চীনের হেবেই প্রদেশের চিয়া হাইশিয়া ও চিয়া ওয়েনছি। তাদের একজন দেখতে পান না, অন্যজনের দুটি হাত নেই। স্বাভাবিক দৃষ্টিতে দুজনের জীবনই অন্যের সাহায্যের ওপর নির্ভরশীল হওয়ার কথা। তবে পরস্পরের দুর্বলতাকে শক্তিতে বদলে এমন এক কাজ করেছেন, যা সক্ষম অনেক মানুষের পক্ষেও কঠিন। বছরের পর বছর শ্রম দিয়ে তারা পাথর ও আগাছায় ভরা একটি নদীতীরকে ‘সবুজ বনে’ পরিণত করেছেন।
ঘটনার বিবরণে জানা গেছে, চিয়া ওয়েনছি শৈশবে বৈদ্যুতিক দুর্ঘটনায় দুটি হাত হারান। আর চিয়া হাইশিয়ার বাঁ চোখ জন্মগত ছানির কারণে অন্ধ ছিল। ২০০০ সালে দুর্ঘটনায় ডান চোখটিও নষ্ট হয়ে গেলে তিনি পুরোপুরি দৃষ্টিশক্তি হারান। শারীরিক প্রতিবন্ধকতার কারণে দুইজনের জন্যই নিয়মিত কাজ পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছিল। শেষ পর্যন্ত তারা নিজেদের গ্রামের পরিবেশ রক্ষার পাশাপাশি জীবিকার পথ তৈরির সিদ্ধান্ত নেন।
২০০২ সালে হেবেইয়ের ইয়েলি গ্রামের কাছে প্রায় আট হেক্টর অনুর্বর নদীতীর ইজারা নিয়ে গাছ লাগানো শুরু করেন দুই বন্ধু। চারা কেনার মতো অর্থ তাদের ছিল না। তাই বড় গাছের ডাল কেটে সেগুলো থেকেই নতুন গাছ জন্মানোর চেষ্টা করতেন। ওয়েনছি কোন ডালটি উপযুক্ত, তা দেখে হাইশিয়াকে নির্দেশনা দিতেন। আর হাইশিয়া গাছে উঠে ডাল কাটতেন, মাটি খুঁড়তেন ও চারা রোপণ করতেন।
এ কারণেই তারা বলতেন, একজন অন্যজনের চোখ, আর অন্যজন তার হাত। কাজটি মোটেও সহজ ছিল না। নদী পার হওয়ার সময় হাতহীন ওয়েনছি অনেক ক্ষেত্রে অন্ধ বন্ধুকে পিঠে তুলে নিতেন। হাইশিয়া গাছে উঠে ডাল সংগ্রহ করতেন। এরপর দুইজন মিলে মাটি খুঁড়ে চারা বসাতেন এবং নদী থেকে পানি এনে সেগুলো বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করতেন।
প্রথম বছর প্রায় ৮০০টি ডাল রোপণ করেও তারা বাঁচাতে পেরেছিলেন মাত্র দুটি গাছ! কিন্তু ব্যর্থতায় থেমে যাননি। প্রতিদিন আবার কাজে ফিরেছেন। ধীরে ধীরে অভিজ্ঞতা বেড়েছে, বেঁচে থাকা গাছের সংখ্যাও বেড়েছে। এক দশকের বেশি সময়ে তারা ১০ হাজারের বেশি গাছ রোপণ করেন। কয়েকটি প্রতিবেদনে সংখ্যাটি ১২ হাজারও বলা হয়েছে। তাদের গড়ে তোলা সবুজ অঞ্চল নদীতীরের মাটি রক্ষা এবং গ্রামের বন্যার ঝুঁকি কমাতে সহায়তা করেছে। নিজেদের লাগানো গাছ কখনো বিক্রি বা কেটে অর্থ উপার্জন করবেন না বলেও তারা অঙ্গীকার করেছিলেন।
চিয়া হাইশিয়া ও চিয়া ওয়েনছির গল্প শুধু বৃক্ষরোপণের নয়। এটি এমন এক বন্ধুত্বের গল্প, যেখানে একজনের অভাব অন্যজন পূরণ করেছেন। চোখ ও হাতের সীমাবদ্ধতা পেরিয়ে তারা প্রমাণ করেছেন, একসঙ্গে এগোতে পারলে অসম্ভব বলে খুব কম কিছুই থাকে।
