মহান মে দিবস আজ

প্রকৃতির মারও খায় শ্রমিকরাই

দেশে শ্রমিকদের মধ্যে সবচেয়ে সংগঠিত হচ্ছেন তৈরি পোশাক খাতের কর্মীরা। অথচ মাত্র সাড়ে চার হাজার টাকা বেতন বাড়ানোর জন্য তাদের জীবন দিতে হয়েছে, জেল খাটতে হয়েছে, চাকরি হারানোর মতো নানা ঘটনা মোকাবিলা করতে হয়েছে। এই হচ্ছে সবচেয়ে সংগঠিত পোশাক খাতের অবস্থা।

যারা অসংগঠিত তাদের অবস্থা আরও ভয়াবহ। গ্যারেজ মিস্ত্রি, কাঠমিস্ত্রি, নির্মাণকর্মী, গৃহপরিচারিকাসহ ৪২টি পেশার স্বীকৃতি থাকলেও তাদের মজুরি নির্ধারণ করানি। সংগঠিত নয় বলে তারা দরকষাকষি করতে পারেন না। ফলে অধিকাংশ সময়ই যা পান তাই নিয়েই বাড়ি ফিরতে হয়। যাদের শ্রমে ঘামে তৈরি হচ্ছে ঝকঝকে তকতকে আবাসন, সাঁই করে উড়ে যাওয়ার ফ্লাইওভার সেই শ্রমিকের আয় এতটাই অল্প যে, তাদের নুন আনতে পান্তা ফুরায়। তারা পায় না চিকিৎসা। শিক্ষার আলো তাদের সন্তানদের আলোকিত করে না।

এসব হতভাগা শ্রমিক শুধু সমাজ, প্রশাসন, নিয়োগকর্তা, যাত্রী বা ক্রেতাদের হাতেই নিপীড়িত হন না, তাদের প্রকৃতিও বঞ্চিত করে। প্রকৃতির মারও খায় শ্রমিকরাই। যখন ঝুম বৃষ্টি হয়, পানির তলে তলিয়ে যায় নগর, তখনো পেটের দায়ে কাজে যেতে হয় শ্রমিকদেরই। যখন বৈশাখের প্রচন্ড তাপপ্রবাহে কেউ বৈদ্যুতিক পাখার নিচে বা বাড়ির ছায়াতলে বিশ্রাম নেয়, তখন এসব শ্রমিককে ছুটতে হয়। তাদের এ অবিরাম ছুটে চলা শীত বা গ্রীষ্ম কখনোই থামে না।

এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বছর ঘুরে আজ আবারও এসেছে মহান মে দিবস। বিশ্বের শ্রমজীবী মানুষের অধিকার আদায়ের দিন। ১৮৮৬ সালের এই দিনে যুক্তরাষ্ট্রের শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকরা আট ঘণ্টা কাজের দাবিতে জীবন উৎসর্গ করেছিলেন। ওইদিন তাদের আত্মদানের মধ্য দিয়ে শ্রমিকশ্রেণির অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। দিবসটির এবারের নির্ধারিত প্রতিপাদ্য ‘শ্রমিক মালিক গড়ব দেশ, স্মার্ট হবে বাংলাদেশ’। দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর পাশাপাশি বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন নানা কর্মসূচির মাধ্যমে দিবসটি পালন করবে।

মহান মে দিবস উপলক্ষে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পৃথক বাণী দিয়েছেন।

দিবসটি উপলক্ষে আজ বেলা ৩টায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগ কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে শ্রমিক জনসভা করবে জাতীয় শ্রমিক লীগ। জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা গোলাম মো. কাদের (জিএম কাদের) মহান মে দিবস উপলক্ষে বাণী দিয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দল দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন কর্মসূচি ও বাণী দিয়েছে।

মে দিবস উপলক্ষে আজ দুপুরে রাজধানীর নয়াপল্টনে সমাবেশ ও র‌্যালি করার কথা রয়েছে বিএনপির শ্রমিক সংগঠন জাতীয়তাবাদী শ্রমিক দলের।

এখন তাপপ্রবাহে পুড়ছে দেশ, জনজীবনে হাঁসফাঁস অবস্থা। তাপপ্রবাহের মধ্যে দেশে চলছে তিন দিনের হিট অ্যালার্ট। এর মধ্যেও কিছু মানুষ তপ্ত খরতাপে কাজ করছেন। যাদের কর্মঘণ্টা বলতে কিছু নেই। নেই নির্দিষ্ট বেতনকাঠামো ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা। অসুস্থ হলেও যারা মালিকপক্ষ থেকে পায় না ন্যূনতম আর্থিক সুবিধা।

