দেশ জুড়ে চলমান তাপপ্রবাহে প্রকৃতি উত্তপ্ত থেকে উত্তপ্ততর হয়ে উঠছে। প্রায় দিনই তাপমাত্রা নতুন রেকর্ড গড়ছে। এতে বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে জনজীবন। বিঘ্নিত হচ্ছে সাধারণ মানুষের চলাচল। তা ছাড়া তীব্র গরমে মানুষের মৃত্যু ও অসুস্থ হয়ে পড়ার মতো ঘটনাও ঘটছে। এমন পরিস্থিতিতে প্রয়োজন ছাড়া মানুষ ঘরের বাইরে বের হচ্ছে কম। তবে এই উত্তপ্ত আবহাওয়ার মধ্যেও জীবিকার তাগিদে ঘর থেকে বের হতে হচ্ছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। যাদের মধ্যে রয়েছেন রাস্তার পাশের ফুটপাতে পণ্য বিক্রি করা অস্থায়ী দোকানি ও স্থায়ী ক্ষুদ্র দোকানিরা। অবশ্য এই ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বিক্রিতে ভাটা পড়েছে।
প্রচণ্ড তাপ উপেক্ষা করে দোকান খুললেও ক্রেতার দেখা মিলছে না তেমনটা। স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অন্তত ১৫ থেকে ২০ শতাংশ পর্যন্ত বিক্রি কমেছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের। প্রকৃতির বিরূপ আচরণের সঙ্গে এসব ব্যবসায়ীর আয়েও চলছে খরা।
এসব ব্যবসায়ী বলছেন, স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তাপপ্রবাহের মধ্যে বিক্রি কমেছে উল্লেখযোগ্য হারে। একদিকে রাস্তায় মানুষের আনাগোনা কম, অন্যদিকে রোদের তাপে দোকান খুলে দাঁড়ানো দায় হয়ে পড়ছে। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্রি একেবারে নেই বললেই চলে। সন্ধ্যার পর কিছুটা বিক্রি হলেও তা যথেষ্ট নয়। সব মিলিয়ে করোনা মহামারী চলাকালীন সময়ের মতো ব্যবসায় ধস নেমেছে।
সরেজমিনে গতকাল মঙ্গলবার রাজধানীর পল্টন, মতিঝিল ও শান্তিনগর এলাকায় রাস্তার পাশের ফুটপাতের অস্থায়ী দোকান ও স্থায়ী মুদি দোকানগুলো ঘুরে দেখা যায়, তাপপ্রবাহ উপেক্ষা করেই নানা পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসেছেন বিক্রেতারা। কিন্তু রাস্তায় মানুষের আনাগোনা কম থাকায় দোকান ক্রেতাশূন্য। ফুটপাতের ব্যবসায়ীরা ঘর্মাক্ত শরীরে ছাতার নিচে বসে অলস সময় পার করছেন।
মতিঝিল এলাকার চায়ের দোকানি আরিফুল দেশ রূপান্তরকে বলেন, সাপ্তাহিক ছুটির দিনেও চার-ছয় হাজার টাকার চা, রুটি, বিস্কুট ও সিগারেট বিক্রি হয়। আর অফিস খোলা থাকলে এই অঙ্ক দ্বিগুণ হয়। অফিস খোলার দিনগুলোতে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকার বেচাবিক্রি হয়। কিন্তু চলমান তাপপ্রবাহের মধ্যে দৈনিক বিক্রি কমে ৩ থেকে ৫ হাজার টাকায় নেমেছে।
জাতীয় মসজিদ বাইতুল মোকাররমের উত্তর গেটের চা দোকানি রনি মাহমুদও একই ধরনের তথ্য জানান। তিনি বলেন, স্বাভাবিক সময়ে প্রতিদিন ২০ কেজি গরুর দুধের চা বিক্রি হতো। কিন্তু চলমান তাপপ্রবাহের মধ্যে চা বিক্রি অর্ধেকে নেমেছে। প্রচণ্ড রোদের মধ্যে দোকান খোলা রাখাই চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আর মুদি দোকানগুলোতে কিছু ক্রেতা দেখা গেলেও স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় তা অনেক কম। পল্টন এলাকার তাহমিন স্টোরের স্বত্বাধিকারী মিলন আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বর্তমানে ব্যবসার পরিস্থিতি খুব খারাপ যাচ্ছে। গরমে বেচাকেনা অনেক কমে গেছে। রোদের তাপ এতটাই তীব্র যে বাতাসও গরম করে দিচ্ছে। অধিকাংশ মানুষ তো ঘর থেকে মনে হয় বেরই হচ্ছে না। কিন্তু পেটের দায়ে আমাদের বের হতে হয়। দোকানে এসেও বা লাভ কী? অলস সময় পার করছি।’
