ভাবমূর্তি ফেরানোর সুযোগ ফকিরেরপুলের

ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাবকে এক সময় বলা হতো ফুটবলার তৈরির কারখানা। সময়ের স্রোতে ম্লান হয়েছে এর কর্মকান্ড। এক সময়ের শীর্ষ লিগে খেলা দলটি হোঁচট খেতে খেতে নেমে এসেছিল নিচের সারিতে। ঐতিহ্যবাহী ক্লাবটি সর্বশেষ কলঙ্কিত হয় পাঁচ বছর আগে। ক্যাসিনো কান্ডে মতিঝিল পাড়ার যে ক’টি ক্লাবে তালা ঝুলেছিল, তাদের একটি ৭০ বছরের পুরনো ইয়ংমেন্স ক্লাব। তবে দুঃসময় পেছনে ফেলে তারা এবার বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। তাতে মিলেছে শীর্ষ লিগে খেলার ছাড়পত্র। অবশ্য তাতে বাঁধভাঙা আনন্দে মাতার সুযোগ নেই ক্লাব কর্তাদের। শিরোপা জয়ের উচ্ছ্বাসটা ম্লান হচ্ছে ভবিষ্যৎ দুর্ভাবনায়। অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ পার করা গেছে। প্রিমিয়ার লিগ তো যেনতেনভাবে পার করা সম্ভব নয়। টিকে থাকার মতো দল গড়তেও লাগবে আড়াই থেকে তিন কোটি টাকা। ক্যাসিনো কান্ডে ভাবমূর্তি হারানোর পর যে অনেকেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে ক্লাবটি থেকে। তারপরও দায়িত্বে থাকা কর্তারা স্বপ্ন দেখছেন প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে। একবার সুযোগ পেয়েও খেলেনি ক্লাবটি। এবার আর সেই ভুল করতে চান না তারা।

২০১৫-১৬ মৌসুমে বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের শিরোপা জিতেছিল ফকিরেরপুল। পেশাদার যুগে প্রথমবারের মতো সুযোগ হয়েছিল শীর্ষ লিগে খেলার। তবে আর্থিক সংকটের কথা বলে তারা দল গড়েনি প্রিমিয়ার লিগে। এ নিয়ে কম সমালোচনা হয়নি। এর কিছুদিন পরই ক্লাবের তৎকালীন কর্তারা ক্যাসিনোবাজদের ক্লাব ব্যবহারের সুযোগ করে দেন দৈনিক ৮০ হাজার টাকা ভাড়ায়। দীর্ঘ ১৯ মাস রাত-দিন সেই ক্লাবে উড়েছে অবৈধ-কালো টাকা। ২০১৯ সালে ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানের পর ক্লাবের তৎকালীন সভাপতি গ্রেপ্তার হন। ক্লাবের দরজায় পড়ে তালা। তবে যে জন্য ক্লাবের এই অধঃপতন, সেই দৈনিক ৮০ হাজার টাকা নিয়ম করে জমা পড়েনি ক্লাবের তহবিলে। কোথায় উধাও হলো সেই টাকা, সেটাও এখন বড় এক প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই দীর্ঘদিন পর বর্তমান কমিটি নিয়েছে ভাবমূর্তি ফেরানোর দায়িত্ব। বর্তমান কমিটির সভাপতি আনোয়ার মাখন জানালেন বিসিএল-এ সেরা হওয়ার নেপথ্যের গল্পে জড়িয়ে আছে অনেক শ্রম, প্রচেষ্টা, ‘এটা একটি পাড়াভিত্তিক ক্লাব। তার ওপর ক্যাসিনোর কারণে ভাবমূর্তি একেবারে মাটিতে মিশে গেছে। দীর্ঘ সময় ক্লাবে ছিল তালা। তাছাড়া ক্যাসিনোর সময় দৈনিক ৮০ হাজার টাকা ভাড়ার সেই টাকারও কোনো হদিস আমরা পাইনি। সে সময় পূর্ণাঙ্গ কোনো কমিটি ছিল না। তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সাব্বির হোসেন একাই সব চালিয়েছেন। আমরা দায়িত্ব নিয়ে বারবার তার কাছে টাকার হদিস জানতে চেয়েছি। তিনি কেবল কারারুদ্ধ সভাপতির কথা বলে এড়িয়ে গেছেন। এখন তৎকালীন সভাপতি (খালেদ) এখন মুক্ত। তারপরও প্রায় ৪-৫ কোটি টাকার কোনো হদিস পাচ্ছি না। সেই টাকা পেলে এখন প্রিমিয়ার লিগে দল গঠন নিয়ে একদমই ভাবতে হতো না।’

