ইরানে যুক্তরাষ্ট্রের দাদাগিরি

আপডেট : ১৫ জুন ২০২৬, ০২:০৩ এএম

গত শনিবার ট্রাম্পের ঘোষণার আগে, ইরানের বিদেশ মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমায়েলি বাঘেই জানিয়েছিলেন গতকাল রবিবার চুক্তি হচ্ছে না। তবে আগামী কয়েক দিনের মধ্যে হতে পারে। কিন্তু  দ্য গার্ডিয়ান জানাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন ইরানের সঙ্গে সমঝোতার চুক্তি স্বাক্ষরিত হচ্ছে রবিবার। মজার বিষয় হচ্ছে, আনুষ্ঠানিকভাবে রবিবার চুক্তি স্বাক্ষরের ঘোষণা করেনি তেহরান। বরং,  ট্রাম্পের বক্তব্যের বিরুদ্ধে এবং চুক্তি বিরোধীতায় বিক্ষোভ হয়েছে। অনেক মানুষ পথে নেমেছিলেন। ট্রাম্প বলেছিলেন চুক্তি স্বাক্ষরের সঙ্গে সঙ্গে সবার জন্য খুলবে হরমুজ প্রণালি। সেখানে কোনো বাধা থাকবে না। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত  চুক্তি স্বাক্ষরের কোন সংবাদ পাওয়া যায়নি। বাস্তবে হরমুজে যে ভয়ংকর ‘কাঁটা’ বিঁধে আছে, চুক্তির সঙ্গে সঙ্গে তা উপড়ে ফেলা সম্ভব? বাস্তবতা বলছে এটি সময়সাপেক্ষ। রয়টার্স বলছে প্রাথমিকভাবে এই চুক্তির শর্ত অনুসারে, হরমুজ থেকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণ তুলে নেবে ইরান। এর পরিবর্তে আমেরিকা ইরানের বিরুদ্ধে জলপথ অবরোধ তুলে নেবে।

ইরান নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের এত মাথাব্যথা কেন?

কোথায় মধ্যপ্রাচ্যের দেশ ইরান আর কোথায় আমেরিকা! প্রশ্নটি এই মুহূর্তের নয়। ১৯৭৯ সালে তেহরানে, মার্কিন দূতাবাস দখলকে কেন্দ্র করে দুই দেশের মধ্যে শত্রুতা শুরু। এরপর ১৯৮০-এর দশকে পারস্য উপসাগরে ‘ট্যাংকার ওয়ার’ চলাকালে, মার্কিন যুদ্ধজাহাজ ইরানের স্পিডবোট এবং মাইনের মুখোমুখি হয়। তবে অনেকে দ্বন্দ্বের শুরু হিসেবে, ১৯৫৩ সালে মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএর সহায়তায় ইরানের গণতান্ত্রিক সরকারকে উৎখাত করার ঘটনাকে বিবেচনা করেন। একসময় ইরানকে বিভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা করেছে যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। পরবর্তী সময়ে একের পর এক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু দেশটিকে দমানো যায়নি। এর মূল কারণ, রাশিয়া ও চীন। পররাষ্ট্রনীতিতে, কোনো দেশ স্থায়ী মিত্র না। সবাই নিজ নিজ দেশের স্বার্থ বিবেচনা করে, কৌশল ঠিক করে। সেই হিসাবে যুক্তরাষ্ট্রও অগ্রসর হচ্ছে। তারা হিসাব করে দেখেছে, যদি ইরানকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়, তাহলে গোটা মধ্যপ্রাচ্য যাবে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণে। আর ইসরায়েলকে দুধ-কলা দিয়ে পুষছে যুক্তরাষ্ট্র।

না হলে, ইরানের খনিজ  সম্পদ ইসরায়েল ঘুরে যুক্তরাষ্টের ভান্ডারে কীভাবে যুক্ত হবে? এর আগে একটি দেশের অতীত বলা দরকার। সেটা হচ্ছে, একসময়ের সোভিয়েত ইউনিয়ন।

