ব দিকে অগ্রসর হয়ে জলপাইগুড়ি এবং কোচবিহার জেলা পর্যন্ত গেছে। অর্থাৎ গজলডোবা বাঁধ একটি বিস্তৃত পরিধিতে সেচ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে নির্মিত হয়েছে। এখন যে নতুন দুটি খাল খনন করা হচ্ছে, তা এই প্রকল্পের দ্বিতীয় পর্যায়ের বাস্তবায়নের অংশ বলেই মনে হচ্ছে। গজলডোবার বাঁধের মাধ্যমে ভারত কর্র্তৃক তিস্তার পানি অপসারণের কোনো উচ্চ সীমা নির্ধারিত নেই। ফলে ভাটির দেশের কথা কোনোভাবেই বিবেচনায় না নিয়ে নতুন নতুন খাল খননের মাধ্যমে ভারত তিস্তা নদীর পানি অপসারণের ক্ষমতা বাড়িয়েই চলেছে। আর বাংলাদেশ অঞ্চলে তিস্তা হারাচ্ছে তার বেঁচে থাকার মতো পানি। আর তিস্তা নিজে না বাঁচলে তার অববাহিকার জীববৈচিত্র্য বাঁচবে কীভাবে?
এ যাবৎকালে তিস্তার উজানে ভারতের অনেক বাঁধ নির্মাণ করেছে এবং ভবিষ্যতেও করবে। ভারতের একজন প্রখ্যাত গবেষক গৌরী নুলকার দেখিয়েছেন যে, তিস্তার উজানে এবং এর বিভিন্ন উপনদীর ওপর ভারত আরও প্রায় ১৫টি বাঁধ কিংবা ব্যারাজ নির্মাণের পরিকল্পনা করছে। এখনই তিস্তার প্রবাহ যা দাঁড়িয়েছে তারপর এগুলো বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ অংশে শুষ্ক মৌসুমে তিস্তার কোনো প্রবাহ যে অবশিষ্ট থাকবে না, তা এক রকম নিশ্চিতভাবেই বলা যায়। এই ভয়াবহ বিপদকে বিবেচনায় রেখে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এসব পরিকল্পনার বিরোধিতা করা অত্যন্ত জরুরি। কারণ তিস্তা একটি আন্তর্জাতিক নদী। অংশীদার এবং ভাটির অংশের দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সম্মতি ভিন্ন এই আন্তর্জাতিক নদীর ওপর এ ধরনের হস্তক্ষেপ ভারত করতে পারে না। নদীকে একটি জীবন্ত সত্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ইতিমধ্যেই গজলডোবা বাঁধের কারণে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশে তিস্তা নদীর প্রবাহ শুধু যে ‘ন্যূনতম পরিবেশসম্মত প্রবাহে’র নিচে চলে গিয়েছে তাই নয়, জীবন্ত সত্তা হিসেবে অস্তিত্ব বিপন্ন হয়ে পড়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে, ভারতের সঙ্গে বন্ধুত্ব রক্ষা কি নদী রক্ষার সঙ্গে সম্পর্কিত হবে না? ইতিমধ্যেই জানা যাচ্ছে যে, বাংলাদেশ সরকার চীনের পাওয়ার চায়না কোম্পানির মাধ্যমে পরিকল্পিত, অর্থায়িত এবং বাস্তবায়িতব্য ‘তিস্তা নদী সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা এবং পুনরুদ্ধার প্রকল্প’ নামে একটি প্রকল্প নিয়ে আলোচনা করছে। অনেকে এটাকে সংক্ষেপে ‘তিস্তা মহাপরিকল্পনা’ বলে অভিহিত করছেন। এ প্রকল্পের অনুমিত বাজেট প্রায় ১ বিলিয়ন ডলার, অর্থাৎ প্রায় সাড়ে ১১ হাজার কোটি টাকা। লক্ষণীয়, এ ধরনের একটি জনগুরুত্বসম্পন্ন এবং ব্যয়বহুল প্রকল্প সম্পর্কে সরকার জনগণকে কোনো কিছু জানানোর প্রয়োজনীয়তা বোধ করছে বলে মনে হয় না। এমনকি মুষ্টিমেয় লোকজন ছাড়া সরকারের অভ্যন্তরের বাকি লোকজনও এ বিষয়ে তেমন অবহিত নন বলে মনে হয়। জনগণের অর্থে নির্মিতব্য এবং কয়েক কোটি মানুষের জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করার মতো এ ধরনের একটি প্রকল্প সম্পর্কে জনগণকে না জানিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণের এই প্রবণতা দুঃখজনক। এদিকে বাংলাদেশ সরকার তার নাগরিকদের প্রকল্প বিষয়ে কিছু না জানালেও, পাওয়ার চায়না কোম্পানি ইউটিউবে ভিডিওর মাধ্যমে এই প্রকল্পকে বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরছে। যেহেতু সরকার এ প্রকল্প সম্পর্কে কোনো তথ্য গণ-পরিমণ্ডলে প্রকাশ করেনি, সেহেতু এই প্রকল্প নিয়ে মন্তব্য বা মূল্যায়ন করা কঠিন। তবে কিছু গবেষক এ প্রকল্পের পিডিপিপি এবং পাওয়ার চায়নার ভিডিওতে লব্ধ তথ্যের ভিত্তিতে কিছু বিশেষণ উপস্থিত করছেন। সে অনুযায়ী এ প্রকল্পের মূল লক্ষ্য হলো, তিস্তা নদীর গড় প্রশস্ততা বর্তমান প্রায় ৩ কিলোমিটার থেকে ০.৮ কিলোমিটার (অর্থাৎ, এক-তৃতীয়াংশে) কমানো এবং বৃহৎ খননকাজের (ক্যাপিটাল ড্রেজিং) মাধ্যমে গড় গভীরতা ৫ মিটার থেকে ১০ মিটার করা। পাওয়ার চায়নার মতে, এটি হলে নদীগর্ভ থেকে ১৭১ বর্গকিলোমিটার ভূমি উদ্ধার করা হবে এবং তা শিল্প, উন্নত কৃষি, শহর-নির্মাণ, পুনর্বাসন ইত্যাদি উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা যাবে। ওই প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে তিস্তার গভীরতা বৃদ্ধি পাবে। ফলে নদীতে বেশি পানি থাকবে এবং তা শুষ্ক মৌসুমে ব্যবহার করা যাবে।
কিন্তু বিশেষজ্ঞরা দেখিয়েছেন, তিস্তা নদী দিয়ে এখন বছরে ৪ দশমিক ৯ কোটি টন পলি (মূলত বর্ষাকালে) প্রবাহিত হয়। ফলে খননের মাধ্যমে নদীর যে গভীরতা বৃদ্ধি পাবে, তা আবারও পলি দিয়ে ভরাট হয়ে যাবে। অন্যদিকে বর্ধিত গভীরতা কমে গিয়ে এক-তৃতীয়াংশে সরুকৃত নদী বর্ষার সব প্রবাহ ধারণ করতে পারবে না। নদী তীরবর্তী বাঁধ ভেঙে আগের প্রশস্ততায় ফিরে আসতে পারে। ফলে গভীরতা বৃদ্ধি এবং প্রশস্ততার হ্রাস কোনোটাই স্থায়ী হবে না। ফলে তিস্তা রক্ষায় আরও কিছু বিষয় ভাবা যেতে পারে। যেমন বাংলাদেশের ভেতর তিস্তার ডান তীরে ৭টি এবং বাম তীরে ৫টি শাখা এবং উপনদী আছে। এগুলোর সঙ্গে তিস্তা নদীর সংযোগ পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করতে পারলে তিস্তার বর্ষাকালের প্রবাহ এসব নদী-নালা-খাল দিয়ে সারা অববাহিকায় বিস্তৃত হবে। শুষ্ক মৌসুমে এই সঞ্চিত পানি সেচের জন্য ব্যবহৃত হতে পারবে এবং ফিরতি প্রবাহের মাধ্যমে তা তিস্তা নদীর প্রবাহ বৃদ্ধি করতে পারবে। সুতরাং বর্ষাকালের পানি ধরে রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। আশঙ্কার কথা এই যে, ইতিমধ্যেই তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্পের আওতায় আরও দুটি খাল খননের জন্য ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সেচ বিভাগ প্রায় ১ হাজার একর পরিমাণ জমির মালিকানা পেয়েছে। এ জমির মাধ্যমে তিস্তার পূর্ব তীরে দুটি খাল তৈরি করতে পারবে প্রশাসন। জলপাইগুড়ি জেলা দিয়ে বয়ে যাওয়া আরেক নদী জলঢাকার পানিপ্রবাহও খালের দিকে ঘুরিয়ে দেওয়া হবে।
