জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষের (৪৭তম ব্যাচ) শিক্ষার্থী চন্দন সমাদ্দর সোম ওরফে হিমাদ্রীর বিরুদ্ধে শারীরিক ও মানসিক নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছে। হিমাদ্রী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংস্কৃতিক সংগঠন ‘জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটার’-এর (অডিটোরিয়াম) সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্বে রয়েছেন।
গত রবিবার (২৮ এপ্রিল) বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর এবং যৌন নির্যাতনসংক্রান্ত অভিযোগ কমিটি বরাবর একটি পাঁচ পৃষ্ঠার লিখিত অভিযোগ করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও বিচার বিভাগের ৪৬ ব্যাচের এক ছাত্রী।
বিষয়টি নিশ্চিত করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মো. আলমগীর কবির বলেন, রবিবার বিকেলে ওই ছাত্রী একটি লিখিত অভিযোগ দেন। সেটি পড়ে বুঝেছি ওই দুজনের একটা সম্পর্ক ছিল। সম্পর্কে যেমন টানাপড়েন থাকে তেমন। অভিযোগপত্রে ছেলেটি কয়েকবার মেয়েটিকে মারধর করেছেন বলে উল্লেখ করা হয়। ইতিমধ্যে দুজন সহকারী প্রক্টরকে দায়িত্ব দিয়েছি বিষয়টির সত্যাসত্য যাচাই করতে। রেজিস্ট্রার মহোদয়কেও অবহিত করেছি।
অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, ২০২২ সাল থেকে ২০২৩ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত অভিযুক্ত হিমাদ্রী এবং ভুক্তভোগীর প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ২০২৩ সালের মে মাসে হিন্দুধর্মে বিশ্বাসী হিমাদ্রী ভুক্তভোগীকে বিয়ে করার প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরিত করলে তিনি সম্পর্কে ইতি টানেন। সম্পর্ক থাকাকালে হিমাদ্রী বিভিন্ন বিষয়ে কথাকাটাকাটি হলে ভুক্তভোগীর শরীরে প্রায়ই হাত তুলতেন। ফলে স্থায়ীভাবে তার বিভিন্ন শারীরিক ও মানসিক ক্ষতি সাধিত হয়। অভিযোগপত্রে তিনি পাঁচটি ঘটনা উল্লেখ করেন। যেখানে অভিযুক্ত হিমাদ্রী ভুক্তভোগীকে চড় মেরে কান ফাটিয়ে দেওয়া, হাতের আঙুল ভেঙে দেওয়াসহ নানাভাবে নির্যাতনের ঘটনা উল্লেখ করেন।
ভুক্তভোগী ছাত্রীর দায়েরকৃত অভিযোগপত্রে বলা হয়, ২০২২ সালের জুন মাসে বিশ্ববিদ্যালয়ের শহীদ মিনার এলাকায় হিমাদ্রীর সঙ্গে তার বাগবিতণ্ডা হয় এবং তিনি ঘটনাস্থল ত্যাগ করেন। এসময় তার ফোনটি হিমাদ্রীর কাছে থেকে যায়। পরে ফোনটি ফেরত নেওয়ার জন্য শহীদ মিনার এলাকায় গিয়ে ফোন নিয়ে ফেরার সময় হিমাদ্রী তাকে পেছন থেকে কয়েকবার ডাক দেয়, কিন্তু তিনি সাড়া দেননি। তখন হিমাদ্রী তাকে অশ্রাব্য গালিগালাজ করতে থাকেন। এর প্রতিবাদ করলে হিমাদ্রী তার কানে পরপর তিনটি থাপ্পড় মারে। তখন তিনি মাটিতে পড়ে যান। এরপর তিনি উঠে দাঁড়াতে চাইলে হিমাদ্রী তাকে আবারও আঘাত করে। এরপর তিনি চিকিৎসা নিতে গিয়ে জানতে পারেন তার কানের পর্দা ফেটে গেছে এবং কানের পর্দায় একটা বিশাল ছিদ্র হয়েছে এবং এর ফলে ভেতরে রক্ত জমাট বেঁধে যায়। এতে সাময়িকভাবে তার শ্রবণশক্তি হ্রাস হয়। এরপর তিনি নাক, কান, গলা বিশেষজ্ঞ ডা. শাহজাহান কবিরের অধীনে চিকীৎসা নেন।
অভিযেগপত্রে আরও উল্লেখ করা হয়, অভিযুক্ত হিমাদ্রী সম্পর্ক থাকা অবস্থায় অন্য মেয়েদের সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে ভুক্তভোগীকে প্রতারণা করছেন জানতে পেরে সংকট তৈরি হয়। এমন অবস্থায় ২০২২ সালের ডিসেম্বর মাসে হিমাদ্রী মদ্যপ অবস্থায় ভুক্তভোগীর সাথে বঙ্গমাতা বেগম ফজিলাতুন্নেসা মুজিব হলের সামনে দেখা করতে যান। সেখান থেকে হিমাদ্রী ভুক্তভোগীর সাথে জোরপূর্বক কথা বলতে চাইলে তিনি কথা বলতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে টানতে টানতে বিশ্ববিদ্যালয়ের টারজান পয়েন্টে এলাকায় নিয়ে যায়। একপর্যায়ে হিমাদ্রী ওই ছাত্রীকে এলোপাতাড়ি মারধর করতে থাকেন এবং এতে তিনি মাটিতে পড়ে যান।