২৬ ডিসেম্বর, ১৯৯১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভাঙে। দেশটি একসময় বৃহত্তম একক রাষ্ট্রীয় ভূখণ্ড ছিল, যার আয়তন ছিল প্রায় ১ কোটি ৭০ লাখ বর্গকিলোমিটার। এরপর সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে ১৫টি স্বাধীন রাষ্ট্রের সূচনা হয়; স্বাধীন রাষ্ট্রের রাষ্ট্রমণ্ডল গঠন হয়; বিচ্ছিন্নবাদী কার্যক্রম সফল হওয়ার পর, পতন হয় সমাজতন্ত্রের। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে দুর্বল হতে থাকে সমাজতান্ত্রিক সরকার ও রাজনৈতিক দল। ঠিক তখনই যুক্তরাষ্ট্র একক বিশ্বপরাশক্তি হিসেবে পরিচিতি পায়। ঠিক তখন দেশটি একচেটিয়াভবে যুদ্ধ এবং বিভিন্ন দেশে সরকার পরিবর্তন, রাজনৈতিক হত্যা এবং দখলকৃত দেশের সম্পদ খুবলে নেওয়ার নেশায় মেতে ওঠে। কারণ, তাকে আটকানোর মতো কোনো শক্তিধর দেশ ছিল না। এই সুযোগে যুক্তরাষ্ট্র হয়ে ওঠে অসম্ভব বেপরোয়া। এভাবে চলতে চলতে সে এখন নজর দিয়েছে, ইরানের খনিজ সম্পদের দিকে। কিন্তু তারা আটকে গেছে। তারা ভেবেছিল গোটা মধ্যপ্রাচ্য থাকবে তাদের নিয়ন্ত্রণে। একইসঙ্গে দেশগুলোর খনিজ সম্পদ। কিন্তু সবকিছুর শেষ আছে।

ইরানের বিরুদ্ধে চলমান যুদ্ধে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ব্যয় এখন পর্যন্ত প্রায় ২৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। পেন্টাগনের হিসাব অনুযায়ী, এর মধ্যে গোলাবারুদ ও সমরাস্ত্র মেরামতে সিংহভাগ অর্থ খরচ হয়েছে। এই হিসাব যখন পরিষ্কার হলো, তখন যুক্তরাষ্ট্র পড়েছে দোটানায়। যুক্তরাষ্ট্র এবার ইরান আক্রমণ করতে গিয়ে আটকে গেছে। দেশটি না পারছে ইরান দখল করতে, না পারছে তাদের কাছে নতি স্বীকার করতে। যে কারণে বর্তমান প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প একেকবার একেক কথা বলছেন। কখনো তিনি বলছেন, যুদ্ধ শেষ। আবার কখনো বলছেন এবার আর যুদ্ধ নয়। এখন হবে শান্তিচুক্তি। কিন্তু সব পরিকল্পনা সম্ভবত স্থগিত রাখতে বাধ্য হবেন ট্রাম্প। কারণ আজকের পর যুদ্ধকা- কোন দিকে মোড় নেয়, তা বলা দুরূহ। তবে সমগ্র হরমুজ প্রণালি পণ্যবাহী জাহাজ পরিবহনের জন্য এখনো নিরাপদ নয়। মার্কিন সংবাদমাধ্যম ফক্স নিউজ জানাচ্ছে হরমুজ থেকে মাইন সরানোর কাজ পরে করা হবে। আপাতত ইরানের সঙ্গে সমঝোতা করে, জলপথের পরিস্থিতি স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। আবার ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ইরান নিয়ে কঠোর অবস্থান ব্যক্ত করেছেন। তিনি সম্প্রতি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন যতদিন তিনি ক্ষমতায় থাকবেন, ততদিন ইরানকে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে দেবেন না।

বিশ্বের বিভিন্ন শক্তিশালী দেশ যুক্তরাষ্ট্রের করুণ দশা দেখে মুখ টিপে হাসছে। তারা এখন যে কোনো কৌশলে, ইরান যুদ্ধ থেকে বের হয়ে আসতে চাচ্ছে। কারণ যুক্তরাষ্ট্র বুঝতে পেরেছে, আগের মতো বিশ্ব আর এককভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণে নেই। এরইমধ্যে পৃথিবীর অনেক দেশ অর্থ এবং অস্ত্রে শক্তিশালী হয়ে উঠেছে। সেই দেশগুলোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করে তাদের অগ্রসর হতে হবে। আগামী সপ্তাহে ফ্রান্সে অনুষ্ঠিত হতে চলেছে জি-৭ সম্মেলন। সেখানে উপস্থিত থাকার কথা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং ট্রাম্পের। সংবাদ সংস্থা ‘এপি’ দুই মার্কিন কর্তাকে উদ্ধৃত করে জানিয়েছে, বৈঠকে পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিস্থিতি, হরমুজ প্রণালি নিয়ে আলোচনা হবে। এক সময় যে দেশগুলোকে তারা তেমন পাত্তা দেয়নি, এখন তাদের ছলে-বলে পাশে রাখতে চাচ্ছে। ট্রাম্পের কাছে সবকিছু ধীরে ধীরে পরিষ্কার হচ্ছে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রর বিশ্ব নেতৃত্ব ধরে রাখা, অন্যদিকে রিপাবলিকনদের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে দলীয় প্রভাব বজায় রাখা। তবে শেষ পর্যন্ত  ট্রাম্পের পরিণতি কোন পথে অগ্রসর হবে, নিকট ভবিষ্যতে সেটি স্পষ্ট হবে।

লেখক : সাংবাদিক

[email protected]

×
সর্বশেষ সর্বাধিক পঠিত