গরমে এসি ছাড়াই যেভাবে ঠান্ডা থাকে চীনের প্রাচীন বাড়ি

শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ভবনে বহু বছর বসবাসের পর জীবনে একটি পরিবর্তন আনতে প্রায় শত বছরের পুরনো একটি প্রাচীন কাঠের বাড়িতে থাকতে শুরু করেন চীনের নাগরিক রু লিং। দেশটির পূর্বাঞ্চলে আনহুই প্রদেশের গুয়ানলু গ্রামের ওই বাড়িতে ২০১৪ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত টানা সাত বছর বসবাস করেন তিনি। পুরানো বাড়িগুলোর ভিতরে থাকা ফাঁকা জায়গা বা উঠানে সময় কাটাতে পছন্দ করেন লিং। তার মতে, এই জায়গাগুলো গরম এবং আর্দ্র দিনের জন্য উপযুক্ত।

রু লিং বলেন, গ্রীষ্মে আমার এই বাড়িতে প্রাকৃতিকভাবে শীতলতার অনুভূতি পাওয়া যায়। যা আমাকে খুব সতেজ করে দেয়। এই অনুভূতি আধুনিক বিশ্বে খুঁজে পাওয়া কঠিন। তিনি বলেন, এই বাড়ির ভেতরে যে আঙিনা বা উঠোন রয়েছে সেটা এই শীতল প্রভাব তৈরি করতে সাহায্য করেছে। গরম আবহাওয়ায় বাড়ির উঠোনের সুবিধাগুলো শুধু তিনিই উপভোগ করছেন না। গবেষণায় দেখা গেছে, দক্ষিণ চীনের কিছু বাড়ির উঠোনের ভিতরের তাপমাত্রা বাইরের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম, চার দশমিক তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত কম।

আজ, চীন দ্রুত নগরায়নের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। দেশটিতে বহুতল ভবনে শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত অ্যাপার্টমেন্ট এবং অ্যাপার্টমেন্ট ব্লকগুলো আবাসনের প্রধান রূপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তবে ঐতিহ্যবাহী চীনা স্থাপত্যের প্রতি নতুন করে আগ্রহ জাগার ফলে কিছু ঐতিহাসিক ভবনের ভেতরের আঙিনা আধুনিক ভবনেও রাখা হচ্ছে। সরকার নির্মাণ খাতে কার্বন নিঃসরণ কমানোকে উৎসাহিত করায় এখনকার স্থপতিরা নতুন নির্মিত ভবনগুলো শীতল রাখতে এমন খোলা জায়গা রাখার পাশাপাশি ঐতিহ্যবাহী চীনা স্থাপত্যের অন্যান্য বৈশিষ্ট্যের দিকে নজর দিতে শুরু করেছে।

বাড়ির ভেতরের আঙিনা, যাকে ম্যান্ডারিন ভাষায় তিয়ান জং বলা হয়, এটি দক্ষিণ এবং পূর্ব চীনের ঐতিহ্যবাহী বাড়িগুলোর একটি সাধারণ বৈশিষ্ট্য। তবে তিয়ান জং দেশটির উত্তরের বাড়িগুলোয় থাকা সাধারণ খোলা আঙিনা, বা ইউয়ান জি থেকে আলাদা। কারণ ইউয়ান জি বাড়ির বাইরে আলাদা খোলা পরিবেশে যা আরও বড় এবং আরও বেশি উন্মুক্ত হয়ে থাকে। মিং (১৩৬৮-১৬৪৪) এবং কিং (১৬৪৪-১৯১১) রাজবংশের আমলে নির্মিত স্থাপনাগুলোয় বাড়ির ভেতরের আঙ্গিনা রাখা একটা সাধারণ বিষয় ছিল। মূলত পরিবারের কয়েক প্রজন্ম ধরে এই আঙিনা ডিজাইন করা হয়েছে। ২০১০ সালে চীনের নানচাং বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালে প্রকাশিত এক নথি থেকে এসব তথ্য জানা যায়। 