পশ্চিমবঙ্গ সেচ বিভাগের এক সূত্রের বরাত দিয়ে গত বছর টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়, তিস্তা এবং জলঢাকার পানি টানার জন্য কোচবিহার জেলার চ্যাংড়াবান্ধা পর্যন্ত ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি খাল খনন করা হবে। আরেকটি খালের দৈর্ঘ্য হবে ১৫ কিলোমিটার। এটি তিস্তার বাম পাশের তীরবর্তী এলাকায় খনন করা হবে। এই খালটি খনন করা হলে প্রায় এক লাখ কৃষক সেচ সুবিধার আওতায় আসবেন। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম দ্য টেলিগ্রাফের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ পদক্ষেপের আওতায় জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার এলাকার আরও অনেক কৃষিজমি সেচের আওতায় আসবে। সাধারণভাবেই বলা যায় যে, তিস্তার পানি বাংলাদেশে না এসে চলে যাবে জলপাইগুড়ি ও কোচবিহার এলাকায়। তাহলে শুষ্ক মৌসুমে বাংলাদেশ পানি পাবে কীভাবে? তিস্তার পানি দ্বারা উত্তরবঙ্গে ৯ লাখ ২২ হাজার হেক্টর কৃষিজমিকে সেচের আওতায় আনতে ১৯৭৫ সালে তিস্তা ব্যারাজ প্রকল্প শুরু হয়। এর আওতায় খালের মাধ্যমে তিস্তার পানি নদীর দুই পাড়ের এলাকার কৃষিজমিতে সরবরাহের পরিকল্পনা হয়। ওই অঞ্চলের মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া অন্য নদীগুলো থেকে খালে পানি সরবরাহের সিদ্ধান্ত হয়। কিন্তু শুরুর পর থেকেই প্রকল্পটি বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। এর সেচ সুবিধা বর্তমানে মাত্র ১ লাখ হেক্টরের মতো কৃষিজমি পেতে পারে। এর মূল কারণ ভারতের পানি প্রত্যাহার। শুধু পদ্মা, তিস্তা, ব্রহ্মপুত্র, মহানন্দা, ফেনী, সুরমা, কুশিয়ারা নয় ভারত ক্রমান্বয়ে উজানের সব নদীর পানি প্রত্যাহারের পথ ধরেছে। ফলে কৃষি অর্থনীতির ওপর নির্ভরশীল বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল বিশেষত রংপুর অঞ্চলে মরুকরণের আশঙ্কা আর দক্ষিণাঞ্চল খুলনা সাতক্ষীরায় লবণাক্ততা প্রচণ্ড সংকটের জন্ম দিয়েছে। আশঙ্কা এখন বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
জীবনকে নদীর সঙ্গে তুলনা করা হয়। ফলে নদীর প্রবাহ শুকিয়ে গেলে জীবন প্রবাহ কি সজীব থাকবে? পানি ছাড়া যেমন জীবন বাঁচে না, নদী না বাঁচলে পরিবেশ রক্ষা পাবে না। এটা বিবেচনায় রেখে দুর্নীতি, দখল ও দূষণের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া এখন গুরুত্বপূর্ণ। অভিন্ন নদীর পানি একতরফা প্রত্যাহার করে ভারত বাংলাদেশের কৃষি, পরিবেশ, পরিবহন, পুষ্টি ও প্রাণ ধারণের ক্ষেত্রে এক ভয়াবহ হুমকি তৈরি করেছে। এর হাত থেকে বাঁচতে হলে বন্ধুত্বের সদিচ্ছা নয়, যুক্তির সক্ষমতার ওপর নির্ভর করতে হবে। অভিন্ন নদীর ওপর ভারতের বাঁধ নির্মাণ, একতরফা পানি প্রত্যাহার এর বিরুদ্ধে যেমন সোচ্চার হতে হবে, তেমনি দেশের অভ্যন্তরে নদী, খাল দখল, দূষণ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।
লেখক: রাজনৈতিক সংগঠক ও কলাম লেখক
rratan.spb@gmail.com