শুধু ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরাই নন, সব পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা চলমান এই তাপপ্রবাহে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানান বাংলাদেশ দোকান মালিক সমিতির সভাপতি মো. হেলাল উদ্দিন। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দেশে জারি করা হিট অ্যালার্ট চলমান। এ সময় মানুষ বাইরে চলাচল কমিয়ে দেওয়ায় ছোট ও মাঝারি পর্যায়ের ব্যবসায়ীরা ক্ষতির মুখে পড়েছেন। তবে শুধু যে ছোট ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন তা নয়। এই গরমে ছোট-বড় সব ব্যবসায়ী ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।’
ব্যবসায়ীদের বিক্রিতে কী পরিমাণ ভাড়া পড়েছে জানতে চাইলে এই ব্যবসায়ী নেতা বলেন, ‘তাপপ্রবাহের এ সময় ব্যবসায়ীদের বিক্রি কমেছে সত্য। কিন্তু এ মুহূর্তে আমাদের কাছে সঠিক তথ্য না থাকায় মোট ক্ষতির পরিমাণ বলাটা সম্ভব হচ্ছে না। হিট অ্যালার্ট শেষে বিষয়টি নিয়ে আমরা বসব।’
এদিকে তীব্র তাপপ্রবাহের মধ্যে হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে ক্ষুদ্র খামারিদের ব্রয়লার মুরগি মারা যাচ্ছে। যে কারণে অনেক খামারি লোকসানের ভয়ে নতুন করে মুরগি তুলছেন না। বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (বিপিএ) তথ্য অনুযায়ী, চলমান তাপপ্রবাহ শুরুর প্রথম ১০ দিনে দেশে দৈনিক ১ লাখ করে মুরগি মারা গেছে। যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ২০০ কোটি টাকা।
অন্যদিকে চলমান তাপপ্রবাহে লাখ লাখ মুরগি মারা যাওয়ায় রাজধানীর বাজারে মুরগির সরবরাহ কমেছে। এর প্রভাবে ব্রয়লার মুরগিসহ অন্যান্য মুরগির দাম কেজিতে অন্তত ২০ টাকা বেড়েছে। তিন-চার দিন আগেও ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি বিক্রি হয়েছে ২০০ টাকা দরে। এখন তা বিক্রি হচ্ছে ২১০-২২০ টাকা কেজি দরে। আর চড়া দামে দেশি মুরগি ৬৮০ টাকা ও সোনালি মুরগি বিক্রি হচ্ছে ৩৫০ টাকা প্রতি কেজি।
মুরগি বিক্রেতা সাকিব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘গরমে মানুষ বাজারেও কম আসছে। যে কারণে মুরগি কম বিক্রি হচ্ছে। যাদের প্রয়োজন, তারা অনেকে অনলাইনে কিনছে। দেশের বিভিন্ন খামারে গরমে মুরগি মারা যাওয়ায় রাজধানীতে সরবরাহ কমেছে। গরমের প্রথম দিকে মুরগির দাম কমলেও এখন আবার বাড়তে শুরু করেছে।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজধানীর যেসব বিপণিবিতানে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা নেই, তাপপ্রবাহের মধ্যে সেসব বিপণিবিতানে ক্রেতারা খুব একটা যেতে চাইছেন না। ব্যবসায়ীরা বড় বড় বৈদ্যুতিক ফ্যান ব্যবহার করেও ক্রেতা টানতে পারছেন না। রাজধানীর মিরপুর এলাকার শাহআলী মার্কেট ও গুলিস্তানের খদ্দের বাজার শপিং কমপ্লেক্সের নিচতলা ঘুরে এমন চিত্র দেখা গেছে।