Untitled-10

বাড়ির ভেতরের এসব উঠোনের আকার এবং নকশা একেক অঞ্চল ভেদে পরিবর্তিত হয়। তবে এই খালি জায়গাটি প্রায় সবসময় আয়তকার হয়ে থাকে এবং এর অবস্থান থাকে বাড়ির কেন্দ্রে। উঠোনের চারদিক বা তিনদিক কক্ষ ও প্রাচীর দ্বারা বেষ্টিত থাকে। কিছু বড় বড় বাড়িতে একাধিক উঠোন থাকে। সিচুয়ান, জিয়াংসু, আনহুই এবং জিয়াংজি প্রদেশের মতো দক্ষিণ ও পূর্ব চীনের বেশিরভাগ অঞ্চলের ঐতিহাসিক বাড়িগুলোয় ভিতরে উঠোন থাকা তুলনামূলকভাবে সাধারণ বিষয়।

শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র আবিষ্কারের অনেক আগে ভবনকে শীতল রাখতে জন্য অভ্যন্তরীণ আঙ্গিনাগুলো ডিজাইন করা হতো। যখন একটি বাড়ির উঠোনের উপর দিয়ে বাতাস প্রবাহিত হয়, তখন এই খালি জায়গার মাধ্যমে বাতাস সারা বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে পারে। যেহেতু বাইরের বাতাস সাধারণত ভিতরের বাতাসের চেয়ে ঠান্ডা থাকে, তাই বাইরের ঠান্ডা বাতাস দেয়ালের মধ্য দিয়ে প্রতিটি তলায় চলে যায়। যার ফলে ভিতরের উষ্ণ বাতাসকে সরিয়ে দিয়ে বাড়ির ভেতরে ঠান্ডা বাতাসের প্রবাহ তৈরি হয়। তখন ভেতরের গরম বাতাস ঘরের ওপরের দিকে উঠে ফাঁকা জায়গা দিয়ে বেরিয়ে যায়।

৩০ বছর ধরে প্রাচীন হুইঝো অঞ্চলের একটি অংশ জিয়াংসি প্রদেশের উয়ুয়ান জেলায় থাকা প্রাচীন উঠোনওয়ালা বাড়িগুলি পুনরুদ্ধার করছেন ৫৫ বছর বয়সী ইউ ইউহং। চীনা বাড়ির ভেতরের এই খালি জায়গা সম্পর্কে ব্যাপক জ্ঞান রয়েছে তার।

ইউ জানান, ভেতরের আঙিনার প্রধান কাজগুলো হল ঘরের ভেতরে পর্যাপ্ত আলো প্রবেশ করতে দেওয়া, বায়ুচলাচল উন্নত করা এবং বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করা। হুইঝোতে থাকা পুরনো বাড়িগুলোর ভিতরের উঠোন আকারে ছোট এবং উঁচু।

আশেপাশের কক্ষগুলো গরমের দিনে সূর্যালোককে আটকাতে পারে, যার ফলে উঠোনের নিচের অংশটি ঠান্ডা থাকে। এবং ঘরের ভেতর থেকে গরম বাতাস ওপর দিকে উঠে ফাঁকা জায়গা দিয়ে বেরিয়ে যেতে পারে যা অনেকটা চিমনির মতো কাজ করে।

ইউ এর মতে, হুইঝো শহরের পুরানো বাড়িগুলোর নিচতলায় সাধারণত উঁচু সিলিং থাকে এবং ছাদের অংশটুকু ফাঁকা থাকে। এই খোলা অংশটি সরাসরি ভিতরের উঠোনের বরাবর হয়, যা বায়ুচলাচলের জন্য উপযোগী।

তিনি বলেন, কিছু ধনী পরিবারের দুটি এমনকি তিনটি উঠোন ছিল, যার কারণে সেখানকার ভালো বায়ুচলাচল আরও উন্নত ছিল। ভেতরের আঙ্গিনাসহ ভবনগুলো চীনে কয়েকশ বছর ধরে টিকে রয়েছে। কিন্তু যারা আধুনিক সুযোগ-সুবিধা পছন্দ করেন তাদের অনেকেই পুরনো বাড়ির সুবিধার কথা ভুলতে বসেছিল।

সূত্র: বিবিসি।