এমনই এক পেশা ইটভাটা শ্রমিকদের। যাদের তীব্র রোদ উপেক্ষা করে রোজ কাজে যেতে হয়। গরমকালে তীব্র রোদ আর শীতকালে হাড় কাঁপানো কনকনে ঠান্ডা উপেক্ষা করেও তাদের কাজ করতে হয়। কারণ এই পেশার সঙ্গে জড়িতরা কাজের আগেই টাকা নিয়ে থাকেন। তাই অসুস্থ হলেও বাধ্য হয়ে তাদের কাজে আসতে হয়।

দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার হিন্দুপাড়া গ্রামের এরআর ব্রিকস। গতকাল মঙ্গলবার কাঠফাটা রোদে তপ্ত দুপুরে ওই ইটভাটায় ইট পোড়ানোর জন্য চুল্লিতে কয়লা দিচ্ছিলেন সালাম মিয়া (৩০)। নিচে জ্বলছিল কয়লার আগুন, আর ওপরে প্রখর খরতাপ। এর মধ্যেও মাথায় গামছা বেঁধে কাজ করছিলেন সালাম। যেন নিজেই জ্বলে ইট বানানোর কাজটি করছেন।

কেন এত ঝুঁকি নিয়ে কাজ করছেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কাজ না করলে সংসার চলবে না। সপ্তাহের বৃহস্পতিবার আসলেই কিস্তি শোধ করতে হয়। তাই বাধ্য হয়ে কাজে আসি। তবে গরম বাড়ার কারণে আগের মতো পরিশ্রম করতে পারি না। তাই রোজগার কমে গেছে। আগে দিনে ৭০০ টাকা পাইলেও এখন ৬০০ টাকা ইনকাম হয়।’ তার মতো প্রায় ৫০ জন শ্রমিক ওই ইটভাটায় কাজ করছিলেন। পুরুষের পাশাপাশি নারীদেরও কাজ করতে দেখা গেছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের হিসাবে, দেশে মোট ৭ হাজার ৮৬টি ইটভাটা চালু আছে। এসব ইটভাটায় প্রায় দেড় লাখ শ্রমিকের কর্মসংস্থান। ইটভাটায় এত শ্রমিকের কর্মসংস্থান হলেও তাদের নিয়ে ভাবনা নেই কারও।

শ্রমিক ফ্রন্টের সাধারণ সম্পাদক রাজেকুজ্জামান রতন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ইটভাটার শ্রমিকরা চুক্তিভিত্তিকে কাজ করার কারণে তাদের অধিকারের, নিরাপত্তার, শ্রমঘণ্টার বিষয় থাকে না। তারা অসুস্থ হলেও বাধ্য হয়ে কাজ করতে হয়। এই শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট কোনো মজুরিকাঠামো নেই। এ ছাড়া কাজ করতে গিয়ে কেউ দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত হলে কোনো সাহায্য করা হয় না। ফলে শ্রম আইনের বা শ্রমঅধিকারের সাধারণ দিকগুলোও উপেক্ষিত। শুধু অভাব ও দারিদ্র্যের কারণে এ কাজে যুক্ত থাকছে শ্রমিকরা। তাদের অমানবিক পরিশ্রমে দালানকোঠা ও অট্টালিকা তৈরি হলেও এই শ্রমিকদের ভাগ্যের চাকার পরিবর্তন হয় না।’

চলমান তাপপ্রবাহের মধ্যেও রাজধানীর শাহবাগ ও মৎস্য ভবন এলাকায় রিকশা চালান কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকায় আসা আরাফাত মিয়া। ১০ বছর ধরে তিনি রিকশা চালিয়ে আসছেন। আরাফাত দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এক ট্রিপ ভাড়া মারার পরেই ঠাণ্ডা পানি বা শরবত খাইতে হয়। নয়তো শরীর চলে না। এভাবে দিনে প্রায় ১০০ টাকা বাড়তি খরচ হচ্ছে।’

আগামীকাল (আজ) শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের দিন জানেন কি না এমন প্রশ্ন করতেই তিনি হেসে উঠে বলেন, ‘এসব করে আমাদের কিছুই হয় না। আমাদের নিয়া কেউ কিচ্ছু ভাবে না।’