এই ঘটনার বর্ণনা দিয়ে ভুক্তভোগী বলেন, ‘আমাকে মারধরের ধরন এতটাই নির্মম ছিল যে, হিমাদ্রী আমার চোখে মুখে পর্যন্ত কামড় দেয়। একপর্যায়ে হিমাদ্রী আমার বুকের ওপর উঠে গলা চাপ দিয়ে আমার শ্বাসরোধ করার চেষ্টা করে ও আমি যেন চিৎকার করতে না পারি তাই আমার মুখ চেপে ধরে। একসময় আমি যখন আর পারছিলাম না, তখন আমি হিমাদ্রীর হাত কামড়ে ধরি। এর ফলে হিমাদ্রীর হাত কেটে যায় এবং রক্তপাত হয়। এসময় হিমাদ্রী পিছু হটলে আমি দৌড়ে চলে আসি রাস্তায়। পথচারীরা আমাকে মেডিকেলে নিয়ে যাওয়ার জন্য রিকশা নিলে হিমাদ্রী আমাকে প্রথমে প্রক্টরের কাছে না যাওয়ার জন্য হুমকি দেয় এবং পরবর্তীতে আমার পা ধরে ক্ষমা চাইতে উদ্যত হয়। এসময় ৪৭তম আবর্তনের একজন নারী শিক্ষার্থী হিমাদ্রীর এই দ্বিচারিতার সরাসরি প্রতিবাদ করেন এবং হিমাদ্রীকে সেখান থেকে বিতাড়িত করে আমাকে নিয়ে মেডিকেলে যান। আমি মানসিকভাবে প্রচণ্ড ভেঙে পড়ি। আমার মানসিক অবস্থার এতটাই অবনতি হয় যে, আমাকে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের সাইকিয়াট্রি ড. গোলাম মোস্তফা এবং সাইকোলজিস্ট তনিমার অধীনে চিকিৎসা নিতে হয়।’
অভিযোগপত্রে অন্য একটি ঘটনায় ভুক্তভোগী জানান, ২০২৩ সালের মে মাসে হিমাদ্রী জাহাঙ্গীরনগর থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক হওয়ার পর তার সাথে আবার যোগাযোগ করে এবং সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করে। এর কিছুদিন পর হিমাদ্রী তার নামে কুৎসা রটায় তিনি নাকি অন্য ছেলের সাথে সম্পর্কে গিয়ে তার সঙ্গে প্রতারণা করছেন। ওই ছাত্রী এটার ব্যাখ্যা জানার জন্য হিমাদ্রীর সাথে বটতলা এলাকায় দেখা করলে কথাকাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে হিমাদ্রী তাকে চড় মারে এবং ধাক্কা দিয়ে মাটিতে ফেলে দেয়। এর ফলে মাটিতে পড়ে গিয়ে তার হাত ছিলে যায় এবং তার গলা চেপে ধরে।
এঘটনা নিয়ে ভুক্তভোগী ওই ছাত্রী বলেন, ‘ওই ঘটনার এক সপ্তাহ পর আমাকে এক সাংবাদিক ফোন দিয়ে জানতে চাইলে আমি হিমাদ্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করি। তখন হিমাদ্রী সাংবাদিকদের আপাতত কিছু না বলার জন্য বলে এবং দ্রুত দেখা করতে বলে। দেখা করার পর হিমাদ্রী আমাকে বিয়ে করার প্রলোভন দেখিয়ে ধর্মান্তরিত হওয়ার প্রস্তাব দেয়। যা আমি সম্পূর্ণভাবে নাকচ করি। এবং সেখানেই আমাদের সম্পর্ক বিচ্ছেদ হয়। পরবর্তী ঘটনার পর একটা সময় আমি নতুন জীবন শুরু করি। কিন্তু হিমাদ্রী ও আশপাশের কিছু মানুষজন আমার নামে বিভিন্নজনের কাছে বিভিন্ন কুৎসা রটানো শুরু করে। আমার চরিত্র নিয়ে মানুষের কাছে বাজে কথা ছড়ায়। এছাড়া বর্তমানে যার সাথে আমার সম্পর্ক আছে তাকে এবং তার পরিবারকে বিভিন্নভাবে বিব্রত করে আসছে। যার কারণে আমি মানসিকভাবে মারাত্মক বিপর্যন্ত এবং সামাজিকভাবে অপদস্থ বোধ করছি। আমি যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে এই অভিযোগটি আমলে নিয়ে আমার সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ের শুষ্ঠু তদন্ত সাপেক্ষে অভিযুক্ত ব্যক্তি ও তার প্রশ্রয়দাতাদের বিচারের আওতায় আনা হোক।’
এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত শিক্ষার্থী হিমাদ্রীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘যেহেতু অভিযোগপত্রটি আমি দেখিনি বা জানি না এবং প্রশাসন থেকে আমি এখনো নোটিফাই হইনি সেহেতু এখন কিছু বলতে পারব না।’ তখন ঘটনার বিবরণ দিয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি এড়িয়ে যান।
বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন নির্যাতন সংক্রান্ত অভিযোগ কমিটির সভাপতি অধ্যাপক জেবউননেছা বলেন, ‘ওই ছাত্রী আমাকে ফোনে বিষয়টি জানিয়েছে এবং হোয়াটসঅ্যাপে অভিযোগপত্র পাঠিয়েছে। প্রিন্ট কপি জমা দিলে বিস্তারিত বলতে পারব।’