এর-তার কাছ থেকে চেয়ে-চিন্তে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগের জন্য দল গড়তে ও ক্যাম্প চালাতে প্রায় ৮০ লাখ টাকা জোগাড় করেছিল বর্তমান কমিটি। মাখন বলেন, ‘আমাদের তো অনেক সীমাবদ্ধতা। ক্যাসিনো কলঙ্কের কারণে কারও কাছে জোর দিয়ে সহায়তাও চাইতে পারি না। তারপরও অনেক কষ্টে চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ পার করতে পারলাম। খেলা চলাবস্থায় কোচ, কর্তাদের নিয়ে বসেছিলাম। তারা জানিয়েছিলেন প্রিমিয়ারে কমপক্ষে আড়াই-তিন কোটি টাকা বাজেট নিয়ে নামতে হবে। সেটা জেনেও আমরা হাল ছাড়িনি। কারণ একবার সুযোগ হাতছাড়া করেছি আগের দায়িত্বে থাকা কর্তাদের কারণে। এবার আর সেটা করব না। যে করেই হোক আমরা প্রিমিয়ার লিগে দল গড়ব।’

ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মাইনু জানালেন কতটা বাধা অতিক্রম করে দলকে পেতে হয়েছে সাফল্য, ‘ক্যাসিনোবিরোধী অভিযানে বন্ধ হয়ে থাকার পর ক্লাবের ভাবমূর্তির পাশাপাশি অবকাঠামোও ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আমাদের আগে থেকেই ডরমেটরি ছিল। তবে সেটা ব্যবহারযোগ্য না হওয়ায় খেলোয়াড়দের পাশের একটি হোটেলে রেখে খেলাতে হয়েছে। আমরা চেষ্টা করছি সংস্কারের। আশা করছি প্রিমিয়ারের আগে ডরমেটরি ব্যবহারযোগ্য করে তুলতে পারব। আমরা খুব বড় বাজেটের দল গড়িনি এবার। তারপরও যখন দেখলাম আমাদের সম্ভাবনা আছে, তখন সবাই মিলে চেষ্টা করলাম। আমরা এখনো সব খেলোয়াড়ের পেমেন্ট করতে পারিনি। তারপরও ছেলেরা তাদের সেরাটা দিয়ে খেলেছে বলেই সাফল্য মিলেছে।’

চ্যাম্পিয়নশিপ লিগ জিতে প্রিমিয়ারে আসা দলগুলো একটা সুবিধে পায়। বাফুফের নিয়ম অনুযায়ী একটা বড় সংখ্যক খেলোয়াড় থাকেন বাইন্ডিংয়ের আওতায়। সেটাকে পুঁজি করেই প্রিমিয়ারে দল গড়ার কথা বলছেন কর্তারা। সভাপতি মাখন বলেন, ‘১০ জনের মতো বাইন্ডিং খেলোয়াড় পাব। এর সঙ্গে কিছু অভিজ্ঞ ও তরুণ স্থানীয় খেলোয়াড় নেওয়ার পরিকল্পনা করেছি। এছাড়া বিদেশি খেলোয়াড় তো লাগবেই। আমরা হয়তো খুব শক্তিশালী দল গড়তে পারব না। তবে চেষ্টা করব টিকে থাকার মতো দল গড়তে।’

সাধারণ সম্পাদক মাইনুর কথাটা খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে হলো, ‘দেখুন, আমরা হয়তো সামনের মৌসুমে প্রিমিয়ারে খেলে খুব ভালো করতে পারব না। তবে এটা আমাদের জন্য একটা বড় সুযোগ। ক্যাসিনো কলঙ্কে যেভাবে ভাবমূর্তি ক্ষুন্ন হয়েছিল, শীর্ষ লিগে খেলে আমরা সেটা ফিরিয়ে আনতে চাই। এলাকার সবার সহায়তা পেলে এবং একটি দুটি স্পন্সর জোগাড় করতে পারলে ফকিরেরপুল মাথা উঁচু করেই খেলবে।’

কাজী সালাউদ্দিনের মতো কিংবদন্তির জন্ম দেওয়া ফকিরেরপুল ইয়ংমেন্স ক্লাব কলঙ্কের কালিমা মুছে পুনরায় ঘুরে দাঁড়াক, এটাই প্রত্যাশা।